সেলুনের চেয়ারে বসে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিপ্রদাস’ উপন্যাস পড়ছেন নরসুন্দর বাবলু কুমার বিশ্বাস। ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে মাগুরা শহরের ৩ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গলিতে
সেলুনের চেয়ারে বসে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিপ্রদাস’ উপন্যাস পড়ছেন নরসুন্দর বাবলু কুমার বিশ্বাস। ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে মাগুরা শহরের ৩ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গলিতে

কাঁচি হাতে নরসুন্দর বাবলু, কাজের ফাঁকে ডুবে থাকেন বইয়ে

আয়নার সামনে চিরুনি-কাঁচি। পাশে খোলা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিপ্রদাস’ উপন্যাস। দুপুরে সেলুনে কোনো গ্রাহক নেই। লুঙ্গি ও টি-শার্ট পরা এক ব্যক্তি একমনে বই পড়ছেন। মিনিট বিশেক পর একজন গ্রাহক এলেন চুল কাটাতে। বই বন্ধ করে পাশে রেখে কাজে মন দিলেন তিনি।

নরসুন্দর বাবলু কুমার বিশ্বাস (৫৮) এভাবেই প্রায় চার দশক ধরে কাঁচি-চিরুনি আর বইয়ের সঙ্গে জীবন কাটাচ্ছেন। মাগুরা শহরের ৩ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গলিতে আবদুল গনি একাডেমির দেয়াল ঘেঁষে তাঁর ছোট্ট টিনের চালার সেলুন। বাইরে ছোট একটি ব্যানারে লেখা ‘বাবলু সেলুন’।

বাইরে থেকে দেখলে আর দশটি সেলুনের মতোই মনে হবে। ভেতরে চারটি কাঠের চেয়ার, এক পাশে আয়না। আয়নার নিচের বেঞ্চে সাজানো কিছু বই। গ্রাহকের চুল কাটার ফাঁকে সেখানে চলে বই পড়া, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা ও গান। ক্ষুর-কাঁচির খটখট শব্দের সঙ্গে মিশে যায় এসব কথাবার্তা।

‘জীবনে কোনো বড় লোভ না করে মানুষের ভুলত্রুটি সহজভাবে মেনে নিয়ে পথ চলাটাই আসল বিষয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, নিজের কথা বা আচরণের মাধ্যমে যেন কোনো মানুষ কষ্ট না পায়।’
—বাবলু কুমার বিশ্বাস, নরসুন্দর

মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার বরিশাট গ্রামে বাবলুর জন্ম। বাবা অশ্বিনী কুমার বিশ্বাস, মা মীরা রানী বিশ্বাস। সংসারে অভাব ছিল। পঞ্চম শ্রেণির পর তাঁর পড়াশোনা থেমে যায়। মাত্র ১২ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে হাতে তুলে নিতে হয় কাঁচি-চিরুনি। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত শ্রীপুরের খামারপাড়া বাজারে কাজ করেন। ১৯৮৫ সালের দিকে চলে আসেন মাগুরা শহরে। এরপর ভায়না মোড়, কলেজের সামনে, আবদুল গনি একাডেমির মার্কেটসহ শহরের বিভিন্ন জায়গায় সেলুন চালিয়েছেন। এখন দীর্ঘদিন ধরে এই ছোট্ট টিনের চালাতেই তাঁর কর্মস্থল।

গ্রাহকের চুল-দাড়ি ছাঁটার কাজে ব্যস্ত বাবলু। ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে মাগুরা শহরের ৩ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গলিতে

বইয়ের প্রতি বাবলুর টান ছিল ছোটবেলা থেকেই। ১৯৮৮-৮৯ সালের দিকে শরৎচন্দ্রের ‘রামের সুমতি’ পড়ে নিজের চারপাশের মানুষের গল্প খুঁজে পান তিনি। বাবলু বলেন, ‘মনে হয়, তিনি (শরৎচন্দ্র) আমারই গল্প বলছেন বা আমার আশপাশের অনেক ঘটনা ও মানুষের কথাই বলেছেন।’ এরপর তিনি শরৎচন্দ্রের একের পর এক উপন্যাস পড়তে শুরু করেন। পাশাপাশি পড়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও সমরেশ বসুর বই। সর্বশেষ পড়েছেন শরৎচন্দ্রের ‘শেষ প্রশ্ন’। তার আগে শেষ করেছেন ‘শেষের পরিচয়’।

বই পড়ার আনন্দ নিজের মধ্যে আটকে রাখেননি বাবলু। একসময় তাঁর সংগ্রহে প্রায় ১৫০টি বই ছিল। সেলুনে আসা বইপ্রেমী গ্রাহক ও পরিচিতজনদের তিনি বিভিন্ন সময় বই উপহার দিয়েছেন, আবার অনেকে তাঁর কাছ থেকে বই চেয়েও নিয়ে গেছেন। তাঁর কাছে এখন ৩২টি বই আছে। অনেক দিন নাড়াচাড়া না করায় কয়েকটির ওপর ধুলাও জমেছে।

আয়নার নিচের বেঞ্চে সাজানো কিছু বই। ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে মাগুরা শহরের ৩ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গলিতে

মাগুরা সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মেহেদী হাসান বলেন, বাবলু কয়েক বছর আগে তাঁদের বিদ্যালয়ের পাঠাগারের জন্য ২৫টি বই উপহার দিয়েছেন।

বাবলুর দীর্ঘদিনের গ্রাহক সরকারি চাকরিজীবী ইকবাল তালুকদার। ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি নিয়মিত তাঁর কাছে চুল-দাড়ি কাটান। ইকবাল বলেন, একসময় মাগুরার রঞ্জন লাইব্রেরিসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে পুরোনো বই কিনে সেলুনে সাজিয়ে রাখতেন বাবলু। চুল কাটানোর অপেক্ষায় থাকা মানুষজন সেসব বই পড়তেন। তিনিও সেখানে বসে বই পড়েছেন, বাবলুর সঙ্গে বই নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা কম হলেও সাহিত্য বিষয়ে বাবলুর ধারণা চমৎকার।

সেলুনের গ্রাহকদের বড় অংশই পুরোনো। কেউ ২০ বছর, কেউ ৩০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে তাঁর কাছে আসেন। মাগুরা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক তানভীর রহমান বলেন, ‘নব্বইয়ের দশক থেকে বাবলু ভাইকে চিনি। চুল কাটার ফাঁকে কাস্টমারদের সঙ্গে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি গল্প করতে ভালোবাসেন।’

টিনের চালার ছোট ঘরটির বাইরে একটি ব্যানারে লেখা ‘বাবলু সেলুন’। ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে মাগুরা শহরের ৩ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গলিতে

বইয়ের পাশাপাশি গানও বাবলুর নেশা। লোকসংগীতের সাধক বিজয় সরকারের ভক্ত তিনি। তাঁর প্রায় সব গানই মুখস্থ বলে জানান দীর্ঘদিনের গ্রাহক ঢাকার একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক রবিন শামস। প্রায় ৩০ বছর ধরে বাবলুর কাছে চুল-দাড়ি কাটান তিনি।

সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও নিজের জীবন নিয়ে বাবলুর কোনো আক্ষেপ নেই। নিজের উপার্জনে সংসার চালানো, কারও কাছে ঋণী না থাকা—এসবকেই জীবনের বড় প্রাপ্তি মনে করেন। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে, ছেলে মাগুরায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন।

বাবলু বলেন, ‘ছোটবেলায় মায়ের কাছ থেকে ও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বই পড়ে শিখেছি, নিজের কর্ম নিজে করে খেতে হবে এবং ভালো করার চেষ্টা করতে হবে। জীবনে কোনো বড় লোভ না করে মানুষের ভুলত্রুটি সহজভাবে মেনে নিয়ে পথ চলাটাই আসল বিষয়। সবচেয়ে বড় বিষয়, নিজের কথা বা আচরণের মাধ্যমে যেন কোনো মানুষ কষ্ট না পায়।’