সড়কের ওপর চামড়া ফেলে রেখে চলে যান কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী। আজ সকাল সাড়ে ৮টায় চট্টগ্রাম নগরের আমিন জুট মিল এলাকায়
সড়কের ওপর চামড়া ফেলে রেখে চলে যান কিছু মৌসুমি ব্যবসায়ী। আজ সকাল সাড়ে ৮টায় চট্টগ্রাম নগরের আমিন জুট মিল  এলাকায়

চট্টগ্রামে চামড়ার সেই পুরোনো সংকট, কেউ রাস্তায় ফেলে গেছেন, কারও বিক্রি লোকসানে

ঈদের দিন বিকেল পর্যন্ত সবকিছু ঠিকই ছিল। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গরুর চামড়া সংগ্রহ করছিলেন। কেউ ভ্যানে। কেউ পিকআপে। কারও সামনে শত শত চামড়া। সবারই আশা ছিল, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম উঠবে। কিন্তু সেই আশা শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়।

রাত গভীর হওয়ার আগেই নগরের আতুরার ডিপো ও আগ্রাবাদ চৌমুহনী এলাকায় শুরু হয় হতাশার সেই দৃশ্য। কেউ চামড়া বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে চলে যান। কেউ নামমাত্র দামে ছেড়ে দেন। কেউ আবার জোর করে আড়তে চামড়া ঢুকিয়ে দিয়ে ফিরে আসেন। চট্টগ্রামের চামড়ার বাজারে এবারও যেন ফিরে এল পুরোনো সংকট।

মোহাম্মদ দুলাল তাঁদেরই একজন। ঈদের দিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ৬ শতাধিক গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। প্রতিটির গড় দাম পড়েছিল গড়ে সাড়ে ৩০০ টাকা। অর্ধেকের বেশি ছিল বড় আকারের চামড়া। দিনভর চামড়া কিনে আগ্রাবাদ চৌমুহনী এলাকায় এনে জড়ো করেন। হিসাব ছিল, অন্তত কিছু লাভ হবে। না হলেও মূলধনটা ফিরে আসবে। বেলা গড়াতেই বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। আড়তদারদের প্রতিনিধিরা এসে দাম বলতে শুরু করেন ৫০, ১০০ কিংবা ১৫০ টাকা।

দুলাল রাজি হননি। ভেবেছিলেন, আরও একটু অপেক্ষা করলে হয়তো ভালো দাম মিলবে। মেলেনি। আজ শুক্রবার বেলা ১১টায় প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি। বড় আকারের চামড়া বেশি নিয়েছিলাম। গড়ে সাড়ে ৩০০ টাকা করে দাম পড়েছে। কিন্তু ৫০ বা ১০০ টাকার বেশি কেউ দিতে চায়নি। শেষ পর্যন্ত একটি চামড়াও বিক্রি করতে পারিনি।’ কথা বলতে বলতে হতাশা ঝরে পড়ছিল তাঁর কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘গভীর রাত পর্যন্ত বসে ছিলাম। পরে বাধ্য হয়ে চামড়া ফেলে চলে আসছি।’

সিটি করপোরেশনের উপপ্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা প্রণব কুমার শর্ম্মা প্রথম আলোকে বলেন, গতবারের তুলনায় এবার কম চামড়া রাস্তায় পড়ে ছিল। এখন পর্যন্ত বহদ্দারহাট ও বড়পোল এলাকা থেকে পড়ে থাকা ৩০০ থেকে ৪০০টি চামড়া সংগ্রহ করে অপসারণ করা হয়েছে।

আতুরার ডিপোতে চামড়ার স্তূপ

আজ সকাল সাড়ে ১০টায় আতুরার ডিপো এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে শত শত গরুর চামড়া। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব চামড়া থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে চারপাশে। মাছি ভনভন করছে। কিছু চামড়ার ওপর ইতিমধ্যে ময়লা জমতে শুরু করেছে। এসব চামড়া সিটি করপোরেশনের বর্জ্যবাহী ট্রাক এসে নিয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

সেখানে দেখা হয় হাটহাজারির মৌসুমি ব্যবসায়ী রাজ্জাক মিয়ার সঙ্গে। তিনি ২০০টি চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। প্রতিটির গড় দাম পড়েছিল ৩০০ টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি চামড়াও বিক্রি করতে পারেননি। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এখানে সব সিন্ডিকেট। আড়তদাররা ইচ্ছা করে চামড়া নেয় নাই। অন্তত গাড়িভাড়াটা দিতে বলছিলাম। সেটাও দেয় নাই। তাই সব চামড়া ফেলে দিছি।’

রাজ্জাকের অভিযোগ, আড়তদার মিলে দাম নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অসহায় হয়ে পড়েন।

লবণ মেখে সংরক্ষণ করা হচ্ছে চামড়া। আজ সকালে চট্টগ্রাম নগরের আমিন জুট মিল এলাকায়

‘জোর করে আড়তে দিয়ে এসেছি’

মাছ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রুবেলও এবার চামড়ার ব্যবসায় নেমেছিলেন। গত বছর তিনি লাভ না করলেও লোকসান দেননি। তাই এবার ৩০০টি চামড়া সংগ্রহ করেন। প্রতিটির দাম পড়েছিল প্রায় ৪০০ টাকা। সব কটিই বড় আকারের চামড়া।

রুবেল বলেন, ‘নতুন সরকার দাম নির্ধারণ করেছে। মনে করছিলাম, অন্তত কাছাকাছি দাম পাওয়া যাবে। টার্গেট ছিল, প্রতি চামড়ায় ৫০ টাকা লাভ করব। কিন্তু রাত পর্যন্ত কেউ চামড়া নিল না।’

শেষ পর্যন্ত উপায় না দেখে আতুরার ডিপোর একটি আড়তে গিয়ে চামড়াগুলো রেখে আসেন রুবেল। রুবেল বলেন, ‘জোর করে আড়তে দিয়ে এসেছি। কোনো টাকা দেয় নাই। পরে কী হবে, জানি না।’

‘আমি ভাগ্যবান’

চারদিকে লোকসানের গল্পের মধ্যেও নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছেন মোহাম্মদ সেলিম। তিনি সংগ্রহ করেছিলেন মাত্র ১১টি চামড়া। প্রতিটির দাম পড়েছিল ৪০০ টাকা। সরকারি দামে নয়, লাভেও নয়—শেষ পর্যন্ত অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হয়েছে তাঁকে। তবু সেটাকেই সৌভাগ্য মনে করছেন। সেলিম বলেন, ‘আমার আশপাশের অনেকেই চামড়া ফেলে গেছে। সে জায়গায় আমি ভাগ্যবান। সন্ধ্যার দিকে আরেক মৌসুমি ব্যবসায়ীর কাছে ২০০ টাকা করে বিক্রি করতে পেরেছি।’

চট্টগ্রাম বৃহত্তর কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এবার তাদের ৪০ জনের মতো আড়তদার চামড়া কিনেছেন। চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় ৪ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, নগর ও জেলা মিলে চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে।

দাম না পাওয়া, রাস্তায় চামড়া ফেলে দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আড়দাররা ৪০০-৫০০ টাকা দিয়েও চামড়া কিনেছেন। তবে অনেক চামড়ার কোয়ালিটি ভালো ছিল না। দাগ ছিল। কেটে গিয়েছিল। সে সব চামড়া কেউ নেননি। আর সড়কে চামড়া ফেলে চলে যাওয়ার বিষয়ে তিনি জানেন না বলে দাবি করেন।