
সকাল সাড়ে ১০টা। কুয়াশার আড়মোড়া ভেঙে সূর্য তখন চারপাশে ঝলমল করছে। মাদারীপুর সরকারি কলেজ মাঠের গোলচত্বরে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েকজন। তাঁদের কেউ ব্যাংকার, কেউ গৃহিণী আবার কেউ সরকারি চাকরিজীবী। প্রায় ২০ বছর পর একে অন্যের সঙ্গে দেখা। তাই হাসি, গান আর ঠাট্টায় তাঁরা যেন ফিরে যান সেই কলেজজীবনে।
আজ শনিবার মাদারীপুর সরকারি কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি ও চতুর্থ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছেন ওই প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা ডিগ্রি (স্নাতক) শেষ করে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন ১৯৯০ সালের প্রথম দিকে। এরপর কাজের ব্যস্ততায় আর বন্ধুদের দেখা হয়নি।
৫৩ বছর বয়সী শাহানাজ পারভিন এসেছেন কলেজের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডে (বিআরডিবি) কর্মরত। কলেজজীবনের বন্ধুদের কাছে পেয়ে তিনি বললেন, ‘একসঙ্গে পুরোনো বন্ধুদের দেখে খুব ভালো লাগছে। সবার সঙ্গে আড্ডা দিয়ে মন ভরে গেল। কিছুক্ষণের জন্য আমরা আবার সেই পুরোনো দিনে ফিরে গেছি।’
সকাল থেকে এমনই আড্ডা, স্মৃতিচারণা ও নানা অনুষ্ঠানে সারা দিন উৎসবমুখর ছিল কলেজ ক্যাম্পাস। পুরো ক্যাম্পাস সেজেছে বর্ণিল সাজে। কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে চতুর্থবারের মতো পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সকাল সাড়ে নয়টায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। কলেজের অধ্যক্ষ মো. জামান মিয়ার নেতৃত্বে কলেজ চত্বর থেকে বের করা হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে আবার কলেজ চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। সকাল ১০টায় কলেজ মাঠে বানানো মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা।
১৯৯২ সালে বিএ পাস করে কলেজ ছেড়েছিলেন মো. লুৎফর রহমান। পুনর্মিলনীতে এসে আবেগে আপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, ‘সেই কবেকার কথা। তখন ক্যাম্পাস ছিল ছোট। আমাদের সেই আড্ডার মাঠ, গল্পের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। আজ অনেক বন্ধুদের পেয়েছি। অনেককে পাইনি। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আবার একত্রিত হতে পারব, তা কখনো চিন্তা করিনি।’
ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেছেন ১৯৯২ সালে। তিনি বলেন, শীত উপেক্ষা করে খুব সকালে এসেছেন। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা ও আড্ডা দেওয়ার জন্য তিনি এসেছেন। পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে আসতে পেরে তাঁর খুবই ভালো লাগছে বলে তিনি জানান।
সরেজমিন দেখা গেছে, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে এমন আড্ডার আসর বসিয়েছেন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। আড্ডায় যুক্ত আছেন স্ত্রী-সন্তানেরাও। পুরোনো কোনো বন্ধুকে দেখলেই জড়িয়ে ধরছেন। মুঠোফোনে সেলফি তুলে স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ।
তাঁদের একজন সোহরাফ হোসেন। ১৯৮৬ সালে বিএসসি পাস করে বর্তমানে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সোহরাফ হোসেন বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সব বন্ধুর সঙ্গেই আমার কমবেশি যোগাযোগ আছে। তবে একসঙ্গে তো এভাবে বসে আড্ডা দেওয়া হয় না। বহুদিন পর পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিলাম। ছবি তুললাম। বেশ ভালো লাগছে এবং পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।’
পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের চেয়ারম্যান সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, মানুষ মাঝেমধ্যে অতীতে হারিয়ে যায়। অতীতের স্মৃতি তাকে আনন্দ বা বেদনা দেয়। তবে কলেজের সেই ১৮ বছর বয়সের স্মৃতি একটু ভিন্ন। সেই দিনগুলো হয়তো আর কেউ পাবে না। তবে জীবনের এই ব্যস্ততার ভিড়ে সবাই এক মাঠে আড্ডা-স্মৃতিচারণা সত্যিই আনন্দের।
বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইফুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কাজী ছাইদুর রহমান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিব মিজানুর রহমান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. খালেক মল্লিক, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অতিরিক্ত সচিব আজিজুর রহমান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আলী আকবর প্রমুখ।
অনুষ্ঠান উদ্যাপন কমিটির সদস্যসচিব খান মো. শহীদ বলেন, ৭৫ বছর পূর্তি ও পুনর্মিলনী উপলক্ষে দুই হাজারের বেশি প্রাক্তন শিক্ষার্থীর সমাগম ঘটেছে। সবার মধ্যে উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে। দুপুরের পর থেকে গান, নাচ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কথা আছে।