যশোর

ভৈরব যেন শহরের নর্দমা

৯৮টি প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির পয়োবর্জ্য ও অন্যান্য ময়লা নালা ও পাইপলাইন দিয়ে নদের ভেতরে ফেলা হচ্ছে।

১৪টি নালার মাধ্যমে যশোর শহরের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে ভৈরব নদে। এতে নদের পানি বিবর্ণ হয়ে কালো রং ধারণ করেছে। সম্প্রতি শহরের দড়াটানা সেতুর পাশে
ছবি: প্রথম আলো

যশোর শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে ভৈরব নদ। গোটা শহরের ময়লা-আবর্জনা ১৪টি নালার মাধ্যমে এই নদে ফেলছে পৌর কর্তৃপক্ষ। ভৈরব নদই যেন এখন যশোর শহরের নর্দমা।

নদতীরবর্তী যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার, হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ ৯৮টি প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির শৌচাগারের মানব বর্জ্য ও অন্যান্য ময়লা নালা ও পাইপলাইন দিয়ে নদে ফেলা হচ্ছে। এতে বর্ষা মৌসুমেও নদের পানি বিবর্ণ হয়ে কালো রং ধারণ করেছে। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। নদের পানি ব্যবহারের একেবারেই অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এই পানিতে মাছসহ অন্যান্য প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে।

যশোর পৌরসভার মেয়রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্যানেল মেয়র মোকসিমুল বারী প্রথম আলোকে বলেন, শহরের পচা পানি পৌরসভার ১৪টি ড্রেনের (নালা) মাধ্যমে ভৈরব নদে পড়ছে—এটা ঠিক। কিন্তু এই পানি এখন শোধন করে নদে ফেলা বড় প্রকল্পের বিষয়, যা স্বল্প সময়ে সম্ভব নয়। ১৪টি ড্রেনের পানি পরিশোধন করার প্রকল্প বাস্তবায়ন করার মতো টাকা পৌরসভার নিজস্ব তহবিলে নেই। নতুন প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন অনেক সময়সাপেক্ষ বিষয়। তারপরও অন্য কোনো পন্থা আছে কি না, তা পৌরসভার প্রকৌশলীদের সঙ্গে পরামর্শ করে দেখা হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নদতীরের বাসিন্দাদের প্রায় সবার বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পয়োবর্জ্য পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি নদে ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া পৌর কর্তৃপক্ষ শহরের ভেতরে নির্মিত পয়োনিষ্কাশনের সব নালার মুখ সরাসরি নদের ভেতরে নামিয়ে দিয়েছে। দড়াটানা সেতু, গরীব শাহ মাজার, কেন্দ্রীয় কারাগার, নীলগঞ্জ সেতু, ঝুমঝুমপুর বালিয়াডাঙ্গার পাশ দিয়ে পৌরসভার নালার বর্জ্য সরাসরি নদের ভেতরে পড়তে দেখা গেল।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে ভৈরব নদের দূষণ বিষয়ে প্রথম আলোয় সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এরপর ভৈরব নদ দূষণমুক্ত করার বিষয়ে ১৯ জুন যশোর জেলা সমন্বয় সভায় আলোচনা হয়। নদ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ও তদারকির জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী সায়েমুজ্জামানকে আহ্বায়ক ও পরিবেশ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক সাঈদ আনোয়ারকে সদস্যসচিব করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি উপকমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি নৌকা নিয়ে দুই দিন ঘুরে নদের পানি দূষণকারীদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। সেই তালিকা ধরে ৭ আগস্ট থেকে যশোর পৌরসভা, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারসহ ৯৮টি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছে এ বিষয়ে নোটিশ পাঠানো হচ্ছে।

যশোর পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো পরিবেশ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক সাঈদ আনোয়ার স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে বলা হয়েছে, যশোর পৌরসভা নালার মাধ্যমে অপসারিত পয়োবর্জ্যসহ অন্যান্য বর্জ্য সরাসরি নদে ফেলায় পানি দূষিত হচ্ছে এবং নদ ভরাট ত্বরান্বিত হচ্ছে। যা পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুসারে দণ্ডনীয় অপরাধ। ৩০ আগস্টের মধ্যে ভৈরব নদ দূষণমুক্ত না করলে ১ সেপ্টেম্বর থেকে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শহরের কাঠেরপুল সেতুর পাশ দিয়ে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের পয়োবর্জ্য ভৈরব নদে ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়ে ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেলের (ডিআইজি) কাছেও নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ডিআইজি (প্রিজন) ইকবাল কবির চৌধুরী বলেন, কারাগারে শৌচাগারের সেপটিক ট্যাংক রয়েছে। স্যুয়ারেজ লাইনের বর্জ্য নদে ফেলা হয় না। তবে বন্দীদের গোসল ও কাপড় ধোয়ামোছার পানি ড্রেনের মাধ্যমে নদে ফেলা হয়, এটা সত্য। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক সাঈদ আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, ভৈরব নদ যশোরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য এই নদ দূষণমুক্ত রাখা জরুরি। ৩০ আগস্টের মধ্যে নদ দূষণমুক্ত করার বিষয়ে ব্যবস্থা না নিলে, পরদিন ১ সেপ্টেম্বর থেকে পরিবেশ আইনে দূষণকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।