
নানির বাড়ির এলাকা দিনাজপুরের বিরামপুরে নির্বাচনী জনসভায় বেশ খোশমেজাজে ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মঞ্চে উঠেই বলেন, ‘কেমন আছেন আপনারা। আমি কিন্তু খুব ভালো আছি, বহু বছর পর নানির বাড়ি আসছি। এখন নাতি এল, কিছু খাওয়ালেন না, এটা কি ভালো কথা হলো। নাতি যে আসছে, তাহলে একটা জিনিস দিতে হবে নাতিকে। কী দেবেন নানি বাড়ির লোক। ভোট দেবেন। কিসে ভোট দেবেন, ধানের শীষে।’
তারেক রহমানের আবদারে জনসভায় উপস্থিত জনতা হাত নেড়ে তাঁর প্রতি সম্মতি জানান। আজ শনিবার বিকেল পৌনে চারটায় বিরামপুর সরকারি কলেজ মাঠে ধানের শীষে বিএনপির এই নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন তারেক রহমান। এ বক্তব্যে আগামীর বাংলাদেশ গড়তে বহু পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
এবারের ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ বহু বছর পর বাংলাদেশের মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘গত ১৬ বছরে আমাদের বহু রাজনৈতিক নেতা-কর্মী রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। আজকে আল্লাহর রহমতে আমাদের মাঝে এই সুযোগ এসেছে। এই এলাকার যত মানুষ আছে মুসলমান, হিন্দু, আদিবাসী, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ—সবাই মিলে আমরা ১২ তারিখে আমাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করব।’
এবারের নির্বাচনকে দেশ পুনর্গঠনের নির্বাচন উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ১৬ বছর ধরে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। নারীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। তরুণ সমাজ-যুব সমাজের ঠিকমতো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়নি। এলাকার উন্নয়ন করা হয়নি। মিল-ফ্যাক্টরি স্থাপন করা হয়নি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সন্তান যারা তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা ঠিকভাবে করা হয়নি। এলাকার রাস্তাঘাটের পুনর্নির্মাণ করা হয়নি, মেরামত করা হয়নি।
হাসপাতালগুলোতে ঠিকমতো ডাক্তারের ব্যবস্থা করা হয়নি। স্কুল-কলেজগুলোতে ঠিকমতো শিক্ষকের ব্যবস্থা করা হয়নি। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।
বক্তব্যে দিনাজপুরে কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলার আশ্বাস দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘এই এলাকার লিচু বিখ্যাত। কিন্তু এই লিচুকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করতে পারব কি না, সেটা চেষ্টা করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ১২ তারিখের নির্বাচনে বিএনপি জয়যুক্ত হলে দিনাজপুরের লিচুকে যেন হিমাগারে রাখতে পারি, ঠিকমতো বিদেশে পাঠাতে পারি—সেই পদক্ষেপ আমরা নিতে চাই। এই এলাকার কাটারিভোগ চাল জগদ্বিখ্যাত। এই চালকে আমরা পৃথিবীর আনাচকানাচে রপ্তানির মাধ্যমে পৌঁছে দিতে চাই।’
তারেক রহমান জানান, তাঁর দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নির্বাচনে বিজয়ী হলে যেসব কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ আছে, তাঁদের সুদসহ সেই কৃষিঋণ মওকুফ করে দেবে। তিনি বলেন, ‘মা-বোনদের হাতে যেমন ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। ঠিক একইভাবে কৃষক ভাইদের হাতে কৃষক কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। যে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষক ভাইদের ঋণ পেতে সুবিধা হবে।’
বক্তব্যে তারেক রহমান তাঁর প্রয়াত মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এই এলাকার সন্তান খালেদা জিয়া। উনি যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তখন সারা দেশের মেয়েদের ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা ফ্রি করে দিয়েছিলেন। আমরা চাই মা-বোনদের খালেদা জিয়া যে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিয়েছেন, সেই মা-বোনদেরসহ খেটে খাওয়া যত নারী আছে, গৃহিণী আছে সবার কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে। এই ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে মা-বোনদের কাছে সরকার থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সহযোগিতা পৌঁছে দিতে চাই। এর মাধ্যমে তাঁরা অর্থনৈতিকভাব ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারেন।’
বিএনপি জিতলে নিরাপদ ও মেধাভিত্তিক দেশ গঠন করা হবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা সেই বাংলাদেশ চাই যেখানে আমাদের মা-বোনেরা সন্ধ্যার পরও নিরাপদে রাস্তায় চলাচল করতে পারবে। যেখানে আমার ভাইয়েরা নিরাপদে জীবন যাপন করবে, চাকরি করবে, নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে। আমরা মুসলমান হই, আদিবাসী হই, হিন্দু হই, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান হই, আমাদের পরিচয় হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। আমাদের পরিচয় ধর্ম নয়, আমাদের পরিচয় হবে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে।’
বিএনপি সরকার গঠন করলে মসজিদের ইমাম, খতিব, অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সরকার থেকে প্রতি মাসে সম্মানীর ব্যবস্থা, নারী ও শিশুদের জন্য সারা দেশে পর্যায়ক্রমে এক লাখ হেলথকেয়ারার নিযুক্ত করা, দেশের শিক্ষকদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ, ছেলে-মেয়েদের বিদেশি ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান করা ও বৃহত্তর দিনাজপুর-রংপুরের মানুষের কষ্ট লাঘবে তিস্তা ব্যারেজ নিয়ে মহাপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন তারেক রহমান।
তারেক রহমান দিনাজপুর-৬ আসনে বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেনসহ চারটি নির্বাচনী আসনের বিএনপি প্রার্থীদের হাত তুলে মঞ্চে পরিচয় করে দেন। এ সময় তিনি তাঁদের ধানের শীষে ভোট দিতে এবং তাঁদের জন্য দোয়া চান।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির দিনাজপুর জেলা শাখার সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন (দুলাল)।