রাজশাহীর গোদাগাড়ী প্রেসক্লাব
রাজশাহীর গোদাগাড়ী প্রেসক্লাব

জুলাই যোদ্ধাদের দাবির মুখে প্রেসক্লাব ‘বন্ধ রাখার পরামর্শ’ দিলেন গোদাগাড়ীর ইউএনও

গোদাগাড়ীতে সম্প্রতি ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুলাই যোদ্ধা’ নামে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সংগঠনটির নেতাদের দাবির মুখে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা প্রেসক্লাব বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুস সাদাত। শনিবার সকালে প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি সাইফুল ইসলামকে ডেকে তিনি এ পরামর্শ দিয়েছেন। তবে ইউএনও পরে প্রথম আলোকে বলেছেন, কথাটা তিনি ওইভাবে বলেননি।

গোদাগাড়ীর স্থানীয় সাংবাদিকেরা জানান, ২০০৪ সালে এই প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সালে উপজেলা সদর ডাইংপাড়া মোড়ের একটি জায়গায় এক কক্ষের প্রেসক্লাব ভবন নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘদিন ওই প্রেসক্লাবের সভাপতি ছিলেন আলমগীর কবির (তোতা)। জুলাই যোদ্ধাদের অভিযোগ, আলমগীর কবির আওয়ামী লীগের দোসর। এটি সামনে এনে প্রেসক্লাবটি দখলের চেষ্টা চলছিল। সম্প্রতি প্রেসক্লাবের নতুন কমিটি করা হলেও সেই চেষ্টা থামেনি।

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুলাই যোদ্ধা’ নামের সংগঠনটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে প্রেসক্লাব ভবন দখল করে নিজেদের কার্যালয় খোলার চেষ্টা করছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. মুরশালিন গত মঙ্গলবার ইউএনওর কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এতে তিনি দাবি করেন, প্রেসক্লাবে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন করা হচ্ছে। এরপর সেদিনই তাঁর নেতৃত্বে প্রেসক্লাবে তালা দেওয়া হয়। পরে সাংবাদিকেরা তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। কিন্তু তাঁরা প্রেসক্লাবে বসতে পারছেন না। এ ঘটনায় সাংবাদিকেরা থানায় অভিযোগ দিলেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

প্রেসক্লাবের বর্তমান সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় তাঁরা প্রেসক্লাবে বসেছিলেন। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির সাবেক সদস্যসচিব মো. রহমতুল্লাহসহ কয়েকজন যান। তাঁরা তাঁকে জানান, প্রেসক্লাবের বিষয়ে ইউএনওর কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। সেই অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত যেন প্রেসক্লাব না খোলা হয়। সেই থেকে নিরাপত্তার সংকটে সাংবাদিকেরা প্রেসক্লাবে বসতে পারছেন না।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুলাই যোদ্ধার সভাপতি সাবিয়ার রহমান (মিল্টন) জানিয়েছেন, গণ–অভ্যুত্থানের পর থেকেই জুলাই আন্দোলনের আহত ব্যক্তিরা প্রেসক্লাবে নিজেদের অফিস করতে চাইছিলেন। তিনি ইতিমধ্যে কয়েক দফা সেই উদ্যোগ ঠেকিয়েছেন।

প্রেসক্লাবের সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, প্রেসক্লাব দখলের চেষ্টার বিষয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এতে আরও চটেছেন ইউএনও এবং জুলাই যোদ্ধারা। এখন জুলাই যোদ্ধারা নিজেদের অফিস করার দাবি থেকে সরে এসে প্রেসক্লাব গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে পাবলিক টয়লেট কিংবা যাত্রীছাউনি করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। সাইফুল বলেন, শনিবার সকালে ইউএনও নাজমুস সাদাত তাঁকে ডেকে পাঠান। এরপর তিনি উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কিছুদিন প্রেসক্লাব বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন। আর এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করা ‘ঠিক হয়নি’ বলেও জানান ইউএনও। জুলাই যোদ্ধাদের সরকারও ভয় পায়। সেখানে তাঁদের সঙ্গে মীমাংসা করে নেওয়াই ভালো হবে।

ইউএনওর এমন পরামর্শের নিন্দা জানিয়েছেন রাজশাহী এডিটরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব (অপু)। তিনি বলেন, ‘প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের নিজস্ব নিয়মে চলে। এখানে যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপই স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। ইউএনও সরকারি কর্মকর্তা। তাই তাঁর এমন পরামর্শ সরকারকে নিয়ে ভুল বার্তাও ছড়াতে পারে।’

প্রেসক্লাব বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও নাজমুস সাদাত দাবি করেন, তিনি ওইভাবে কথাটা বলেননি। তাঁর কাছে দুই পক্ষই বিষয়টা মীমাংসার জন্য সময় চেয়েছে। তাঁরা নিজেরা মীমাংসা করলে ভালো।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির সাবেক সদস্যসচিব মো. রহমতুল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, ‘প্রেসক্লাব আছে সরকারি জায়গায়। সাংবাদিকেরা কেন সরকারি জায়গায় বসবে? অন্য কোনো জায়গায় প্রেসক্লাব করলে প্রয়োজনে আমি ভাড়া দেব। কিন্তু এই প্রেসক্লাব রাখব না।’ তিনি অভিযোগ করেন, এই প্রেসক্লাব থেকে স্বৈরাচারের আমলে অনেক খারাপ কাজ হয়েছে। জঙ্গি নাটক সাজানো হয়েছে। এই প্রেসক্লাবের ওপর সাধারণ মানুষের অভিশাপ আছে।

এর আগে ২০১০ সালে একটি সংবাদ নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আতাউর রহমান খানের নির্দেশে তাঁর দলীয় কর্মীরা প্রেসক্লাবে তালা মেরে বন্ধ রেখেছিলেন। পরে প্রেসক্লাবটি আবার চালু হয়। ২০১৩ সালে বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এই ক্ষোভে এলাকার তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর নির্দেশে বুলডোজার দিয়ে প্রেসক্লাবটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরের বছর সংস্কার করে আবাার প্রেসক্লাবটি চালু করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দিন আগুন দিয়ে প্রেসক্লাবটি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ১৯ মাস বন্ধ থাকার পরে সংস্কার করে চলতি মাসে প্রেসক্লাবটি চালু করা হয়।