
ফেসবুকে জ্বালানি তেলের সংকটের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গতকাল মঙ্গলবার রাতে রাজশাহী নগরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। সন্ধ্যার পর থেকে ভিড় বাড়তে শুরু করে, তবে দিবাগত রাত ১২টার দিকে ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকা কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে ভিড় উপচে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে রাজশাহী জেলা প্রশাসন রাতেই জরুরি জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি দেয়। জানায়, জেলায় জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে। সরবরাহব্যবস্থাও স্বাভাবিক আছে। গুজবে কান না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি তেল কেনার পরামর্শ দেওয়া হয়।
রাজশাহী নগরের তালাইমারী এলাকার নয়ান ফিলিং স্টেশনে রাত ১২টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি। ফিলিং স্টেশনে দায়িত্বে থাকা মালিকের ছোট ভাই হাসান হাবিব বলেন, ‘রাত আটটার দিকে হঠাৎ খবর পাই, তেল নিয়ে সংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আল্লাহর রহমতে এখন পর্যন্ত সবাইকে তেল দিতে পারছি। কী পরিস্থিতি হবে, সেটা এখনই বলতে পারছি না।’
ভবিষ্যতে সংকট হতে পারে, এই আশঙ্কা থেকেই আগাম তেল সংগ্রহ করছি।মাশরাফি, ক্রেতা
হাসান হাবিব জানান, তাঁরা ডিপো থেকে তেল পাচ্ছেন। তবে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আপাতত একজন গ্রাহককে ৫০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। সাধারণ সময়ে তাঁদের স্টেশনে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ লিটার তেল আসে, যা সাত থেকে আট দিনে বিক্রি হয়। কিন্তু একই পরিমাণ তেল রাতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কারণেই মানুষ হঠাৎ তেল কিনতে ভিড় করছেন।
মাশরাফি নামের এক মোটরসাইকেলচালক বলেন, ‘তেলের দাম আগেই বেড়েছে। এখন আবার যুদ্ধের কারণে সংকটের খবর শুনে তেল নিতে এলাম। প্রায় এক সপ্তাহ আগে শেষবার তেল নিয়েছিলাম। ভবিষ্যতে সংকট হতে পারে, এই আশঙ্কা থেকেই আগাম তেল সংগ্রহ করছি।’
ফেসবুকে সব জায়গায় তেলের সংকটের খবর পেয়ে ফিলিং স্টেশনে আসার কথা জানালেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাহিদ। তিনি বলেন, ‘রাতেই তেল নিতে এসেছি। কাল যদি আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়, তাহলে আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য কষ্টকর হবে।’
এ বিষয়ে রাজশাহী পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আনিসুর রহমান বলেন, ডিপো থেকে গত দুই দিন ধরে রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরকার সংরক্ষিত মজুত ঠিক রাখার অংশ হিসেবে এ ব্যবস্থা নিয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা আগের মতো প্রয়োজন অনুযায়ী তেল পাচ্ছি না। সরকার নির্দিষ্ট পরিমাণ বরাদ্দ দিচ্ছে। তবে এটাকে সংকট বলা যাবে না। সরকার রিজার্ভ ঠিক রেখেই তেল দিচ্ছে।’
কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে, অযৌক্তিক দাম বাড়ালে বা মজুতদারির মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।কাজী শহিদুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক , রাজশাহী
সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি ডিপো থেকে মূলত রাজশাহীতে জ্বালানি তেল আসে। রাজশাহী পদ্মা অয়েল ডিপোর ইনচার্জ মো. ফজলে ইলাহী আজ বুধবার সকালে বলেন, রাজশাহীতে গত পরশু থেকে গুজব ছড়ানো হয়েছে যে তেলের সংকট। আর যুদ্ধও শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। আসলে কোনো সংকট নেই। পর্যাপ্ত তেল আছে। তাঁর দাবি, চট্টগ্রামে বন্দরে জাহাজভর্তি তেল আছে।
রাতে ফিলিং স্টেশনগুলোয় ভিড় বাড়ার পর রাজশাহী জেলা প্রশাসন ফেসবুকে জরুরি জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল কেনা বা মজুত করা থেকে বিরত থাকতে সবার প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানান। তিনি বলেন, কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে, অযৌক্তিক দাম বাড়ালে বা মজুতদারির মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।