
২৩ বছর আগে একমাত্র মেয়ে ফেরদৌসী খাতুন কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ায় নানি পাতা বেগম উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন, নাতনির বিয়েতে পাল্লায় মেপে সমান ওজনের ধাতব মুদ্রা বা পয়সা (কয়েন) উপহার দেবেন। নানা আবদুল কাদেরও স্ত্রীর নেই ইচ্ছাতে সায় দেন। এরপর স্ত্রীর ইচ্ছা পূরণ করতে মাটির ব্যাংকে কয়েন জমানো শুরু করেন আবদুল কাদের ও পাতা বেগম দম্পতি। বছর দুয়েক আগে মারা যান পাতা বেগম। কয়েক মাস পর নাতনি নাঈমা খাতুনের (২৩) ধুমধাম করে বিয়ে হয়। কিন্তু মাটির ব্যাংকে প্রয়োজনীয় ধাতব মুদ্রা না জমায় তখনো স্ত্রীর ইচ্ছা অপূর্ণই থেকে যায়। অবশেষে প্রয়াত স্ত্রীর ইচ্ছা পূরণ করলেন আবদুল কাদের।
গত শুক্রবার বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া দক্ষিণপাড়া এলাকায় নিজ বাড়িতে ধুমধাম অনুষ্ঠানের আয়োজন করে দাঁড়িপাল্লায় নাতনিকে তুলে সমান ওজনে ৭০ কেজি ৩০০ গ্রাম ধাতব মুদ্রা উপহার দেন আবদুল কাদের। অনুষ্ঠানে আত্মীয়স্বজন ও পাড়া–প্রতিবেশীসহ ১৫০ জন অতিথির জন্য খানাপিনার আয়োজন করা হয়।
পেশায় গাড়িচালক আবদুল কাদের তাঁর দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ে ফেরদৌসী বেগমকে সোনাতলা উপজেলায় বিয়ে দিয়েছেন। জামাতা লিমন হোসেন বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া এলাকার মুদিদোকানি। একমাত্র ছেলে তানজির হোসেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। মেয়ের ঘরের নাতনি নাঈমা খাতুনের স্বামী বগুড়া শহরের বেজোড়া এলাকার হৃদয় হোসেন রাজমিস্ত্রীর ঠিকাদারি পেশায় জড়িত। দাঁড়িপাল্লায় নাতনিকে তুলে সমান ওজনের পয়সা মেপে দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
আবদুল কাদের বলেন, ‘নাতনিকে উপহার দিতে ২৩ বছর ধরে মাটির ব্যাংকে এই দেড় বস্তা ধাতব মুদ্রা জমিয়েছি। নাতনির বিয়ের আগেই স্ত্রী পাতা বেগম মারা যাওয়ায় তাঁর ইচ্ছা পূরণ হয়নি। আর দেড় বছর আগে নাতনির বিয়ের সময় মাটির ব্যাংকে প্রয়োজনীয় ধাতব মুদ্রা না জমায় তখনো স্ত্রীর ইচ্ছা অপূর্ণই থেকেছে। তবে নাতনি অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় আর বিলম্ব করেননি। নানির ইচ্ছা অনুযায়ী, দাঁড়িপাল্লার একদিকে নাতনিকে তুলে অন্য পাল্লায় সমান ওজনের কয়েন (৭০ কেজি ৩০০ গ্রাম) উপহার দিয়েছি। নানি বেঁচে থাকলে তার ইচ্ছা পূরণের এই উপহার প্রদানে সবচেয়ে বেশি খুশি হতো।’
আবদুল কাদিরের ভাতিজা ও বগুড়া জেলা ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হাসান প্রথম আলোকে জানান, নাতনির জন্মের পর তাঁর চাচি ঘোষণা দিয়েছিলেন, বিয়েতে দাঁড়িপাল্লায় তুলে সমান ওজনের ধাতব মুদ্রা উপহার দেবেন। দুই বছর আগে তিনি মারা গেছেন। তাঁর ইচ্ছা পূরণ করতেই চাচা আবদুল কাদের শুক্রবার আত্মীয়স্বজন ও পাড়া–প্রতিবেশীসহ পরিচিত দেড় শতাধিক অতিথিকে নিমন্ত্রণ করে বাড়িতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।
আলমগীর বলেন, ‘সেখানে প্রীতিভোজের পর সবার সামনে দাঁড়িপাল্লার একদিকে নাঈমাকে তোলা হয়। অন্য পাল্লায় দেড় বস্তা ধাতব মুদ্রা মেপে দেওয়া হয়। ৭০ কেজি ৩০০ গ্রাম মুদ্রা উপহার দিতে হয়েছে আমার চাচাকে। বেশির ভাগ ছিল ৫ টাকার মুদ্রা। এই উপহার প্রদান অনুষ্ঠানে এসে সবাই খুব খুশি।’
নানার কাছ থেকে এমন ব্যতিক্রমী উপহার পেয়ে আবেগাপ্লুত নাতনি নাঈমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘নানির শখ ছিল আমার বিয়েতে এ ব্যতিক্রমী উপহার দেওয়ার। বিয়ের সময় নানার সামর্থ্য ছিল না, তবে নানির ইচ্ছা আজ পূরণ করলেন তিনি। নাতনির প্রতি নানার এ ভালোবাসায় অভিভূত আমি। নানি বেঁচে থাকলে আরও বেশি ভালো লাগত।’