বাগানের আমগাছ কেটে ফেলে রেখেছেন চাষি। খাগড়াছড়ি সদরের গোলাবাড়ি ইউনিয়নের তুন্যমাছড়া এলাকায়। গত বুধবার তোলা
বাগানের আমগাছ কেটে ফেলে রেখেছেন চাষি। খাগড়াছড়ি সদরের গোলাবাড়ি ইউনিয়নের তুন্যমাছড়া এলাকায়। গত বুধবার তোলা

মৌসুম শুরুর আগেই কেন আমগাছ কাটছেন খাগড়াছড়ির চাষিরা

আর কিছুদিন পরই শুরু হবে আমের মৌসুম। ইতিমধ্যে গাছে ফুটেছে মুকুল, কোথাও কোথাও ছোট ফলও ধরেছে। কিন্তু এমন সময়েও জেলার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক আমগাছ কেটে ফেলছেন চাষিরা। তাঁদের দাবি, সড়কে অতিরিক্ত টোল আদায় ও পরিবহন জটিলতায় আমের ন্যায্য মূল্য পান না তাঁরা, তাই আমগাছ কেটে ফেলছেন। এসব জায়গায় তাঁরা বিকল্প ফল অথবা সবজি চাষ করবেন।

খাগড়াছড়ি শাপলা চত্বর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে গোলাবাড়ি ইউনিয়নের তুন্যমাছড়া গ্রাম। সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার আমগাছ লাগিয়েছিলেন জ্ঞান জ্যোতি চাকমা। মৌসুম শুরু হলেই তাঁর বাগান ঘিরে থাকত উৎসবমুখর পরিবেশ। শ্রমিকদের ব্যস্ততা, পাইকারদের আনাগোনা, আমবোঝাই ঝুড়ি—সবকিছুর দেখা মিলত সেখানে। এরপরও তিনি বাগানের একটি অংশের গাছ কেটে ফেলেছেন।

জেলায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৯০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। চলতি বছরের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। গত বছর ৬২ হাজার ১৭৯ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়েছিল। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি ঢাল ও সমতল মিলিয়ে গত এক যুগে আম চাষ বেড়েছে। এর মধ্যে রাংগুই ও আম্রপালি জাতের আমের চাষ বেশি।

সম্প্রতি জ্ঞান জ্যোতি চাকমার বাগানে গিয়ে দেখা যায়, একের পর আমগাছ কাটছেন তিনি। তাঁর বাগানে রাংগুই, আম্রপালি, বারি-৪–সহ বিভিন্ন জাতের গাছ রয়েছে। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ১ হাজার ২০০ আমগাছ কেটে ফেলেছেন। আমের গাড়ি থেকে টোল আদায়ের নামে জেলা পরিষদের চাঁদা, বাজার ফান্ড, পৌরসভার রাস্তায় রাস্তায় টোল—সব মিলিয়ে এমন অবস্থা হয়েছে, লাভ তো দূরের কথা, এখন খরচই ওঠে না। এর ওপর বাজারেও ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না। তাই তিনিসহ অনেক আমবাগানি বাধ্য হয়ে গাছ কেটে ফেলছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৯০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। চলতি বছরের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। গত বছর ৬২ হাজার ১৭৯ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়েছিল। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি ঢাল ও সমতল মিলিয়ে গত এক যুগে আম চাষ বেড়েছে। এর মধ্যে রাংগুই ও আম্রপালি জাতের আমের চাষ বেশি।

আমার বাগানে প্রায় ১০০ রাংগুই আমগাছ ছিল। কয়েক বছর ধরে শ্রমিকদের টাকাও উঠছে না। মৌসুম শেষে হিসাব করলে দেখা যায় ঋণ বাড়ছে। তাই অনেকটা অভিমান করে গাছগুলো কেটে ফেলেছি।
মিত্র চাকমা, আমচাষি, পেরাছড়া-খাগড়াছড়ি।

বাগানমালিকদের দাবি, সার, কীটনাশক, সেচ, পরিচর্যা, শ্রমিকের মজুরি—সব মিলিয়ে আম উৎপাদনের খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। একসময় যে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ছিল ২০০ থেকে ৪০০ টাকা, এখন তা বেড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা হয়েছে। এ ছাড়া এলাকা দুর্গম হওয়ায় শ্রমিকসংকটও দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত টোলও রয়েছে। এসব কারণে তাঁরা ধীরে ধীরে আমের বাণিজ্যিক চাষ কমিয়ে দিচ্ছেন।

পেরাছড়া এলাকার বাগানমালিক মিত্র চাকমা বলেন, ‘আমার বাগানে প্রায় ১০০ রাংগুই আমগাছ ছিল। কয়েক বছর ধরে শ্রমিকদের টাকাও উঠছে না। মৌসুম শেষে হিসাব করলে দেখা যায় ঋণ বাড়ছে। তাই অনেকটা অভিমান করে গাছগুলো কেটে ফেলেছি।’

টোল বেশি, আসেন না পাইকার

চলতি বছর এখনো মৌসুম শুরু হয়নি। তাই চলতি টোল আদায়ের হিসাব নেই। তবে গত বছরের টোলের চিত্র বিশ্লেষণ করেছে প্রথম আলো। জেলার ব্যবসায়ী ও চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাগড়াছড়ি থেকে অন্য জেলায় আম পরিবহনের সময় একবার টোল আদায় করে পৌরসভা। তারা নেয় ক্রেটপ্রতি (২০ থেকে ২২ কেজি) ১০ টাকা। এ হিসাবে দুই হাজার কেজি আমবাহী পিকআপে টোল দিতে হয় ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা।

বাগানের একটি অংশে কাটা হয়েছে আমগাছ। গত বুধবার খাগড়াছড়ি সদরের গোলাবাড়ি ইউনিয়নের তুন্যমাছড়া এলাকা থেকে তোলা

পৌরসভার টোলের পর জেলা পরিষদকেও টোল দিতে হয়। জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘বাজার ফান্ড’ চেঙ্গী সেতু এলাকায় রসিদ কেটে আদায় করে ক্রেটপ্রতি ১০ টাকা। সে হিসাবে এখানেও ২ হাজার কেজি আমবাহী পিকআপে টোল দিতে হয় ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা। একই সংস্থা খাগড়াছড়ি জেলা থেকে বের হওয়ার মুখে রামগড় সোনাইপুল ও মানিকছড়ির গাড়িটানা এলাকায় আবার টোল আদায় করে। এখানে গাড়িপ্রতি নেওয়া হয় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানীয় সংগঠনও চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নেয়।

বাগানমালিকদের অভিযোগ, আম পরিবহনের পথে একাধিক স্থানে টোল দিতে হয়। জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও বাজার কমিটি বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায় করে। এতে পাইকারদের খরচ বেড়ে যায়। সেই চাপ পড়ে চাষির ওপর। এ কারণে বাগান থেকেই কম দামে আম বিক্রি করতে হয়।

মরাটিলা এলাকার চাষি সত্যজিৎ ত্রিপুরা বলেন, ‘আমার বাগান দুর্গম এলাকায়। সেখান থেকে আম শহরে নিতে পরিবহন খরচ বেশি পড়ে। এর ওপর পৌরসভা, বাজার ফান্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় অতিরিক্ত টোলের কারণে ছয় থেকে সাত বছর ধরে ব্যাপারীরা সহজে আসছেন না। অনেকে এলেও দাম কম দিচ্ছেন।’

খাগড়াছড়ি বাগান মালিক সমিতির উপদেষ্টা অনিমেষ চাকমা বলেন, ‘খাগড়াছড়ি জেলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে যে পরিমাণ টোল আদায় করা হয়, দেশের অন্য কোথাও তা করা হয় না। এতে আমবাগানের মালিকেরা প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। অতীতে আমরা এসব চাঁদা ও টোলের বিরুদ্ধে মিটিং-মিছিল, সাংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দিয়েছি। কিন্তু কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। তাই চাষিরা গাছ কাটছেন।’

বিপাকে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা

প্রতি মৌসুমে খাগড়াছড়ির আমবাগানে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন হাজারো শ্রমিক। এ ছাড়া পরিবহনকর্মী, ঝুড়ি-কার্টুন ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র দোকানদারসহ অনেক পেশাজীবী মানুষ এ চাষের ওপর নির্ভরশীল। গাছ কমে যাওয়ায় তাঁরাও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

জেলার মরাটিলা এলাকার তৈফা ত্রিপুরা বলেন, আমের মৌসুমে বাগানে কাজ করে পরিবার চালানোর একটি বড় সুযোগ পাওয়া যায়। যদি বাগান কমে যায়, তাহলে মৌসুমি এই আয়ও বন্ধ হয়ে যাবে। খাগড়াছড়ি বাজারের মৌসুমি ফল ব্যবসায়ী আবদুল মালেক বলেন, সঠিক সংরক্ষণাগার, গ্রেডিং ও প্যাকেজিং সুবিধা গড়ে তোলা গেলে খাগড়াছড়ির আম দেশের বড় শহর, এমনকি রপ্তানি বাজারেও জায়গা করে নিতে পারত। কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হয়নি।

প্রতি মৌসুমেই অনলাইনে আম বিক্রি করেন মো. মেহেদি ও উখ্যামং মারমা। জানত চাইলে তাঁরা বলেন, খাগড়াছড়ির আমের মান ভালো, স্বাদও আলাদা। কিন্তু সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনে সমন্বয় নেই। টোলের বিষয়টি আলাদা চাপ তৈরি করে।

খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ‘কৃষকেরা গাছ কাটছেন—এমন তথ্য কৃষি বিভাগের জানা নেই। কোনো কৃষক যদি সহযোগিতা চাইতেন, আমরা গাছ না কাটার পরামর্শ দিতাম। গাছের নিচে ফাঁকা স্থানে কী চাষ করা যায় এ পরামর্শ দিতাম। এরপরও যাঁরা গাছ কেটেছেন, তাঁদের খোঁজ নেব।’

জানতে চাইলে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘চাঁদা অথবা অতিরিক্ত টোলের বিষয়ে জেলা প্রশাসন খুবই সতর্ক অবস্থানে ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। বিগত বছরগুলোতেও টোলকেন্দ্রগুলোয় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। সামনে মৌসুমেও এটি অব্যাহত থাকবে।’