মশায় অতিষ্ঠ হয়ে দিনের বেলাতেও মশারি টাঙিয়ে বসে আছেন নৈশপ্রহরী তাজুল ইসলাম। গতকাল সোমবার রংপুর নগরের সাতগাড়া মিস্ত্রীপাড়া এলাকায়
মশায় অতিষ্ঠ হয়ে দিনের বেলাতেও মশারি টাঙিয়ে বসে আছেন নৈশপ্রহরী তাজুল ইসলাম। গতকাল সোমবার রংপুর নগরের সাতগাড়া মিস্ত্রীপাড়া এলাকায়

রংপুরে মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ নগরবাসী, ‘ক্রাশ প্রোগ্রামেও’ সুফল মিলছে না

রংপুর সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাতগড়া মিস্ত্রিপাড়া এলাকার একটি বাসার নৈশপ্রহরী তাজুল ইসলাম। দিনের বেলাতেও তিনি তাঁর থাকার চৌকিতে মশারি টানিয়ে বসে থাকেন। কারণ হিসেবে তাজুল জানালেন, মশার উপদ্রব বেশি। মশারি না টানালে থাকা যায় না।

এই যন্ত্রণা শুধু তাজুল ইসলামের নয়, রংপুর সিটির ৩৩টি ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের। সরকারি হিসাবে রংপুর সিটির জনসংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। বেসরকারি হিসাবে তা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর কমবেশি মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। নগরবাসীর অভিযোগ, ২০৫ বর্গকিলোমিটারের রংপুর সিটিতে খাল-নালা-নর্দমা পরিষ্কার না করা ও নিয়মিত ওষুধ না ছিটানোয় মশার উপদ্রব চরম আকার ধারণ করেছে।

নৈশপ্রহরী তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘চাইরো পাশে ডোবা, ময়লা পানি। তাতে মশা আর মশা। দিন-রাত সমানে মশা কামড়ায়। মশার কামড়ে জ্বরে জ্বরে শরীর আর ভালো হয় না। চাকরি নিবার এক বছর হয়, একদিনও মশা মারার জন্য কাইও আসে নাই।’

অবশ্য গত ১৭ মার্চ থেকে মশা নিধনে ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ নেওয়ার কথা বলছে সিটি করপোরেশন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৫ মার্চ সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরীর যোগদানের পর সমস্যা চিহ্নিত করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সভা করছেন তিনি। এতে নগরের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের গতি এসেছে। মশকনিধনে ঝোপঝাড় ও নালার ফাঁকা স্থানে অ্যাডাল্টিসাইড ও জলাবদ্ধ স্থানে মশার লার্ভা ধ্বংস করতে লার্ভিসাইট ছিটানো হয়েছে। একই সঙ্গে ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কীটতত্ত্বীয় টেকনিশিয়ানদের সহযোগিতায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কামরুজ্জামান ইবনে তাজ প্রথম আলোকে বলেন, মশা মারতে তাঁরা যে ওষুধ দেন, তা ঢাকার দুই সিটিতে পরীক্ষিত। তবু স্থানীয়ভাবে পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওষুধ আদৌও কতটুকু কার্যকর দেখা হবে। কীটতত্ত্বীয় টেকনিশিয়ানদের সহযোগিতায় আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পরীক্ষা করা হবে।

কিউলেক্স মশা বেশি

বাংলাদেশে সাধারণত তিন প্রজাতির মশার বিস্তার দেখা যায়—কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস। এর মধ্যে কিউলেক্সের বিস্তারই বেশি। কিউলেক্সের কামড়ে ফাইলেরিয়া বা গোদরোগ ও জাপানি এনসেফালাইটিস হয়। এডিসের কামড়ে ডেঙ্গু এবং অ্যানোফিলিসের কামড়ে ম্যালেরিয়া হয়।

মশার উপদ্রব কোন কোন এলাকায় বেশি, তা নিয়ে সিটি করপোরেশনের কোনো জরিপ নেই; নেই কোনো গবেষণাও। তবে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে সাধারণত মশা ও অন্যান্য পতঙ্গবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে জরিপ, নমুনা সংগ্রহ, ল্যাবরেটরিতে কীটপতঙ্গ বিশ্লেষণ ও কীটনাশক প্রয়োগের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হয়। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে কাজটি করেন কীটতত্ত্বীয় টেকনিশিয়ান মাহাবুবা ফেরদৌসী ও মো. আলাউদ্দিন।

মাহাবুবা ফেরদৌসী প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা বছরে তিনবার মশা নিয়ে জরিপ করেন। এ বছর বর্ষার আগেই প্রাক্‌–মৌসুমি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। গত মার্চে তাঁরা রংপুর সিটির ঘনবসতি এলাকা কেরানিপাড়া, রাধাবল্লব, সেনপাড়া, মুন্সিপাড়া, গুপ্তপাড়া, কটকটিপাড়া ও বাস টার্মিনাল এলাকায় মশা সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ৬০ শতাংশ কিউলেক্স মশা পাওয়া গেছে। আর্মিজেরাস (কিউলেক্সর আরেকটি প্রজাতি) মশা পাওয়া গেছে ৩০ শতাংশ। এটি আকারে বড় হয়। এ ছাড়া এডিস ২ শতাংশ ও বাকি ৮ শতাংশ অন্যান্য জাতের মশা পাওয়া গেছে।

সিটি করপোরেশন এলাকায় ঝোপঝাড় ও ধানখেত বেশি হওয়ায় কিউলেক্স মশা বেশি বলে জানালেন প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কামরুজ্জামান ইবনে তাজ। আর কীটতত্ত্বীয় টেকনিশিয়ান মো. আলাউদ্দিন বলেন, রংপুর ফাইলেরিয়া প্রবণ অঞ্চল। কিউলেক্স মশা ফাইলেরিয়া রোগের বাহক। মানবসৃষ্ট বর্জ্য, গৃহপালিত পশুপাখির বর্জ্য ও পানি একত্রে হলে এই মশা বংশবিস্তার করে। রংপুরে এই মশা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ফাইলেরিয়া নির্মূলে তিন দফা কর্মসূচি দিলেও রংপুর অঞ্চল সফল হয়নি।

এ ছাড়া প্রাক্‌–মৌসুমি বৃষ্টির কারণে এ বছর এডিস মশার লার্ভা তৈরি হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে রংপুর সিটি করপোরেশনে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে বলে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

মশার অত্যাচারে বাসাবাড়িতে টেকা দায়

নগরের কেরানীপাড়া, মুন্সিপাড়া, রাধাবল্লব, গুপ্তপাড়া ও সেনপাড়া এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিন-দুপুরেও মশার কামড়ে অতিষ্ঠ মানুষ। বিশেষ করে নগরের মধ্য দিয়ে যাওয়া প্রায় ১৬ কিলোমিটার শ্যামাসুন্দরী খালের (মতান্তরে নদী) জমাটবাঁধা পানি মশার প্রজনন স্থান হয়ে গেছে। প্রায় ৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কেডি খালেরও একই অবস্থা।

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাও বলছেন, শ্যামাসুন্দরী ও কেডি খালে কচুরিপানা জমে থাকছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির ময়লাও ফেলা হচ্ছে। নগরের দুর্বল নালা ব্যবস্থা ও খোলা নালাতেও প্রচুর মশা জন্মাচ্ছে। এ ছাড়া সামান্য বৃষ্টিতে নগরে জলাবদ্ধতা মশা বাড়ার অন্যতম কারণ।

শ্যামাসুন্দরী খাল-সংলগ্ন পাশারীপাড়ার বাসিন্দা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ময়লা পানি ও বর্জ্যের দুর্গন্ধ ও মশার উপদ্রবে বাসাবাড়িতে টেকা দায়। বাড়ির বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আপনাকে বোঝাতে পারব না, কী পরিমাণ মশা। ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ দেয়। ওটা দিয়ে কি মশা মারা যায়!’

‘ক্রাশ প্রোগ্রামে’ কী হচ্ছে

সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, মশকনিধন অভিযানে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৬ জন কর্মী বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাজ করছেন। তাঁদের দেখভাল করেন ১২ জন তত্ত্বাবধায়ক। প্রতিদিন সাতটি ওষুধ ছিটানোর মেশিন দিয়ে জলাবদ্ধ স্থানে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করে মশার লার্ভা ধ্বংস করা হচ্ছে। এ ছাড়া দুপুরের পর থেকে ৩০টি ফগার মেশিন দিয়ে অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগ করছে। শ্যামাসুন্দরী ও কেডি খালের কচুরিপানা ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রমের তদারকি করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহরিয়ার রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রচুর কমপ্লেন (অভিযোগ) পাচ্ছি। মশার প্রকোপ বেশি। এ কারণে জনবল ও কার্যক্রম বৃদ্ধি করা হয়েছে। আপাতত ১৫টি ওয়ার্ডে কার্যক্রম চললেও পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হচ্ছে।’

তবে সিটি করপোরেশনে নতুন সম্প্রসারিত ১৮টি ওয়ার্ডে মশকনিধন কার্যক্রম না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাহারকাছনা তেলিপাড়ার বাসিন্দা ফারুক হোসেন বলেন, তাঁরা সব সময় সুবিধাবঞ্চিত। মশার কামড়ে অতিষ্ঠ। বাসার দরজা-জানালা বন্ধ রেখে এবং অ্যারোসল ছিটিয়েও মশার যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান মোখলেছুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, রংপুর মেডিকেল কলেজের ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু ও নগরায়ণের ধরন বিবেচনা করলে মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত মশা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করা উচিত। মশা মারার চেয়ে মশার জন্মস্থান ধ্বংস করা বেশি সাশ্রয়ী ও স্থায়ী সমাধান। সিটি করপোরেশনকে নিয়মিত এই কাজ করে যেতে হবে।