দীপেন দেওয়ান
দীপেন দেওয়ান

পার্বত্য মন্ত্রীর পদত্যাগ নিয়ে ফেসবুক পোস্টে যা লিখলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এ বিষয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির উপজাতিবিষয়ক সহসম্পাদক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মনীষ দেওয়ান। আজ মঙ্গলবার সকালে দেওয়া ওই পোস্টে তিনি দাবি করেন, রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নের সুপারিশকে কেন্দ্র করেই পদত্যাগ করতে হয়েছে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানকে।

ফেসবুক পোস্টে মনীষ দেওয়ান লিখেছেন, ‘এ মুহূর্তে দেশ ও জাতির প্রয়োজনে সত্যকথনের জরুরি দরকার। দীপেন দেওয়ান তাঁর মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন শুধুমাত্র একটি কারণে। তিনি আসন্ন রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছিলেন আমাকে।’ তিনি লেখেন, ‘পার্বত্য মন্ত্রী (প্রতিমন্ত্রী) ব্যারিস্টার মীর হেলাল চেয়েছিলেন, দীপেন তালুকদার দিপু, সভাপতি, জেলা বিএনপিকে। যিনি জুলাই আন্দোলনে ছয় মাস রাঙামাটি থেকে আত্মগোপনে ছিলেন এবং ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন ধরনের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও কুখ্যাত আওয়ামী নেতাদের প্রশ্রয় দিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন—এটি রাঙামাটিবাসী সকলেই অবগত আছেন।’

মনীষ দেওয়ান আরও লেখেন, ‘খুবই দুঃখজনক যে সুপারিশের এই দ্বন্দ্বে আমাদের পূর্ণ মন্ত্রী, পাহাড়ি-বাঙালির প্রিয় নেতা, সর্বোচ্চ ভোটে নির্বাচিত দীপন দেওয়ান হেরে গেছেন। শুধু তা–ই নয়, তাঁকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে পদত্যাগপত্র আদায় করা হয়েছে। আমি এ বিচারের ভার দেশপ্রেমী পার্বত্যবাসী ও দেশবাসীর উদ্দেশে নিবেদন করলাম।’

নিজের পরিচয় দিয়ে ফেসবুক পোস্টে মনীষ দেওয়ান লেখেন, ‘আমি বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১৭ ডিসেম্বর ’৭১-এ রাঙামাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকারী, ’৭১-এ শহীদ জিয়ার সহযোদ্ধা, ৩৬ জুলাই আন্দোলনের প্রথম সারির যোদ্ধা।’

ফেসবুক পোস্টে দেওয়া বক্তব্য নিজের বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন মনীষ দেওয়ান। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ নিয়ে বিভিন্নজন বিভিন্ন জল্পনাকল্পনা করছেন। আসল ঘটনা খোলাসা করার জন্য আমি এই পোস্ট দিয়েছি। তাঁর (দীপেন দেওয়ান) ইচ্ছার বিরুদ্ধে পদত্যাগপত্র আদায় করা হয়েছে।’

বিএনপি নেতা মনীষ দেওয়ানের ফেসবুক পোস্ট।

মনীষ দেওয়ানের ফেসবুক পোস্ট সম্পর্কে জানতে চাইলে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই ফেসবুক পোস্ট আমি দেখিনি। আর কে কী বলল, তা নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। তবে আমি রাজপথে ছিলাম কি না, তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দলের নেতা-কর্মীরা সবাই জানেন।’

পার্বত্য রাঙামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছেন কি না, জানতে চাইলে দীপন তালুকদার বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে যেখানে যে দায়িত্ব দেবেন, সেটি গ্রহণ করতে সব সময় প্রস্তুত।’

মন্ত্রণালয় পরিচালনায় কর্তৃত্ব, রাঙামাটি জেলা বিএনপির রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ ঘিরে দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করে থাকতে পারেন—গতকাল সোমবার দিনভর এমন আলোচনা বেশি ছিল। তবে সরকার-সংশ্লিষ্ট কোনো সূত্র থেকে নিশ্চিত করে পদত্যাগের কারণ জানা যায়নি।

তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক রাজনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, দীপেন দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে অস্বস্তিতে ছিলেন। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, এই মন্ত্রণালয়ে পাহাড়ি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পাশাপাশি চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া। এই মন্ত্রণালয়ে পার্বত্য এলাকার বাইরে থেকে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ এই প্রথম এবং বিষয়টি নিয়ে পাহাড়িদের মধ্যে প্রশ্ন ছিল। তাঁরা মনে করেন, এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পাহাড়ি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীরই প্রাপ্য। তবে এসব আলোচনার বিষয়ে গতকাল দীপেন দেওয়ানের বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের কারণ হিসেবে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে দূরত্ব ছিল বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে তুলে ধরছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘দীপেন চাচার সঙ্গে আমার কোনো দূরত্ব নেই। আমাদের দুজনের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। আমার আব্বা (সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন) যখন জুডিশিয়ারিতে ছিলেন, তখন তিনি সহকর্মী ছিলেন।’

মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কখনো দূরত্ব ছিল না। পদত্যাগের বিষয়টি জানতে পেরে আমি ওনাকে ফোন করেছিলাম। কিন্তু ওনাকে পাওয়া যায়নি। তবে উনি অসুস্থ ছিলেন শুনেছি। কেন পদত্যাগ করেছেন, বুঝতে পারছি না।’

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন

গতকাল দীপেন দেওয়ান শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দেন। পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন, ‘আমি দীপেন দেওয়ান, এমপি, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। দায়িত্ব গ্রহণের পর হতে আমি শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছি। আমার শারীরিক অসুস্থতার কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নানাবিধ সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধির স্বার্থে আমার বর্তমান পদ থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করা আবশ্যক বলে মনে করছি। অতএব উপর্যুক্ত কারণে আমার পদত্যাগপত্র গ্রহণের জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।’

এদিকে দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল রাঙামাটিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করার আহ্বান জানিয়েছেন।