
আগে আমরা ভাবতাম হাই কোলেস্টেরল, ফ্যাটি লিভার, হার্টের রোগ—এগুলো ৫০-৬০ বছরের মানুষের অসুখ। এখন চট্টগ্রাম বা ঢাকার কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গেলেই দেখা যায়, ২২-২৩ বছরের ছেলের লিভারে চর্বি জমেছে, ২৮ বছরের মেয়ের কোলেস্টেরল ২৮০। বয়স কমছে, কিন্তু রোগ বাড়ছে। এটাই মেটাবলিক ডিজঅর্ডারের (বিপাকীয় সমস্যা) নতুন বাস্তবতা।
মেটাবলিক ডিজঅর্ডার কোনো একক রোগ নয়, এটি একটি চক্র। এর মূলে রয়েছে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। আমাদের শরীর যখন অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত শর্করা সামলাতে পারে না, তখন এই চক্র শুরু হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অস্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অনিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ এবং ধীরে ধীরে ওজন বাড়ার মতো বিষয়।
আমাদের খাবারের ধরনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে ভাত, শাক, মাছ ও ডাল ছিল প্রধান খাবার। এখন অনেকের নাশতায় বার্গার, দুপুরে বিরিয়ানি ও কোমল পানীয়, রাতে ভাজা মুরগির মতো খাবার নিয়মিত জায়গা করে নিয়েছে। অতিরিক্ত ভাজা-পোড়া খাবার, ট্রান্স ফ্যাট ও চিনিযুক্ত পানীয় শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি জমায়। এগুলো লিভারে চর্বি জমা এবং রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বসে থাকার জীবনযাপন। একজন তরুণ দিনের ৭-৯ ঘণ্টা পর্যন্ত পর্দার সামনে কাটাতে পারেন; ক্লাস, ফ্রিল্যান্সিং, গেমিং কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে। শরীরচর্চার সুযোগ কমে গেলে পেশি সক্রিয় থাকে না। ফলে শরীরের শক্তি খরচ কমে যায় এবং অতিরিক্ত চর্বি বিশেষ করে পেট ও লিভারে জমতে পারে।
ঘুম ও মানসিক চাপও এই সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। রাত ২টা পর্যন্ত জেগে থাকা এবং সকালে দেরিতে ওঠার মতো অনিয়মিত ঘুম শরীরের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপে কর্টিসল নামের হরমোনের মাত্রা বাড়তে পারে। এ কারণে রক্তে শর্করা ও ক্ষুধা বাড়ার পাশাপাশি ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
আরেকটি বিষয় হলো, শুধু ওজন দেখেই শরীরের সুস্থতা বিচার করা যায় না। অনেক মানুষ বাইরে থেকে রোগা হলেও শরীরের ভেতরে অতিরিক্ত চর্বি থাকতে পারে। একে অনেক সময় ‘স্কিনি ফ্যাট’ বলা হয়। তাই ওজন কম মানেই যে শরীর বিপাকীয়ভাবে সুস্থ, এমনটি নয়।
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রমের লক্ষ রাখা যেতে পারে। এর জন্য জিমে যেতেই হবে, এমন নয়। প্রতিদিন ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, সম্ভব হলে সিঁড়ি ব্যবহার করা এবং দীর্ঘ সময় বসে কাজ করলে প্রতি ৪৫ মিনিট পর কয়েক মিনিট উঠে হাঁটাও উপকারী হতে পারে।
হাই কোলেস্টেরল, ফ্যাটি লিভার এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। অল্প বয়স থেকেই ধমনিতে চর্বি জমার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। দীর্ঘদিন তা চলতে থাকলে পরবর্তী সময়ে ধমনিতে ব্লক তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। হাই কোলেস্টেরলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, অনেক সময় এর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। ফলে হঠাৎ বুকে ব্যথা বা হৃদ্রোগের মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দেওয়ার আগে একজন মানুষ নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে বুঝতেই পারেন না।
ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যায়। শুরুতে অনেকের তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না। কারও কারও ক্লান্তি বা পেটের ডান পাশে ভারী লাগার মতো অনুভূতি হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন চিকিৎসা ও জীবনযাপনে পরিবর্তন না আনলে ফ্যাটি লিভার ধীরে ধীরে আরও গুরুতর অবস্থার দিকে যেতে পারে, এমনকি লিভার সিরোসিসও হতে পারে।
হাই কোলেস্টেরল, ফ্যাটি লিভার, ধূমপান বা ভেপিং এবং উচ্চ রক্তচাপ একসঙ্গে থাকলে অল্প বয়সেও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই হৃদ্রোগকে শুধু বয়স্ক মানুষের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তরুণ বয়স থেকেই ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
তবে আশার বিষয় হলো, মেটাবলিক ডিজঅর্ডারের অনেক ঝুঁকি জীবনযাপনে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে কমানো সম্ভব। এ জন্য প্রথমেই খাবারের দিকে নজর দিতে হবে। চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত ভাজা খাবার এবং সাদা রুটি বা ময়দাজাতীয় খাবার কমাতে হবে। এর পরিবর্তে আঁশযুক্ত খাবার যেমন লাল চাল ও শাকসবজি, পরিমিত ভালো চর্বি যেমন বাদাম, সামুদ্রিক মাছ ও শর্ষের তেল এবং পর্যাপ্ত প্রোটিন যেমন ডিম, ডাল ও মুরগি খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রমের লক্ষ রাখা যেতে পারে। এর জন্য জিমে যেতেই হবে, এমন নয়। প্রতিদিন ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, সম্ভব হলে সিঁড়ি ব্যবহার করা এবং দীর্ঘ সময় বসে কাজ করলে প্রতি ৪৫ মিনিট পর কয়েক মিনিট উঠে হাঁটাও উপকারী হতে পারে।
ঘুমকেও গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত সাত-আট ঘণ্টা ঘুম শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করে। সম্ভব হলে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও জাগার অভ্যাস তৈরি করা উচিত। একই সঙ্গে ধূমপান ও ভেপিং এড়িয়ে চলতে হবে এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হবে।
ঝুঁকি থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও প্রয়োজন। ২৫ বছর বয়সের পর নিয়মিতভাবে শরীরের ওজন, কোমরের মাপ, রক্তচাপ, রক্তে চর্বির মাত্রা এবং লিভারের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা যেতে পারে। পরিবারে ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে আরও আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কোনো পরীক্ষা বা ওষুধ নিজে থেকে শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
তরুণ বয়স মানে শুধু ক্যারিয়ার গড়ার সময় নয়, শরীর গড়ারও সময়। আজ যে বার্গার, কোমল পানীয় বা অতিরিক্ত ভাজা খাবারকে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে, দীর্ঘদিনের অভ্যাস হয়ে গেলে ভবিষ্যতে সেটিই বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মেটাবলিক ডিজঅর্ডার পুরোপুরি ভাগ্যের বিষয় নয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের সঙ্গে এর ঝুঁকি অনেকটাই জড়িত। সিদ্ধান্ত বদলালে ফলও বদলানো সম্ভব।
মো. আবদুর রব, সহযোগী অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ