ফসল ফলাতে না পেরে ক্ষতিগ্রস্ত চাষি নজরুল ইসলাম পলিনেট হাউসের সম্পূর্ণ পলিথিন খুলে রেখেছেন। গত ৩০ আগস্ট পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার ববখতারপুর গ্রামে
ফসল ফলাতে না পেরে ক্ষতিগ্রস্ত চাষি নজরুল ইসলাম পলিনেট হাউসের সম্পূর্ণ পলিথিন খুলে রেখেছেন। গত ৩০ আগস্ট পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার ববখতারপুর  গ্রামে

২৫ কোটি টাকার যে কৃষি প্রকল্পে সাফল্যের গল্প বানিয়ে বলতে হয়

নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বছরব্যাপী ফসল উৎপাদন করতে রাজশাহী বিভাগের ১০২ জন চাষিকে ‘পলিনেট হাউস’ নির্মাণ করে দিয়েছিল কৃষি বিভাগ। একটি প্রকল্পের আওতায় তিন বছর আগে ওই হাউস নির্মাণ করার সময় চাষিদের বলা হয়েছিল, অসময়ে বিভিন্ন ধরনের ফসল ফলিয়ে তাঁরা লাভবান হবেন। কিন্তু তিন বছর পরে এসে দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ পলিনেট হাউসে ফসল উৎপাদনই হচ্ছে না।

এরপরও কৃষি বিভাগের অনুষ্ঠানে সাফল্যের গল্প বানিয়ে বলতে হয়েছিল চাষিদের। ‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি নিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকার।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ প্রকল্পের আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০২টি পলিনেট হাউস নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। আর প্রতিটি হাউস তৈরিতে গড়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা।

পলিনেট হাউস হলো বিশেষ পলিথিন, নেট ও লোহার কাঠামো দিয়ে তৈরি একধরনের ঘর। প্রতিকূল আবহাওয়া, পোকামাকড় ও রোগবালাই থেকে ফসল এবং চারা অনেকটাই সুরক্ষিত রেখে সারা বছর চাষাবাদের প্রযুক্তি রয়েছে এই ঘরে। এমনকি প্রয়োজন অনুযায়ী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও সেচের ব্যবস্থাও এতে যুক্ত থাকে বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, যেসব চাষিকে পলিনেট হাউস তৈরি করে দিয়েছে সরকার, তাঁদের সবার সঙ্গে ২৫ বছরের চুক্তি করেছে কৃষি বিভাগ। এ চুক্তির প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে পলিনেট হাউসের কোনো পরিবর্তন ও ধ্বংস করা যাবে না; কৃষক নিজ তাগিদে উচ্চমূল্যের ফসল চাষ করবেন, কোনো মৌসুমে এই হাউস ফেলে রাখা যাবে না।

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে পলিনেট হাউস ক্ষতিগ্রস্ত হলে এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট চাষিকেই তা মেরামত করতে হবে। এই হাউসের পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা হলে কিংবা হাউসটি ব্যবহৃত না হলে ব্যবস্থা নিতে পারবে কৃষি বিভাগ। সে ক্ষেত্রে পলিনেট হাউস নির্মাণের ব্যয় সাত দিনের মধ্যে সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে। টাকা দিতে ব্যর্থ হলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে কৃষি বিভাগ।

নিজের জমি আছে এবং পলিনেট হাউস নিতে আগ্রহী এমন চাষিদের পলিনেট হাউস প্রকল্পের আওতায় আনা হয়। এতে চাষির কোনো টাকা লাগেনি। পলিনেট করতে জমি লাগে এক বিঘা। তার মধ্যে ২৫ শতাংশের ওপরে নেট হাউস নির্মাণ করে দেওয়া হয়। বাকিটা চারপাশে ফাঁকা থাকে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ওপরে পলিথিন ও তার নিচে নেট থাকে। এতে ৬০ শতাংশ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয়। আর ‘মিক্সড ইরিগেশন’ যন্ত্রের মাধ্যমে তাপমাত্রা কমানোর জন্য মিস্ট পদ্ধতিতে কুয়াশার মতো করে পানি ছিটানো যায়। হাউসের তাপমাত্রা বাড়লে ১০ মিনিট পরপর মিস্ট পদ্ধতি চালু করতে হয়। তখন তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

এই পলিনেট হাউসে চাষযোগ্য ফসল হিসেবে ক্যাপসিকাম, টমেটো, ব্রকলি, স্কোয়াশ, স্ট্রবেরি, মেলন, শসা, কপি, বাঁধাকপি, ব্রাসেলস স্প্রাউট, লেটুস ও চিনাশাক এবং গোলাপ, জারবেরা, রজনীগন্ধা ও গাঁদা ফুলের কথা বলা হয়েছে।

একেকটি ফসলের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। কিন্তু দেশের পলিনেট হাউসগুলোতে সব ফসলের জন্য প্রায় একই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যে কারণে প্রকল্পটি সফল হচ্ছে না।
মো. আহসানুল হক, অধ্যাপক, কৃষি অনুষদ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

চাষিরা বলছেন, যাঁরা আগে থেকে নার্সারিতে পেশাদার চারা উৎপাদনকারী ও ফুলচাষি ছিলেন, তাঁরা পলিনেট হাউসের থেকে সুবিধা পাচ্ছেন; কিন্তু কোনো চাষি অসময়ের সবজি চাষ করতে পারেননি। অনেকেই পরিত্যক্ত এই হাউসে আঙুরগাছ লাগিয়ে রেখেছেন। তাঁদের কেউ অন্য হাউসে ফলন হচ্ছে দেখে আঙুরগাছ লাগিয়েছেন, কেউ আবার কিছু একটা লাগাতে হবে বলে আঙুর লাগিয়ে রেখেছেন।

চাষিরা অভিযোগ করেছেন, পলিনেট হাউস নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে তা টেকসই হয়নি। একই কারণে হাউসের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
অন্যদিকে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, কৃষকেরা পরামর্শ না মানায় সফলতা পাননি।

মাঠে–মাঠে ব্যর্থতার গল্প

১০২টি পলিনেট হাউসের মধ্যে রাজশাহী জেলায় ২২টি, নাটোরে ২৯টি, নওগাঁয় ৭টি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৬টি, পাবনায় ১৭টি, জয়পুরহাটে ৬টি, বগুড়ায় ১১ ও সিরাজগঞ্জে ৪টি রয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় হর্টিকালচার সেন্টারে আরও ৯টি পলিনেট হাউস করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঝড়ে ছিঁড়ে গেছে কৃষক মর্তুজা আহমেদের পলিনেট হাউস। ভেতরে কোনো ফসল হচ্ছে না। এখন এক পাশে আঙুরের গাছ লাগিয়েছেন। ৩১ আগস্ট রাজশাহীর পবার বড়গাছি গ্রামে

কৃষি বিভাগের কাছ থেকে পলিনেট হাউস পেয়েছেন, এমন ১৬ জনের সঙ্গে গত আগস্ট মাসে কথা বলেছে প্রথম আলো। এর মধ্যে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার তিনজন, রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দুজন, চারঘাট উপজেলার একজন, পবা উপজেলার তিনজন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার দুজন, নওগাঁর মান্দার একজন, রানীনগরের একজন ও সদর উপজেলার একজন। এ ছাড়া বগুড়া সদরের একজন ও জয়পুরহাট সদরের একজন রয়েছেন। এর মধ্যে ১০ জনই বলেছেন, এই হাউস চাষ করে তাঁরা বড় ধরনের লোকসানের মধ্যে আছেন। তবে ছয়জন বলেছেন, তাঁদের লোকসান হয়নি। এই ছয়জনের মধ্যে চারজন চারা উৎপাদনে, একজন আঙুর চাষে ও একজন ফুল চাষে সফলতা পাওয়ার কথা বলেছেন।

এই প্রতিবেদক সরেজমিন সাতটি পলিনেট হাউস ঘুরে দেখেন। এর মধ্যে রয়েছে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার তিনটি, রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলার দুটি, পবা উপজেলার দুটি হাউস। এর মধ্যে চারটি হাউসের পলিথিন ছেঁড়া অবস্থায় পাওয়া গেছে। একটির পলিথিন সম্পূর্ণ খুলে ফেলা হয়েছে।

পলিনেট হাউসে ‘মিক্সড ইরিগেশন সিস্টেম’ রয়েছে। এই যন্ত্রের মাধ্যমে তাপমাত্রা কমানোর জন্য মিস্ট পদ্ধতিতে কুয়াশার মতো করে পানি ছিটানো যায়। আবার ‘ড্রিপ পদ্ধতি’তে গাছের গোড়ায় ফোঁটায় ফোঁটায় পানি দেওয়া যায়।

পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার বখতারপুর গ্রামের চাষি নজরুল ইসলাম বলেন, পলিনেট হাউসে চাষ না করে ওই জমি ইজারা দিলে বছরে এক লাখ টাকা পেতেন।  
গত ৩০ আগস্ট বখতারপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পলিনেট হাউসে কোনো পলিথিন নেই। শুধু কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। এর ভেতরে এখন পটোল চাষ করেছেন নজরুল ইসলাম।

নজরুল ইসলাম বলেন, হাউসের ভেতরে যা কিছু চাষের চেষ্টা করেছেন, তার কোনোটাই হয়নি। উল্টো বছর বছর জমির ইজারামূল্য দিতে হচ্ছে। ভেতরে তাপমাত্রা এত বেশি যে কোনো কর্মচারী কাজ করতে চান না। বাধ্য হয়ে হাউসের পলিথিন খুলেছেন।

ঈশ্বরদী উপজেলার মহাদেবপুর গ্রামে শাহিনুজ্জামানের পলিনেট হাউসে গিয়ে দেখা যায়, তিনি গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ করেছেন। আগস্টের শুরুর দিকে চারা লাগিয়েছেন। দু–একটি গাছের মাথা দেখা যাচ্ছে। এর আগে গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি করলা লাগিয়েছেন। গাছ ভালো হয়নি। দু–একটি লতায় করলা দেখা যায়। কিছুই হচ্ছে না দেখে হাউসের এক পাশে আঙুরের গাছ লাগিয়েছেন।

কৃষক শাহিনুজ্জামান গ্রীষ্মকালীন টমেটো ও করলা চাষ করে সফলতা পাননি। পলিনেট হাউস নিয়ে এখন তিনি হতাশ। গত ৩০ আগস্ট পাবনার ঈশ্বরদীর মহাদেবপুর গ্রামে

মহাদেবপুরের পাশের গ্রাম জগন্নাথপুরে বেলি বেগমের হাউসে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে পালংশাক ও টমেটো চাষ করা হয়েছে; কিন্তু চেহারা একেবারেই খারাপ। এক পাশের পলিথিন খুলে দেওয়া হয়েছে। সেদিকের শাকের চেহারা একটু ভালো হয়েছে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার বড়গাছি গ্রামের মর্তুজা আহমেদের হাউসে গিয়ে দেখা যায়, পলিথিন ছিঁড়ে গেছে। বাতাসের কারণে ভেতরে পতপত শব্দ হচ্ছে। কোনো ফসল করতে না পেরে তিনি হাউসের এক পাশে আঙুরের গাছ লাগিয়েছেন। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত এই হাউসে কোনো ফসল চাষ করে এক টাকাও লাভ করতে পারেননি; বরং ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

যেসব সমস্যায় কৃষকেরা

কৃষকেরা বলছেন, পলিনেট হাউস পরিচালনার জন্য তাঁদের কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। তবে হাউস স্থাপনের এক বছর পর একবার (পাবনার হর্টিকালচার সেন্টার) এবং দুই বছর পর আরেকবার (নিটোর হর্টিকালচার সেন্টার) অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য ডাকা হয়েছিল। সেখানে কী কী ভুল হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনার হয়। কয়েকজন কৃষিবিশেষজ্ঞ কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন। এর বাইরে তাঁদের আর কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।

নওগাঁর রানীনগর উপজেলার বেতগাড়ি এলাকার চাষি মাসুদ রানা পলিনেট হাউস করে ১০ লাখ টাকা লোকসান গুনেছেন বলে দাবি করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এক বছর পরের অভিজ্ঞতা নিয়ে পাবনায় হর্টিকালচার সেন্টারে একটা সভা হয়। সেখানে এক বিশেষজ্ঞ এসেছিলেন। ব্যর্থতার কথা শুনে বিদেশি একটি কোম্পানির বীজ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি।

মাসুদ রানা বলেন, দামের কথা শুনে উপস্থিত চাষিরা সেই বীজ নিতে সাহস করেননি। শুধু তিনি এক লাখ টাকায় ক্যাপসিকাম ও টমেটোর বীজ নিয়েছিলেন। সেটি চাষ করতে আরও তিন লাখ টাকা খরচ হয়। উৎপাদন শেষে দেখা গেল বাইরে চাষ করলে যে ফলন হতো, তার অর্ধেকও হয়নি।

মাসুদ রানা অভিযোগ করেন, যে মেকানিকেরা (কারিগর) পলিনেট হাউস নির্মাণ করতে এসেছিলেন, তাঁরা বলেছিলেন অন্তত ২০০ মাইক্রোনের (ঘনত্ব) পলিথিন দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেওয়া হয় ১০০ মাইক্রোনের কম। এটিসহ অন্যান্য ত্রুটির কারণে সফলতা আসেনি বলে মনে করেন তিনি।

নওগাঁ সদরের আরেক চাষি আব্দুল লতিফ বলেন, ‘দুই নম্বর জিনিস দিয়ে এটা বানাইয়ে দিয়েছে। ছিঁড়ে যাচ্ছে। এখন শুধু দেখানোর জন্য আঙুর লাগিয়ে রেখেছেন। যাতে বলা যাবে কিছু একটা হচ্ছে।’

পলিনেট হাউসের মধ্যে ‘স্প্রিঙ্কলার’ নামে একটি সেচযন্ত্র রয়েছে। এর মাধ্যমে পানি সেচ দেওয়া যায়; আবার তরল সার ও কীটনাশকও ছিটানো যায়। আরেকটি আছে ‘মিক্সড ইরিগেশন সিস্টেম’। এই যন্ত্রের মাধ্যমে তাপমাত্রা কমানোর জন্য মিস্ট পদ্ধতিতে কুয়াশার মতো করে পানি ছিটানো যায়। আবার ‘ড্রিপ পদ্ধতি’তে গাছের গোড়ায় ফোঁটায় ফোঁটায় পানি দেওয়া যায়।

জানা গেছে, বেশির ভাগ পলিনেট হাউসের মিক্সড ইরিগেশন মেশিন সচল নেই। প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, চাষিরা এই মিক্সড ইরিগেশন মেশিন ব্যবহার না করে ফেলে রেখেছেন। বরেন্দ্র অঞ্চলের পানিতে মাত্রা অতিরিক্ত আয়রন থাকার কারণে এবং খর পানি হওয়ার কারণেও এ যন্ত্রগুলো নষ্ট হয়েছে।

বেশির ভাগ পলিনেট হাউসের মিক্সড ইরিগেশন মেশিন সচল নেই। ৩১ আগস্ট রাজশাহীর পবার বড়গাছি গ্রামে

তবে কৃষকেরা বলছেন, মিক্সড ইরিগেশন পদ্ধতি সারাক্ষণ চালু না রাখলে ঘর ঠান্ডা হয় না। আর বেশি চালালে ভেতরে আদ্র৴তা বেড়ে যায়। তখন ছত্রাকের সংক্রমণ দেখা দেয়। এক বছর যেতে না যেতেই সব মেশিন নষ্ট হয়ে গেছে। প্রকল্প থেকে মেরামত করার করে দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়নি।

চারা উৎপাদন ও ফুল চাষে কিছু সাফল্য

কৃষকেরা বলছেন, যাঁরা পেশাদার চারা উৎপাদন করেন, পলিনেট হাউসে তাঁদের সুবিধা হয়েছে। তাঁরা আগে থেকেই পলিথিনের শেড তৈরি করে তার মধ্যে চারা তৈরি করতেন। এটা পেয়ে তাঁদের ওই শেড তৈরি করতে হচ্ছে না; আর যাঁরা পেশাদার ফুল চাষি, তাঁদেরও সুবিধা হচ্ছে।

নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার ইলিয়াস শেখ একজন চারা উৎপাদনকারী। তিনি এই পলিনেটে মুনাফা করতে পেরেছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষি সাদিকুল ইসলামও বলেছেন, ফুল চাষ করে তিনি সফলতা পেয়েছেন। হাউসে তিনি জারবেরা ফুলের চাষ করেছেন।

চারঘাটের ইউসুফপুর গ্রামের চাষি মনোয়ার হোসেন নেট হাউসে বিভিন্ন চারা উৎপাদন করছেন। কৃষি বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সফল হয়েছেন। অবশ্য মনোয়ার হোসেন বলছেন, তিনি করলা ও রক মেলন চাষ করে দেখেছেন। ভালো হয়নি। আঙুরের গাছ লাগিয়েছেন। তাতে ভালো ফলন পেয়েছেন। তাঁর মনে হয়েছে এখানে ফসল হিসেবে চাষ করলে একমাত্র আঙুর হতে পারে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার চাষি সাদিকুল ইসলাম পলিনেট হাউসে জারবেরা ফুল চাষ করে সফল হয়েছেন বলে কৃষি বিভাগ থেকে প্রচার করা হচ্ছে। যদিও পলিনেট হাউসের মান নিয়ে অসন্তুষ্ট সাদিকুল। বৃহস্পতিবার উপজেলার বেলখরিয়া গ্রামে

জয়পুরহাট সদর এলাকার চাষি আমিনুল ইসলাম পলিনেট হাউসে ক্যাকটাসসহ বিভিন্ন ধরনের ফুল-ফলের চারা করে লাভবান হয়েছেন। নিজেকে শৌখিন চাষি দাবি করে তিনি বলেন, তাঁর মতো অভিজ্ঞতা কারও নেই। পলিনেট হাউসে চাষের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য নিজ খরচে ভারতে গেছেন।

আমিনুল ইসলাম বলেন, জয়পুরহাটের পলিনেট হাউসে চাষ করে তিনি ছাড়া আর কেউ ভালো করতে পারেননি। এই হাউসে চাষ করা তাঁর একটা ক্যাকটাসের দামই ২০ হাজার টাকা।

দুই বছরের বেশি সময় পলিনেট হাউসগুলো পর্যবেক্ষণ করে প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, হাউসের ৮০ শতাংশ এলাকায় চারা উৎপাদন হবে। বাকি এলাকায় আঙুর, ক্যাপসিকাম, গ্রীষ্মকালীন টমেটো ও জারবেরা ফুল চাষ করা সম্ভব। পলিনেট হাউসে চারা উৎপাদন ও চাষাবাদের বিষয়ে চাষিদের নির্দেশিকা দেওয়া রয়েছে।

সফলতার গল্প বানিয়ে বলতে হয়

নওগাঁরর এক চাষি পলিনেট হাউসে গত তিন বছরে ২৮ রকমের ফসল উৎপাদনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু একটিতেও সফল হতে পারেননি।

এই চাষি (নাম প্রকাশ করতে চাননি) প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্প শুরু হওয়ার এক বছর পর কৃষি বিভাগের উদ্যোগে পাবনার হর্টিকালচার সেন্টারে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে সবাইকে বানিয়ে সফলতার গল্প বলতে বাধ্য করা হয়। চাষিরা যাতে সফলতার কথা বলেন, তা নজরদারি করার জন্য সেখানে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কড়া পাহারায় ছিলেন। কিন্তু কথায়–কথায় একজন চাষি মুখ ফসকে সত্য কথা বলে ফেলেন, তারপর সবাই তাঁদের ব্যর্থতার গল্প ফাঁস করে দেন। তখন একটা বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়েছিল।

দুই বছর আগে চাষিদের নিয়ে নাটোরে একাধিক প্রশিক্ষণ কর্মশালা হয়। সেখানে রাজশাহী, বগুড়া, নওগাঁ, নাটোরে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট ও পাবনার চাষিরা ছিলেন। তখন কয়েকজন চাষির সই করা এটি আবেদন প্রকল্প পরিচালককে দেওয়া হয়। তাতে বলা হয়েছে, পলিনেট হাউস ব্যবহারের অনুপযোগী। এটা ঠিক করে এতে উপযুক্ত বীজ সরবরাহ করতে হবে।

ওই প্রশিক্ষণে বগুড়া সদরের একজন চাষিকে কৃষি বিভাগ সফল বলে প্রচার করন। তাঁর (নাম প্রকাশ করতে চাননি) সঙ্গে ২ সেপ্টেম্বর মুঠোফোনে কথা বলেছে প্রথম আলো। তিনি বলেন, এটা এখন লোকদেখানো প্রকল্প হয়ে গেছে। এটি কর্তৃপক্ষও জানে।

আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পটি মোট ১৮৭ কোটি টাকার। এর আওতায় পলিনেট হাউসের পাশাপাশি ১০ হাজার ৭৩৩টি কৃষি যন্ত্রপাতি ৭০ শতাংশ ভর্তুকি মূল্যে কৃষকদের দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভুট্টামাড়াই মেশিন, স্প্রে মেশিন, গার্ডেন টিলার ইত্যাদি। প্রকল্পের আওতায় কৃষক প্রশিক্ষণ, কৃষি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষিপ্রযুক্তি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় বগুড়া ও রাজশাহীতে কৃষি বিভাগের জন্য সাড়ে ১১ হাজার বর্গফুট আয়তনের দুটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি ভবন চারতলার। তবে হয়েছে তিনতলা পর্যন্ত। দুটি ভবনের নির্মাণ ব্যয় সাড়ে ১১ কোটি টাকা।

কৃষকের পাশে কেউ নেই

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছিলেন, পাঁচ বছরে পলিনেট হাউসের কোনো সমস্যা হলে সরকার থেকে ঠিক করে দেওয়া হবে। তারপর বলা হলো তিন বছর। শেষে দেখা গেল এক বছরের মাথায় কৃষকের পাশে আর কেউ নেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক এস এম হাসানুজ্জামান প্রকল্পটির (আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, কৃষকেরা পরিশ্রম করতে চান না। তাঁদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন না। এ জন্য সফল হয় না।

পলিনেট হাউসে অন্য ফসল চাষে ব্যর্থ হয়ে আঙুর চাষ করেছেন নওগাঁর রানীনগর উপজেলার চাষি মাসুদ রানা। সম্প্রতি উপজেলার বেতগাড়ি গ্রামে

চাষিদের করা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে হাসানুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের চাষিরা সবাই অস্থির। কাউকে জোর করে পলিনেট হাউস দেওয়া হয়নি। আঙুরের জন্য এটা টেকসই একটা প্রযুক্তি। এখন চাষিদের আঙুর চাষ করতে পরামর্শ দিচ্ছেন।’

আঙুর তো খালি পরিবেশেও হচ্ছে, এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে হাসানুজ্জামান বলেন, বাইরের চেয়ে ভেতরে (হাউস) ভালো হচ্ছে। ভেতরে দুবার ফলন হবে। চাষিদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে তিনি বলেন, বাংলাদেশে যাঁরা বিশেষজ্ঞ আছেন, তাঁদের দিয়ে প্রশিক্ষণ করানো হয়েছে। জারবেরা ফুল দারুণ হচ্ছে। যাঁরা করছেন, লাভবান হচ্ছেন।
রক্ষণাবেক্ষণের মেয়াদ কত বছর ছিল—জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক হাসানুজ্জামান বলেন, পাঁচ বছরের প্রকল্প। ঠিকাদার এক বছর বিনা মূল্যে সার্ভিস দেবেন। পলিথিন ছিঁড়ে গেলে তিন বছর ঠিক করে দেওয়া হবে। সেই সময় পার হওয়ায় এখন চাষিরা নিজেরাই চালাবেন।

রাজশাহীর পবা উপজেলার দারুশা গ্রামের চাষি সারোয়ার হোসাইনের পলিনেট হাউস ঝড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। মেরামত করতে তাঁর ৭০-৮০ হাজার টাকা লাগবে। একাধিকবার উচ্চমূল্যের ফসল চাষ করতে গিয়ে প্রায় ৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, নিম্নমানের পলিনেট হাউসের কারণেই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ফসলও হয় না। এ অবস্থায় অতিরিক্ত ব্যয় করে তাঁর পক্ষে এই পলিনেট হাউস মেরামত করা সম্ভব নয়।

সরকারি খরচে হাউসটি মেরামত করে দেওয়ার জন্য প্রকল্প পরিচালক বরাবর গত ২৯ জুন আবেদন জানিয়েছেন। এখনো সাড়া পাননি জানিয়ে সারোয়ার হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি আবার আবেদন করবেন।

প্রকল্পটির বিষয়ে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মো. আহসানুল হক প্রথম আলোকে বলেন, শীতপ্রধান দেশে ঠান্ডার প্রকোপ থেকে ফসল রক্ষায় পলিনেট বা গ্রিনহাউসে চাষাবাদ স্বাভাবিক। তবে গ্রীষ্মপ্রধান বাংলাদেশে এ ধরনের হাউস করতে হলে ভেতরের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ু চলাচল ফসলের উপযোগী রাখতে হয়। একেকটি ফসলের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। কিন্তু দেশের পলিনেট হাউসগুলোতে সব ফসলের জন্য প্রায় একই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যে কারণে প্রকল্পটি সফল হচ্ছে না।