আগাম আলু

ফলন ভালো হলেও লোকসান 

  • পাইকারের কাছে প্রতি কেজি আগাম আলু ১২ থেকে সাড়ে ১২ টাকায় বিক্রি করছেন চাষিরা।

  • সেই হিসাবে বিঘায় প্রায় ২৫ হাজার টাকা লোকসান গুনছেন তাঁরা।

  • প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের সাড়ে ১৮ টাকা খরচ হয়েছে।

খেত থেকে আগাম জাতের আলু সংগ্রহ করছেন কৃষিশ্রমিকেরা। দিনাজপুর সদর উপজেলার উলিপুর এলাকায়

এবার তিন বিঘা মাটিতে আগাম সেভেন জাতের আলু লাগিয়েছিলেন দিনাজপুর সদর উপজেলার উলিপুর এলাকার কৃষক মোজাফফর আলী। অক্টোবরের শেষে লাগানো আলু তুলেছেন ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে। জমি থেকে পাইকার আলু নিয়ে গেছেন প্রতি কেজি ১২ টাকা দরে।

কয়েক তিন আগে বাড়ির পাশে ধ্যাদার মোড়ে বসে আলুচাষি রফিকুল, মাহমুদুল, রশিদসহ কয়েকজনের সঙ্গে মোজাফফর আলীও লাভ-লোকসানের হিসাবে বসেন। তাঁরা জানান, যাঁরা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে আলু লাগিয়েছেন, প্রতি বিঘায় তাঁরা লোকসান গুনবেন ২২-২৫ হাজার টাকা। জমি নিজের হলেও সর্বনিম্ন চার-পাঁচ হাজার টাকা লোকসান হবে।

লাভের আশায় দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা আগাম আলু চাষ করেছিলেন। কিন্তু দাম কম হওয়ায় এখন তাঁদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

এ সময় আলু চাষ করে হতাশ মোজাফফর আলী বলেন, ‘বেশি লাভের আশায় আগাম জাতের আলু লাগাইছি। ফলনও ভালো হইছে। কিন্তু বাজারে তো দাম পাইলাম না। গত দুই মৌসুমে আলুতে লোকসান হইল। এক বিঘায় আলু আবাদে খরচ ৭০ হাজার টাকা। আলু পাইনো ৯৫ মণ। পাইকারি বিক্রি করছি প্রতি মণ ৪৮০ টাকায়।’

আলুর লোকসান পোষাবেন কীভাবে, এমন প্রশ্নের জবাবে কৃষক মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘ওই যে জোড়াতালি দিয়ে। লাভের আশায় আবাদ করেছি। শেষমেশ একটা গরু বিক্রি করিতে হবে। আলু তুলে ভুট্টা লাগাইছি। ভুট্টার জমিতে দুই চাষ কম লাগছে। গোবর সার দিতে হচ্ছে না। রাসায়নিক সারও কম লাগবে। ভুট্টাতে লোকসান হয় না। গত বছর কাঁচাতে ৮০০ টাকা পর্যন্ত প্রতি মণ ভুট্টা বিক্রি হয়েছে। কৃষক সব সময় আশায় আশায় থাকে।’

দিনাজপুরে কয়েক বছর ধরে বেড়েছে আলুর আবাদ ও ফলন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, চলতি অর্থবছরে জেলায় ৪৪ হাজার ৯৬৪ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আলু লাগানো হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে। অন্যদিকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ লাখ ৩৪ হাজার ১৭২ মেট্রিক টন। জেলায় সবচেয়ে বেশি আলু লাগানো হয়েছে বীরগঞ্জ উপজেলায় ৯ হাজার ৬১৫ হেক্টর জমিতে।

খানসামা ও সদর উপজেলার কয়েক কৃষক বলেন, এক বিঘা জমি বর্গা নিতে জমির মালিককে দিতে হয় (জমিভেদে) ২৫-৩৫ হাজার টাকা। এবার চাষ বাবদ ৩ হাজার, গোবর ও রাসায়নিক সার-কীটনাশক বাবদ ৮ হাজার ৫০০, বীজ বাবদ ১৭ হাজার, রোপণ খরচ দুই হাজার, নিড়ানি দেওয়ার জন্য ৩ হাজার ৫০০, সেচ বাবদ ৩ হাজার, উত্তোলন বাবদ ৫ হাজার, বস্তার দাম বাবদ ২ হাজার ১০০ ও পরিবহন বাবদ ৯০০ টাকা খরচ হয়েছে। প্রতি বিঘায় কৃষক আলু পেয়েছেন ৯৫-১০০ মণ। পাইকারের কাছে প্রতি কেজি ১২ থেকে সাড়ে ১২ টাকায় বিক্রি করছেন। সেই হিসাবে আলুতে বিঘাপ্রতি প্রায় ২৫ হাজার টাকা লোকসান গুনছেন তাঁরা।

দিনাজপুর শহরের বাহাদুর বাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি সেভেন জাতের আলু পাইকারি ১৬ টাকা, খুচরা ১৮-২০ টাকা; কার্ডিনাল পাইকারি ১৭ টাকা, খুচরা ২৪ টাকা; দেশি জাতের (লাল) আলু পাইকারি ২৪ টাকা ও খুচরা ২৮-৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খানসামা উপজেলার কাচিনিয়া এলাকার কৃষক আনিসুর রহমান বলেন, বাজারে আগাম আলুতে যেখানে অন্তত দ্বিগুণ লাভ হওয়ার কথা, সেখানে লোকসান দিতে হচ্ছে। কিন্তু কী আর করার। জমি তো ফেলে রাখা যায় না।

সদর উপজেলার মহব্বতপুর এলাকার কৃষক বাদশা মিয়া বলেন, ‘দুই বিঘা জমিতে আলু লাগাইছি। জমি নিজের। এবার শীতটা দেরি করে পড়ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হইছে।’ তিনি জানান, বাজারে গতকাল থেকে আলুর বাজার বাড়তে শুরু করেছে। মঙ্গলবার সকালে প্রতি কেজি আলু ১৫ টাকায় পেয়েছেন তিনি। নিজের জমি তাই লোকসানের পরিমাণ কম হবে তাঁর।

দিনাজপুরে আলুর আবাদ ও ফলন বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) খালেদুর রহমান বলেন, জেলায় কৃষকেরা সাধারণত সেভেন জাতের আলু আগাম লাগিয়ে থাকেন। এ অঞ্চলে দিন দিন আলুর আবাদ বাড়ছে। তবে দামের বিষয়ে তিনি বলেন, হিমাগারগুলোতে কিছু পুরোনো আলু ছিল, সে জন্য হয়তো শুরুতে দাম কম পেয়েছেন। তবে এটা পুষিয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, কৃষক হয়তো কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না। তবে লোকসানে পড়বেন, এমনটা হবে না।