নিজ বাড়িতে পড়াশোনা করছেন পাভেল মিয়া। সম্প্রতি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের দ্বারিকাপাড়া গ্রামে
নিজ বাড়িতে পড়াশোনা করছেন পাভেল মিয়া। সম্প্রতি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের দ্বারিকাপাড়া গ্রামে

দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত হলেও জীবিত ছিলেন পাভেল, এখন লড়ছেন অভাবের সঙ্গে

ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনায় মাইক্রোবাসের ১৮ আরোহীর মধ্যে শুধু বেঁচে ফিরেছিলেন পাভেল মিয়া। জ্ঞান ফেরার পর তিনি জানতে পারেন, দুর্ঘটনায় মারা গেছেন তাঁর বাবা-মাসহ সফরসঙ্গী সবাই। পাঁচ বছর পরও সেই দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। বর্তমানে বৃদ্ধ দাদি, ফুফু ও ছোট বোন নিয়ে পরিবারের হাল ধরতে হয়েছে পাভেলকে। সংসারের অভাব ঘোচাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবি করেছেন তিনি।

পাঁচ বছর আগে রাজশাহীর কাটাখালী থানার সামনে ওই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৭ জন। দুর্ঘটনার খবর জানতে পাভেলের লেগে যায় প্রায় আড়াই মাস। মাঝের এই সময় ধরে তিনি হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন।

পাভেল মিয়ার (২১) বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের দ্বারিকাপাড়া গ্রামে। সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর প্রথম যখন জ্ঞান ফেরে, তখন তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে। এক চিকিৎসক তাঁকে বলেছিলেন, ‘তুমি অনেক অসুস্থ। তোমার জন্য দোয়া করতে বাবা-মা হজ করতে গেছেন।’

এরও দুই মাস পর কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন পাভেল। তখন স্বজনদের কাছ থেকে জানতে পারেন, সেই দুর্ঘটনায় তাঁর বাবা মোখলেছার রহমান, মা পারভীন বেগমসহ মাইক্রোবাসের অন্য সবাই মারা গেছেন। শুধু তিনি বেঁচে আছেন।

২০২১ সালের ২৬ মার্চের দিনটি ছিল শুক্রবার। পাভেলের বাবা ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু পরিবারসহ ভোরে রংপুর থেকে নাটোর ও রাজশাহী ভ্রমণে বের হন। বগুড়ায় খাওয়াদাওয়া শেষে তাঁরা নাটোরের রাজবাড়ি ঘুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে রওনা দেন। বেলা সোয়া ১টার দিকে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের কাটাখালী থানার সামনে ঢাকাগামী হানিফ পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

পাভেলের বাবা ও তাঁর কয়েকজন বন্ধু পরিবারসহ ওই দিন ভোরে রংপুর থেকে নাটোর ও রাজশাহী ভ্রমণে বের হন। বেলা সোয়া ১টার দিকে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের কাটাখালী থানার সামনে ঢাকাগামী হানিফ পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

স্মৃতি হাতড়ে পাভেল বলেন, ‘নাটোর রাজবাড়ি ঘোরা শেষে আমরা খাওয়াদাওয়া করি। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরতে যাচ্ছিলাম। এরপরই দুর্ঘটনা ঘটে।’

পাভেল জানান, পরে স্বজনদের কাছ থেকে জেনেছেন, দুর্ঘটনার সময় আতঙ্কে তাঁর বাবা-মায়ের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। দুর্ঘটনায় ১৪ জনের মরদেহ এতটাই পুড়ে গিয়েছিল যে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।

ওই ঘটনায় কাটাখালী থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) নূর মোহাম্মদ বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়, মহাসড়কের পাশে দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে থাকা মাইক্রোবাসটিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল এবং ভেতরে থাকা যাত্রীরা আহাজারি করছিলেন।

দুর্ঘটনায় পাভেলের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে, মুখের সামনের দুটি দাঁত এবং বুকের একটি হাড়ও ভেঙে যায়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে নয় দিন থাকার পর তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আরও প্রায় তিন মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

বর্তমানে রাজশাহী মহানগর পুলিশের কাশিয়াডাঙ্গা থানায় কর্মরত নূর মোহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। মামলাটি আদালতে বিচারাধীন থাকতে পারে। তবে আদালত থেকে তাঁকে আর ডাকা হয়নি।

দুর্ঘটনায় পাভেলের মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। মাথায় ১২টি সেলাই দিতে হয়। মুখের সামনের দুটি দাঁত ভেঙে যায়। বুকের একটি হাড়ও ভেঙে যায়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে নয় দিন থাকার পর তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আরও প্রায় তিন মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

দুর্ঘটনার সময় ১৬ বছর বয়সী পাভেল রংপুর পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। তবে ডান হাতের একটি আঙুল ভেঙে যাওয়ায় তিনি এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারেননি।

দুর্ঘটনার পর পুড়ে যাওয়া মাইক্রোবাসটি

পাভেলের ছোট বোন মোহনা আখতার ওই সফরে যাননি। জেএসসি পরীক্ষা থাকায় তিনি বাড়িতেই ছিলেন। পাভেল বলেন, ‘ও গেলে আজ হয়তো আমাদের পরিবারে কেউই বেঁচে থাকত না।’

’বর্তমানে বৃদ্ধ দাদি, ফুফু ও ছোট বোনকে নিয়ে চলছে পাভেলের সংসার। তাঁর প্রতিবেশী ও স্থানীয় ইউপি সদস্য খলিলুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার খরচ চালাতে পাভেলের বাবার দোকান ও সম্পত্তি বিক্রি করতে হয়েছিল। স্থানীয়ভাবেও সহযোগিতা করা হয়।

২০২৩ সালে হানিফ পরিবহন কর্তৃপক্ষ পাভেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে রংপুরে টিকিট পরীক্ষকের চাকরি দেয়। শুরুতে বেতন ছিল সাত হাজার টাকা। বর্তমানে তাঁকে মাসে ১০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হচ্ছে। তবে এ অর্থে নিজের ও বোনের পড়াশোনা এবং সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

পাভেলের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ। লেখাপড়া করছে, আবার সাহায্য-সহযোগিতার ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে। খুব কষ্টে দিন কাটছে তাঁদের।
সাইদুর রহমান চৌধুরী, রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান

দীর্ঘ শিক্ষাবিরতির কারণে পাভেল আর সাধারণ শাখায় পড়তে পারেননি। পরে কারিগরি শাখায় ভর্তি হন। এবার পীরগঞ্জের খালাশপীর বিএম কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবেন। তাঁর বোন মোহনা আখতারও এবার পীরগঞ্জ মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন।

পীরগঞ্জের রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান চৌধুরী বলেন, পাভেলের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ। লেখাপড়া করছে, আবার সাহায্য-সহযোগিতার ওপরও নির্ভর করতে হচ্ছে। খুব কষ্টে দিন কাটছে তাঁদের।

পাভেল বলেন, দুর্ঘটনার পর দীর্ঘদিন তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) রাজশাহী কার্যালয়ে ক্ষতিপূরণের আবেদন নিয়ে যান। কিন্তু আবেদন গ্রহণ করা হয়নি।

এ বিষয়ে বিআরটিএর রাজশাহী বিভাগের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) পার্কন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের উত্তরাধিকারী ও আহত ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিধিমালা ২০২২ সালের ২৭ ডিসেম্বর কার্যকর হয়। এ ছাড়া দুর্ঘটনার এক মাসের মধ্যে আবেদন করার বিধান ছিল। ঘটনাটি পাঁচ বছর আগের হওয়ায় ক্ষতিপূরণের সুযোগ নেই।

তবে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, পাভেল ক্ষতিপূরণের জন্য অনেক জায়গায় ঘুরছেন। সরকার চাইলে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁকে বিশেষ আর্থিক সহায়তা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে পারে।