ভোলার আশপাশের চরাঞ্চলে শীতকালীন পরিযায়ী পাখিশুমারিতে চলতি বছর একটি প্রজাতির পাখি তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। এ ছাড়া এবার পাখির মোট সংখ্যাও ছিল আশানুরূপ। তবে পাখির বিচরণক্ষেত্রে মানবসৃষ্ট হুমকি বেড়েছে বলে গতকাল রোববার জানিয়েছেন শুমারি দলের প্রধান ও পাখিবিশেষজ্ঞ সায়েম ইউ চৌধুরী। আট দিনব্যাপী জরিপ শেষে আজ সোমবার দলটির ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কথা আছে।
সায়েম ইউ চৌধুরী জানান, চলতি বছরের জানুয়ারিতে (১১–১৮ জানুয়ারি) আট দিনে ভোলার আশপাশে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদী এবং সাগর মোহনার ৫৩টি চরে শুমারি চালানো হয়। এতে ৬৩ প্রজাতির মোট ৪৭ হাজার ১৫৭টি পাখি গণনা করা হয়েছে। ৩৮ বছর ধরে এ শুমারি কার্যক্রম চলছে।
চলতি বছর জরিপটি পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, স্কোপ ফাউন্ডেশন ও বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল। পাখিবিশেষজ্ঞ সায়েম ইউ চৌধুরী বলেন, এ বছর একটি প্রজাতির পাখি বেশি দেখা গেছে, যা কয়েক বছর ধরে তেমন চোখে পড়েনি। পাখিটির নাম টাফটেড ডাক, যার বাংলা নাম টিকি হাঁস। ঠ্যাঙ্গার চরে এ প্রজাতির ২২০টি পাখি দেখা গেছে। টিকি হাঁস মাঝারি আকারের ঝুঁটিযুক্ত হাঁস। এটি হাওর, বিল, নদী, জলাধার ও উন্মুক্ত জলাভূমিতে বড় ঝাঁকে বিচরণ করে।
জরিপে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় পাওয়া গেছে ইউরেশিয়ান উইজন (ইউরেশীয় সিঁথি হাঁস)—৬ হাজার ১২টি। এরপর ব্ল্যাক-টেইল্ড গডউইট (কালো লেজ জৌরালি) ৪ হাজার ৪৩৪টি ও লেসার স্যান্ড প্লোভার (বিপন্ন প্রজাতির দেশি গাঙচষা) ৩ হাজার ৯৬২টি পাখি দেখা গেছে। এ ছাড়া চামচঠুঁটো বাটান, বড় নট ও ফুলুরি হাঁসও গণনায় এসেছে।
সবচেয়ে বেশি পাখি দেখা গেছে মনপুরার কাছে চর আতুয়ার, ভাসানচরের কাছে জাইজ্জার চর ও আন্ডার চর এলাকায়। চর আতুয়ারে ৬ হাজার ৪৭৯টি, জাইজ্জার চরে ৫ হাজার ৮১৪টি ও আন্ডার চরে ৪ হাজার ৯৮৭টি পাখি গণনা করা হয়েছে। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, মেঘনা মোহনার কিছু নির্দিষ্ট চর শীতকালীন পরিযায়ী জলচর পাখির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।
সায়েম ইউ চৌধুরী বলেন, ২০২৫ সালের তুলনায় এ বছর পাখির সংখ্যা কিছুটা বেশি। গত বছর ৪৮টি চরে ৬২ প্রজাতির ৪৬ হাজার ১৫টি পাখি দেখা গিয়েছিল। ২০২৪ সালে ৬২ প্রজাতির ৩৪ হাজার ৩১২টি এবং ২০২৩ সালে ৫৪ হাজার ১৮০টি পাখি গণনা করা হয়। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৩ হাজার। একসময় এ অঞ্চলে পাখির সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যেত। চলতি বছর পাখির সংখ্যা বাড়ার পেছনে জরিপ এলাকার বিস্তৃতি ও স্বাভাবিক বার্ষিক ওঠানামা ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুমারি দল জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে গত ৩৮ বছরে মোটের ওপর ভোলায় আসা পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমেছে।
দলটির পাখিবিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, আগের বছরের তুলনায় চলতি বছর চরাঞ্চলে তরমুজের আবাদ বেড়েছে। এসব আবাদে কীটনাশক, বালাইনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হচ্ছে, যা পাখির জন্য হুমকিস্বরূপ। ভোলার পশ্চিমে তেঁতুলিয়া নদী ও পূর্বে মেঘনা নদীর চরে শিকারির কারণেও পাখিরা হুমকির মুখে পড়ছে। শিকারিরা প্রতিদিন বিষটোপ ও জাল পেতে পাখি শিকার করছেন বলে অভিযোগ আছে।
দলের আরেক সদস্য পাখিবিশেষজ্ঞ নাজিম উদ্দিন খান বলেন, বর্তমানে কাদামাটির চরগুলোতেও ব্যাপক হারে চাষাবাদ হচ্ছে। যেখানে পাখিরা খাবার সংগ্রহ করে, সেসব জায়গায় ফসল ফলানো হচ্ছে এবং ফসল রক্ষায় কারেন্ট জাল দিয়ে ঘের দেওয়া হচ্ছে। এতে অনেক পাখি নিধন হচ্ছে।