
১০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদে ৭ বছর আগে একটি ভবনে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারেন সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় চাঁদাবাজি ও বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা হয়। মামলার অভিযোগপত্রে যাঁদের আসামি করা হয়, তাঁদের একজন চট্টগ্রাম নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম। এই আসামি দুই মাসের বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকলেও তাঁকে চাঁদাবাজি ও বিস্ফোরক আইনের মামলাটিতে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। মামলার নথি অনুযায়ী, ইমতিয়াজ এখনো পলাতক।
ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম একসময় বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের সহযোগী ছিলেন। র্যাবের একটি অস্ত্র উদ্ধারের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে। তাঁর বিরুদ্ধে সাত বছর আগে করা মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে, তবে তাঁকে গ্রেপ্তারের (শ্যোন অ্যারেস্ট) কোনো আবেদন করেনি সরকারি কৌঁসুলি কিংবা পুলিশ।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদের নির্দেশে ইমতিয়াজ ফোনে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন ওই ব্যবসায়ীর কাছে। না পেয়ে তাঁর বাসায় পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করেন। মামলায় সাজ্জাদ, ইমতিয়াজ ছাড়াও বড় সাজ্জাদের সহযোগী সরোয়ার বাবলা, নুরনবী ম্যাক্সন, রুহুল আমিন, মো. তুহিন, আবদুল কাদের, মো. জাবেদ, রায়হান আহমেদসহ ৯ জনকে আসামি করা হয়।
পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনাটি ঘটে ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার অক্সিজেন নয়াহাট এলাকার ব্যবসায়ী আবুদল ওয়াজেদের পাঁচতলা বাসার দ্বিতীয় তলায় পেট্রলবোমা ছুড়ে মারা হয়। এ ঘটনায় করা মামলায় পরের বছরের ১৮ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। অভিযোগপত্রে বলা হয়, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদের নির্দেশে ইমতিয়াজ ফোনে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন ওই ব্যবসায়ীর কাছে। না পেয়ে তাঁর বাসায় পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করেন। মামলায় সাজ্জাদ, ইমতিয়াজ ছাড়াও বড় সাজ্জাদের সহযোগী সরোয়ার বাবলা, নুরনবী ম্যাক্সন, রুহুল আমিন, মো. তুহিন, আবদুল কাদের, মো. জাবেদ, রায়হান আহমেদসহ ৯ জনকে আসামি করা হয়। তাঁদের মধ্যে সরোয়ার ও নুরনবী বর্তমানে বেঁচে নেই।
মামলাটি ষষ্ঠ অতিরিক্ত চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ মুহাম্মদ আলী আককাসের আদালতে বিচারাধীন। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন। কিন্তু সাক্ষীরা হাজির না হওয়ায় সাক্ষ্য শুরু হচ্ছে না। আসামিদের মধ্যে সাজ্জাদ, ইমতিয়াজ ও রায়হান পলাতক হিসেবে রয়েছেন, বাকিরা হাজির আছেন।
নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, অক্সিজেন ও মুরাদপুর এলাকায় ব্যবসায়ীদের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে বিদেশি নম্বর থেকে কল দিয়ে চাঁদা আদায় করতেন ইমতিয়াজ। এ ছাড়া সন্ত্রাসী ইমতিয়াজ সুলতান একসময় ‘রিচ কিডস’ নামের একটি আলোচিত কিশোর গ্যাং গ্রুপও পরিচালনা করতেন।লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান, অধিনায়ক, র্যাব-৭ চট্টগ্রাম।
সর্বশেষ ২৩ এপ্রিল চাঁদাবাজির ওই মামলার নির্ধারিত তারিখ থাকলেও ইমতিয়াজকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়নি, আনা হয়নি কারাগার থেকেও। মামলার নথি অনুযায়ী তিনি এখনো পলাতক। আগামী ২ জুলাই মামলার পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে।
আইনজীবীরা জানান, কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেলে অন্য মামলায় পলাতক দেখানোর সুযোগ নেই। তাঁকে সেই মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখাতে হয়।
পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, ১৭ ফেব্রুয়ারি নগরের বায়েজিদ বোস্তামী লিংক রোড থেকে ইমতিয়াজকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তাঁর কাছ থেকে ২টি বিদেশি পিস্তল, ৫টি ম্যাগাজিন ও ৫৬টি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় আবুল কালাম আজাদ নামের তাঁর এক সহযোগীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় র্যাব বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে মামলা করে।
পুলিশ সূত্র জানায়, একসময় বড় সাজ্জাদের সহযোগী হলেও এখন তাঁর সঙ্গে বিরোধ চলছে ইকরামের। গ্রেপ্তারের পরদিন আদালতের মাধ্যমে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয় ইমতিয়াজকে।
র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের নভেম্বরে নির্বাচনী গণসংযোগে গুলিতে মারা যাওয়া সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা ও সন্ত্রাসী মো. ফিরোজের সঙ্গে চাঁদাবাজি করতেন ইমতিয়াজ। একসময় দুবাইতে ছিলেন। সেখানে বসে বড় সাজ্জাদের নির্দেশমতো তাঁরা চাঁদাবাজি করতেন। ইমতিয়াজ ভারত হয়ে দুবাইতে যান, পরে দেশে ফিরে আসেন।
কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ইমতিয়াজ চট্টগ্রামের সাবেক সিটি মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। চট্টগ্রামের স্কুলছাত্রী তাসফিয়া হত্যা মামলার আসামি হওয়ার পর তিনি পালিয়ে ভারত হয়ে দুবাই চলে যান। সেখানে গিয়ে সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলার সঙ্গে সখ্য হয় তাঁর।
কর্নেল হাফিজুর রহমান আরও বলেন, নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, অক্সিজেন, মুরাদপুর এলাকায় ব্যবসায়ীদের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে বিদেশি নম্বর থেকে কল দিয়ে চাঁদা আদায় করতেন ইমতিয়াজ। এ ছাড়া সন্ত্রাসী ইমতিয়াজ সুলতান একসময় ‘রিচ কিডস’ নামের একটি আলোচিত কিশোর গ্যাং গ্রুপও পরিচালনা করতেন। বিভিন্ন সময়ে নিজের পরিচয় গোপন করে প্রায় সময় দেশে আসা-যাওয়া করতেন।
ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে স্কুলছাত্রী তাসফিয়া আমিন হত্যা মামলা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও নাশকতার পাঁচটি মামলা রয়েছে। পুলিশ সূত্র জানায়, ইমতিয়াজ বড় সাজ্জাদের হয়ে কাজ করলেও পরে দুজনের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। গত বছরের মার্চে ছোট সাজ্জাদকে ধরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই বিরোধ। এরপর বড় সাজ্জাদ, তাঁর সহযোগী রায়হানসহ সন্ত্রাসীরা ইমতিয়াজকে হুমকি দিয়ে আসছেন, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। হুমকির পর ইমতিয়াজের বাসায় নগর পুলিশের পক্ষ থেকে পাহারাও বসানো হয়। ইমতিয়াজের স্ত্রী রুমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর স্বামীকে র্যাব দিয়ে ফাঁসানো হয়েছে। বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদই এই কাজ করেছেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সন্ত্রাসী ইমতিয়াজকে কেন শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর আবেদন করা হয়নি, তা জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মফিজুল হক ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। পুলিশের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। শিগগিরই গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হবে।’ বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল করিম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুস সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, কোনো মামলার পলাতক আসামি অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হলে তাঁকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর আবেদন করবেন পিপি কিংবা তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ। পিপি কিংবা পুলিশ আবেদন না করলে পলাতক সেই আসামি যে মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন, সেই মামলায় দ্রুত জামিনে বেরিয়ে যেতে পারেন। পরবর্তী সময় তাঁকে আর গ্রেপ্তার না–ও করা যেতে পারে। এতে আসামি বিচারের আওতায় আসবে না। এতে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়বে।