
সিলেটের জকিগঞ্জে হাওর থেকে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বোরহান উদ্দিন ওরফে শফির (৫৯) পোড়া মরদেহ উদ্ধারের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। সেই সঙ্গে এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে দুজন আদালতে ফৌজধারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দির বরাতে পুলিশ জানিয়েছে, নিজের কেনা মোটরসাইকেল ফেরত দিতে চাপ দেওয়ায় খুন হয়েছেন বোরহান।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন জকিগঞ্জের ইলাবাজ গ্রামের সাব্বির আহমেদ (২১), সিলেটের ওসমানীগরের সৈয়দ মেহরাজ উজ সামাদ ওরফে শোভন (২০) ও জকিগঞ্জের ঘেচুয়া গ্রামের তাহিরুল হক (২০)। তাঁদের মধ্যে সাব্বির আহমদ ও মেরাজ উজ জামান গতকাল শনিবার রাতে জকিগঞ্জ সহকারী জজ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এর আগে গত শুক্রবার সাব্বির আহমদকে জকিগঞ্জ থেকে, শনিবার নারায়ণগঞ্জের পূর্বাচল থেকে সৈয়দ মেহরাজ উজ জামানকে এবং একই দিন জকিগঞ্জের লালাগ্রাম থেকে তাহিরুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিলেট জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী গত ৩০ জানুয়ারি সিলেট থেকে কুলাউড়া যাওয়ার জন্য মোটরসাইকেলে করে বের হয়েছিলেন। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। এ ঘটনায় সিলেটের বিমানবন্দর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি জকিগঞ্জের সুলতানপুর ইউনিয়নের সাতঘরি ও বিলপাড় এলাকার মধ্যবর্তী কোনারবন্দ হাওর থেকে একটি পোড়া মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) লাশটি বোরহান উদ্দিনের বলে শনাক্ত করে।
নিহত বোরহান সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার হাবিবুর আশিঘর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি সিলেট নগরের আম্বরখানা এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তির বোন শাহ আসমা জাহান গত ৭ ফেব্রুয়ারি সিলেটের জকিগঞ্জ থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি মামলাটি সিলেট জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আদালত সূত্রে জানা যায়, আদালতের জবানবন্দিতে সাব্বির ও মেরাজ উজ জামান যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বোরহান উদ্দিনের মোটরসাইকেল ফিরে চাওয়ায় পরিকল্পিতভাবে খুনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। বোরহান দেশে অবস্থান করলে মোটরসাইকেলটি চালাতেন। তিনি চলে গেলে মোটরসাইকেলটি পড়ে থাকত। বোরহান যুক্তরাজ্য অবস্থানকালে মোটরসাইকেলটি সাব্বিরকে চালানোর জন্য দিয়েছিলেন। এবার দেশে ফেরার আগে মোটরসাইকেলটি সাব্বিরের কাছ থেকে ফেরত চান বোরহান। মোটরসাইকেলটি সাব্বিরের কাছ থেকে নিয়ে অন্য একজনকে দেওয়ার কথা ছিল। মোটরসাইকেলটি দ্রুত ফেরত দিতে চাপ দিচ্ছিলেন বোরহান। এ নিয়ে সাব্বিরের সঙ্গে বোরহানের দ্বন্দ্ব শুরু হয়।
আসামিদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে আদালতের একটি সূত্র জানায়, বোরহান উদ্দিন যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালেই তাঁকে হত্যার জন্য ২৫ জানুয়ারি পরিকল্পনা করেন সাব্বির, মেহরাজ এবং আরও একজন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩০ জানুয়ারি বোরহানকে মোটরসাইকেলে জকিগঞ্জের হাওরে নিয়ে যান সাব্বির। পরে সেখানে তিনজন মিলে বোরহানকে মারধর শুরু করেন। কিল, ঘুষি এবং মোটরসাইকেলের হেলমেট দিয়ে আঘাতের একপর্যায়ে মারা যান বোরহান উদ্দিন। পরে লাশ গুম করতে লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
সিলেট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকির হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, মূলত মোটরসাইকেল নিয়ে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বোরহান উদ্দিনের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়। সেই বিরোধের জের ধরেই পরিকল্পিতভাবে তাঁকে খুন করে লাশ গুমের চেষ্টা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর মোটরসাইকেলটিও উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, মামলাটি ক্লু-লেস ছিল। জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় মামলাটি মূল রহস্য উদ্ঘাটন করে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে তাহিরুল হকের কাছ থেকে বোরহান উদ্দিনের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় আরও একজনের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। তাঁকে গ্রেপ্তারের অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।