
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ও রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া নৌপথ। প্রতিদিন এই নৌপথ দিয়ে কয়েক হাজার যাত্রী ও যানবাহন পারাপার হয়। তবে মাত্র আড়াই মাসের ব্যবধানে দুটি বড় দুর্ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বারবার দুর্ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ঘাটে ভেড়ানো কে-টাইপ ফেরি ‘করবী’র র্যাম্প ভেঙে ঢাকাগামী ‘এসবি সুপার ডিলাক্স’ নামের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। ফেরিতে ওঠার আগে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। ঈদের ছুটির শেষ সপ্তাহে কর্মস্থলে ফিরছিলেন ৩৭ জন যাত্রী ও কয়েকটি শিশু। দুর্ঘটনার সময় বাসে শুধু চালক ও তাঁর সহকারী ছিলেন। পরে তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এর প্রায় আড়াই মাস আগে, গত ২৫ মার্চ বিকেলে দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায় সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস। ওই দুর্ঘটনায় অন্তত ২৬ জন যাত্রী প্রাণ হারান।
সে ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ছয় সদস্যের এবং জেলা প্রশাসন পাঁচ সদস্যের দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে কী উঠে এসেছে, তা প্রকাশ করা না হলেও ১৭ মে রাজবাড়ীতে পদ্মায় বাসডুবিতে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের মধ্যে চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ত্রুটিযুক্ত যানবাহন ও চালকের অদক্ষতাকে দায়ী করে বক্তব্য দেন।
গতকালের বাসডুবির ঘটনায়ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় একজন যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। একই সঙ্গে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে সাত সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুটি কমিটিকেই আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
তবে বারবার দুর্ঘটনা ও তদন্ত কমিটি গঠনের মধ্যেই কি সব সীমাবদ্ধ থাকবে—এ প্রশ্ন তুলেছেন অনেক যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দা। তাঁদের দাবি, কালক্ষেপণ না করে দৌলতদিয়াকে আধুনিক নৌবন্দর হিসেবে গড়ে তোলা হোক অথবা দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া নৌপথে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হোক।
দুর্ঘটনাকবলিত এসবি সুপার ডিলাক্সের যাত্রী সাইদুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার সঙ্গে দুই মেয়েসহ পরিবারের চার সদস্য ছিলেন। ফেরিতে ওঠার আগে যদি আমাদের নামিয়ে না দেওয়া হতো, হয়তো আজ আমরা কেউ বেঁচে থাকতাম না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর এই ঘাট দিয়ে পারাপার হব না। পদ্মা সেতু দিয়ে ঘুরে যাব। এ জন্য এক-দুই ঘণ্টা বেশি সময় লাগবে। তারপরও বিকল্প পথ দিয়ে যাতায়াত করব।’
স্কুলশিক্ষক ও সমাজকর্মী সফিক মণ্ডল বারবার দুর্ঘটনার জন্য ঘাটের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে বলেন, ঘাট থেকে সরকার প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় করছে। তাহলে ঘাটের কেন অব্যবস্থাপনা দূর হবে না। বারবার দুর্ঘটনা ঘটবে আর তদন্ত কমিটি হবে, তাতে কার কী লাভ হবে? তিনি দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন চান
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে নেতা–কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ঘাটে আসেন কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সহসভাপতি আসলাম মিয়া। তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনা রোধে মান্ধাতার আমলের ঘাট ব্যবস্থাপনা বন্ধ করে দৌলতদিয়াকে আধুনিক নৌবন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অথবা এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করতে হবে।’
আরিচা লঞ্চ মালিক সমিতির দৌলতদিয়া ঘাটের তত্ত্বাবধায়ক নূরুল আনোয়ার বলেন, ঈদ–পরবর্তী সপ্তাহের ছুটির শেষ দিন শুক্রবার সকাল থেকেই যাত্রীদের ভিড় ছিল। দুর্ঘটনার পর ধীরে ধীরে যাত্রীর চাপ কমে যায়। নদী পারাপারের জন্য আসা অধিকাংশ যাত্রী এই ঘাট ব্যবহার করতে অনীহা প্রকাশ করেন। ফলে শনিবার যাত্রীর কোনো চাপ নেই।
কমেছে যানবাহনের চাপ, বেড়েছে পণ্যবাহী গাড়ির সারি
আজ শনিবার সকাল থেকে যাত্রীবাহী যানবাহনের সংখ্যা কমেছে। শুক্রবার দুর্ঘটনার কারণে ৭ নম্বর ঘাট দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে পণ্যবাহী ট্রাকের চাপ তৈরি হয়। সকালে ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা–খুলনা মহাসড়কে প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা যায়।
বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন বলেন, আড়াই মাসের ব্যবধানে দুটি বড় দুর্ঘটনা এ অঞ্চলে মানুষের মাঝে ভীতি সৃষ্টি করেছে। শুক্রবার বিকেল থেকে যাত্রীবাহী পরিবহন সংখ্যা অনেক কমে যায়। দুর্ঘটনার পর পণ্যবাহী গাড়ি সাময়িক বন্ধ রাখায় এসব গাড়ির লম্বা লাইন সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে ২৫ মার্চ বাসডুবির পর বাড়তি সতর্কতা হিসেবে ঘাটে আগত যাত্রীদের সচেতন করা হচ্ছে। ফলে শুক্রবার অল্পের জন্য অন্তত ৪০ জন যাত্রী বেঁচে যান।
২৫ মার্চের দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে শুক্রবার এসবি সুপার ডিলাক্স পরিবহন থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয়। যার ফলে বাসের সব যাত্রী প্রাণে রক্ষা পান।