মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় সাবেক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের পৈতৃক বাড়ির সামনে এই সড়ক নির্মাণ করাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত সোমবার তোলা
মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় সাবেক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের পৈতৃক বাড়ির সামনে এই সড়ক নির্মাণ করাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত সোমবার তোলা

শ্রীনগরে সাবেক উপদেষ্টা আদিলুরের বাড়ির সামনে সড়ক নির্মাণ নিয়ে বিতর্ক

মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের শিল্প, গৃহায়ণ ও গণপূর্তবিষয়ক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের পৈতৃক বাড়ির সামনে একটি সড়ক নির্মাণ করা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাবেক উপদেষ্টাকে সুবিধা দিতে প্রভাব খাটিয়ে একটি পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে জমি দখল করে সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। প্রশাসনের ভাষ্য, কারও ব্যক্তিগত জমিতে নয়, নিয়ম মেনেই সরকারি জমিতে জনসাধারণের চলাচলের জন্য সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা কার্যালয় ও ঠিকাদার সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ষোলঘর ইউনিয়নের ভূইয়াপাড়া এলাকায় ভূইয়াবাড়ি থেকে পালবাড়ি পর্যন্ত আরসিসি সড়কটির দৈর্ঘ্য ৪০২ মিটার ও প্রস্থ ১২ ফুট। ৯৩ লাখ ৪৯ হাজার ৫৮৯ টাকা ব্যয়ে সড়কটি নির্মাণ করেছে ‘ওরিয়া কনস্ট্রাকশন’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ডিসেম্বরে।

গত সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কটির সঙ্গে সংযুক্ত থাকা মূল সড়ক ১০ থেকে ১২ ফুট চওড়া হলেও সদ্য নির্মিত সড়কটি ন্যূনতম ১৪ ফুট প্রস্থ। সড়কটির পালবাড়ির অংশ দিয়ে প্রস্থ প্রায় ১৮ ফুট। এ সড়কটির মাঝামাঝি এলাকায় সাবেক উপদেষ্টা আদিলুর রহমানের পৈতৃক বাড়ি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমল থেকেই নির্মাণ করা সড়কটির ওই এলাকায় সরু একটি পায়ে চলার পথ ছিল। সড়কটির প্রবেশমুখে পালবাড়ি নামে হরোমোহন ধুপিদের ২৪ শতাংশ জমি ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় হরোমোহন ধুপিরা ভারতে চলে যান। তখন ওই জমির বর্তমান মালিক দাবি করা লুৎফে হাবীব, নাঈমা হাবিব, ইমরান হাবিব, নাসিমা হাবিব ও শারমিন রহমানের দাদা লুৎফে আলী ভূইয়া কিনে রাখেন বলে দাবি তাঁদের। কিন্তু স্থানীয় লোকজনের দাবি, লুৎফে হাবীবের দাদা জমিটি কেনেননি। ২০০৪ সালের দিকে ওই কাঁচা সড়কটি পাকা ও প্রশস্ত করার উদ্যোগ নিলে লুৎফে হাবীবরা বাধা দেন। তখন থেকে লুৎফে হাবীবদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয় সাবেক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানদের।

২০০৭ সালে জেলা প্রশাসন বাদী হয়ে ওই জায়গা সরকারের পক্ষে নিতে মামলা করে। তবে ২০১৮ সালে লুৎফে হাবীবদের পক্ষে নিম্ন আদালত রায় ঘোষণা করেন। পরে সরকার পক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আদিলুর রহমান উপদেষ্টা হলে জেলা প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে আপিল করে।

জেলা প্রশাসন জানায়, হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় খারিজ করে লুৎফে হাবীবদের দখলে থাকা ১২ শতাংশ জমি খাস খতিয়ানভুক্ত করেন। অবশিষ্ট ১২ শতাংশের দলিল যাচাইয়ের নির্দেশ দেন। পরে ওই জায়গায় গত বছরের শেষ দিকে সাইনবোর্ড টানানো হয়।

তবে গত বছরের ১৯ আগস্ট আদালতের একটি আদেশে বলা হয়, রাষ্ট্র যদি বৈধ প্রমাণের মাধ্যমে দেখাতে পারে যে, ওই জমি বাংলাদেশে অবস্থিত কোনো বৈধ মালিক বা অনুমোদিত রক্ষণাবেক্ষণকারীর নেই, তাহলে দেওয়ানি আদালত ওই জমির মালিকানা রাষ্ট্রের অনুকূলে ঘোষণা করতে পারেন।

লুৎফে হাবীব অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের জায়গায় ২০টি পরিবার বসবাস করত। দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছিল। আমরা আইনিভাবে লড়েছি। সেই জায়গায় আদালতের স্থিতাবস্থা ছিল। শেষ পর্যন্ত আদিলুর রহমানকে সুবিধা দিতে জেলা প্রশাসন জায়গাটি খাস ঘোষণা করে। রাজউকের লোকজন উপস্থিত থেকে স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে জোর করে মনগড়া সড়ক বানিয়েছে। খাস সম্পত্তির ব্যানার বাড়িতে টানিয়ে দেয়। বৈদ্যুতিক খুঁটি মূল সড়ক থেকে এনে আমাদের বাড়িতে বসায়। আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেয়। ১২ ফুটের সড়ককে নিয়মের বাইরে গিয়ে ১৮ থেকে ২০ ফুট বানায়।’

বসতভিটার আরেক মালিক শারমিন রহমানের পক্ষে কাজী রুবেল জানান, ‘৮ থেকে ১০ ফুটের একটি সড়ক হলে যথেষ্ট ছিল। আমরা সেই পরিমাণ জায়গা রেখে সীমানাপ্রাচীরের ভেতর ঘরবাড়ি করেছিলাম। আমাদের কেনা সম্পত্তিকে খাস সম্পত্তি বানিয়েছে। বর্তমান সরকারের কাছে আমরা ন্যায়বিচার চাই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার ওরিয়া কনস্ট্রাকশনের কর্ণধার সাইফুর রহমান বলেন, ১২ ফুটের অনুমোদনে রাস্তাটি নির্মাণ শুরু করা হয়। পরে এই সড়ক দিয়ে গাড়ি ঢুকতে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কোনো কোনো জায়গায় ১৬ ফুটের বেশি করা হয়েছে। এটি প্রকল্প–সংশ্লিষ্টদের নির্দেশে করা হয়েছে।

নিয়ম না মেনে সড়ক প্রশস্তের বিষয়ে জানতে শ্রীনগর উপজেলা প্রকৌশলী মো. মহিফুল ইসলামের মুঠোফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি।

মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী প্রথম আলোকে বলেন, জেলা প্রশাসক হিসেবে খাস খতিয়ানভুক্তের একটি সাইনবোর্ড দেওয়া হয়েছিল। তবে তাঁরা যখন জানতে পারেন, আদালতে স্থিতাবস্থা আছে, তখন সাইনবোর্ড সরিয়ে নেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, সড়কটি ১২ ফুট হওয়ার কথা। সেটি কতটুকু বেশি করা হয়েছে, বিষয়টি সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে সড়কটি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সড়ক দিয়ে চলাচলকারী পথচারী ও যানবাহনের চালকেরা বলেন, আগে সড়কটি কাঁচা ছিল। বৃষ্টির সময় পানিতে তলিয়ে যেত। মানুষকে কাদাপানির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হতো। সড়ক নির্মাণের পর এই দুর্ভোগ লাঘব হয়েছে। এখন সহজে বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করা যাচ্ছে।