
বৈরী আবহাওয়ায় সকাল থেকেই বরিশালের আকাশ মেঘলা। থেমে থেমে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। তবু প্রয়াত স্বজনদের স্মরণ করতে বরিশাল মহাশ্মশানে ছাতা মাথায় এসেছেন স্বজনেরা। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মোমের শিখায় আলোকিত হয়ে ওঠে সমাধিগুলো। বর্ণিল হয়ে ওঠে চারদিক। এ যেন এক উৎসবের নগর।
মোমের আলো আর ধূপ-আগরের সুগন্ধে পুরো এলাকায় অপার্থিব আবহ তৈরি করে। বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। তাঁদের অনেকে প্রিয়জনদের স্মরণ আবার অনেকে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখার জন্য এসেছেন।
নগরের কাউনিয়া এলাকার মহাশ্মশানে আজ রোববার সন্ধ্যার দীপাবলি উৎসবের দৃশ্য ছিল এমনই। ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় শ্মশানে দীপাবলির আয়োজন করা হচ্ছে। করোনার কারণে দুই বছর উৎসব ছিল ম্রিয়মাণ। তবে এবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় আগে থেকেই ব্যাপক সমাগমের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। আয়োজকেরা জানান, প্রতিবছর কালীপূজার আগের দিন ভূতচতুর্দশীর পূর্ণ তিথিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রয়াত স্বজনদের সমাধিতে দ্বীপ জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
নগরের কালীবাড়ি এলাকার বাসুদেব ঘোষ পরিবার নিয়ে প্রয়াত বাবা কেশবচন্দ্র ঘোষের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকি। বাবাকে শ্রদ্ধা জানাতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে এখানে এসেছি। সন্ধ্যায় যখন মোম, আগর, ধূপ জ্বেলে শ্রদ্ধা জানাই, হৃদয়ে এক অপার প্রশান্তি অনুভব করি। যেন প্রয়াত বাবার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি।’
এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দীপাবলি উৎসব উদ্যাপনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেন আয়োজকেরা। বরিশাল মহাশ্মশান রক্ষা কমিটি আয়োজনের উদ্যোক্তা। কমিটির সভাপতি মানিক মুখার্জি প্রথম আলোকে বলেন, আজ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে এবারের দীপাবলি উৎসব পালিত হচ্ছে। দুই বছর করোনার কারণে আয়োজন সীমিত থাকলেও এবার বর্ণিল আয়োজন করা হয়েছে।
প্রায় ছয় একর জমির ওপর মহাশ্মশান এলাকাটি বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে সুসজ্জিত তোরণ। রঙিন আলোর আলোকসজ্জায় অমাবস্যার অন্ধকার ছাপিয়ে পুরো এলাকা আলোকিত। প্রতিবছর দীপাবলি উৎসবে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয় মহাশ্মশানে।
বরিশাল মহাশ্মশানে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের বাবা সত্যানন্দ দাশগুপ্ত, পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা দেবেন ঘোষ, মনোরমা বসুর মাসিমাসহ বহু খ্যাতিমান ব্যক্তির সমাধি আছে। মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তমাল মালাকার বলেন, মহাশ্মশানে কাঁচাপাকা মিলিয়ে প্রায় ৬৫ হাজার সমাধি আছে।
বরিশাল মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদের সহসভাপতি গোপাল সাহা বলেন, উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ দীপাবলি উৎসব শুধু বরিশাল মহাশ্মশানেই আয়োজন করা হয়। এর বয়স ২০০ বছরের বেশি। এখানে ভারত, নেপালসহ বহু দেশ থেকে প্রচুর মানুষ প্রয়াত স্বজনদের স্মরণ করতে আসেন। প্রিয়জনদের পছন্দের খাবার ও নৈবেদ্য থরে থরে সাজিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
শ্মশানে প্রয়াত বড় ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসা মনোতোষ দাস বলছিলেন, ‘বছরের একটা দিন প্রদীপ প্রজ্বালন করে প্রয়াত ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এখানে আসি। এর আগে সমাধি পরিচ্ছন্ন ও রঙের কাজ করাই। পুরো আয়োজন ঘিরে আমাদের ভিন্ন রকমের ভালো লাগা কাজ করে। যখন এখান থেকে ফিরে যাই, তখন নিজের মধ্যে পরিশুদ্ধির ঘ্রাণ পাই।’