
ঈদের ছুটি প্রায় শেষ হলেও রাজশাহীর সবচেয়ে বড় আমের মোকাম বানেশ্বর হাটে এখনো বেচাকেনা জমেনি। প্রতিদিন হাটে আমের সরবরাহ বাড়ছে। বিশেষ করে গতকাল শনিবার থেকে হিমসাগর বা ক্ষীরশাপাতি আম পাড়া শুরু হওয়ায় হাট সরগরম হয়ে উঠেছে। তবে সেই তুলনায় ক্রেতা ও পাইকারদের উপস্থিতি কম।
রোববার দুপুরে বানেশ্বর আমের হাট ঘুরে দেখা যায়, ছোট ট্রাক, পিকআপ ও ভ্যানে করে বিভিন্ন এলাকা থেকে আম আসছে। ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের পাশে সবজিবাজারে বসেছে আমের হাট। সরবরাহ এত বেশি যে আমের গাড়ি মহাসড়ক পর্যন্ত চলে গেছে। গাড়ি থেকে বিক্রেতারা দাম হাঁকছেন। কিন্তু অনেকেই কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ।
জেলা প্রশাসনের ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী, গতকাল শনিবার থেকে হিমসাগর আমের বাজারজাত শুরু হয়েছে। বর্তমানে আকার ও মানভেদে প্রতি মণ হিমসাগর ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমের শুরুর আম গোপালভোগ আমের দাম ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। এ ছাড়া গুটি আম ৫০০ থেকে ৭০০ এবং লক্ষ্মণভোগ ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে।
বানেশ্বরের বাগানমালিক মো. মঞ্জু গোপালভোগ ও হিমসাগর আমভর্তি ভ্যান নিয়ে হাটে এসেছেন। এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে দর–কষাকষি করছিলেন। হিমসাগর আমের দাম চাচ্ছিলেন ১ হাজার ৮০০ টাকা। ব্যবসায়ী ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বলে চলে গেলেন। পরে মঞ্জু তাঁকে ডেকে আরও ৫০ টাকা করে দিতে বলেন। তবে ১ হাজার ৬০০ টাকাই আমের গায়ে লিখে দিলেন ওই ব্যবসায়ী।
মো. মঞ্জু বলেন, ‘গতকাল গোপালভোগ ১ হাজার ৭৫০ টাকায় বিক্রি করেছি। আজ একই আমের জন্য কেউ ১ হাজার ২০০, কেউ ১ হাজার ৩০০ টাকা বলছেন। ঈদের কারণে অনেক পাইকার আসতে পারেননি। তাই বাজারে দরপতন হয়েছে। আর হিমসাগরের দাম কেমন, তা তো দেখলেনই।’ তিনি বলেন, আমের বাগানে সারা বছর পরিচর্যার খরচ থাকে। মৌসুমে ভালো দাম না পেলে সেই খরচ তোলা কঠিন হয়ে যায়।
বাজারে আম কিনতে আসা ব্যবসায়ী ওসমান মিয়া বলেন, হিমসাগর এখন গাছপাকা অবস্থায় বাজারে আসতে শুরু করেছে। বড় আমের দাম তুলনামূলক ভালো। তবে ছোট আমের দাম কম। বাজারে আম বেশি; কিন্তু ক্রেতা কম। কয়েক দিন পর পরিস্থিতি ভালো হতে পারে। তিনি বলেন, ঈদের ছুটির কারণে অনেক পাইকার এখনো বাজারে ফেরেননি। এ জন্য সরবরাহের তুলনায় চাহিদা কম।
আরেক ব্যবসায়ী মো. আসিম মিয়া বলেন, ঈদের আগের তুলনায় বাজার কিছুটা ভালো। এখন হিমসাগর ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তবে এবার গোপালভোগের দাম পাওয়া গেল না। তিনি বলেন, এবার তিনি প্রায় ৩০০ গাছের বাগান কিনেছেন। বিভিন্ন জাতের আম থাকলেও লক্ষ্মণভোগের পরিমাণ বেশি। তবে গত বছরের তুলনায় লক্ষ্মণভোগের দাম কম। এবার দাম না পেলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে।
বাগানমালিক কাবিদ বাসারের কণ্ঠে ছিল হতাশার সুর। তিনি বলেন, ‘আজ হিমসাগর ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করেছি। আমদানি বেশি হওয়ায় বাজার কিছুটা কম। কয়েক দিন পর কী হবে, সেটা বলা কঠিন। দাম না বাড়লে লোকসান হবে।’
গত বছরের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এবারের বাজারের তুলনা টানেন অনেক ব্যবসায়ী। তাঁদের ভাষ্য, গত বছর মৌসুমের শেষ দিকে গোপালভোগের দাম সাড়ে ৩ হাজার টাকার বেশি উঠেছিল। কিন্তু এবার মৌসুমের শুরু থেকেই দাম কম। গোপালভোগ ও লক্ষ্মণভোগ আম নিয়ে আসা মো. বাপ্পি বলেন, ঈদের আগে যে আম ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা ক্যারেট বিক্রি করেছি, এখন তা ৬০০ টাকাও হচ্ছে না।
তবে ব্যবসায়ীদের অনেকে এখনো আশাবাদী। তাঁদের ধারণা, ঈদের ছুটি শেষ হলে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকারেরা বাজারে ফিরলে চাহিদা বাড়বে। তখন দামও কিছুটা বাড়তে পারে।
রাজশাহী বিভাগের আম উৎপাদনের প্রধান তিন জেলা রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ। এর মধ্যে বানেশ্বর আমের হাটকে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার হিসেবে ধরা হয়। প্রতিদিন বেলা বাড়লে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকারেরা এখানে কেনাবেচা করেন। তবে এবার ঈদের পর এখনো হাট জমেনি।
এবার রাজশাহীর ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৫ মে থেকে গুটি আম, ২২ মে থেকে গোপালভোগ, ২৫ মে থেকে রানিপসন্দ ও লক্ষ্মণভোগ এবং ৩০ মে থেকে হিমসাগর বাজারজাত শুরু হয়েছে। আগামী ১০ জুন থেকে ল্যাংড়া ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো, ১৫ জুন থেকে আম্রপালি ও ফজলি বাজারে আসবে।