মাইন বিস্ফোরণে পা হারানো অন্তাই তঞ্চঙ্গা তাঁর দোকানে বসে। গত বুধবারে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের তমব্রু হেডম্যান পাড়ায়
মাইন বিস্ফোরণে পা হারানো অন্তাই তঞ্চঙ্গা তাঁর দোকানে বসে। গত বুধবারে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের তমব্রু হেডম্যান পাড়ায়

‘আর কত লোক পঙ্গু হলে মাইন বিস্ফোরণ বন্ধ হবে’

গত পাঁচ বছরে ২৭ জন পঙ্গু হয়েছেন মিয়ানমার সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তের ২২০ কিলোমিটারে মাইন বিস্ফোরণে এসব ঘটনা ঘটেছে। তবে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে ঘটনা বেশি ঘটেছে। খেতে কাজ করতে গিয়ে আবার কখনো গরু-ছাগল আনতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে পা হারান তাঁরা। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে না পারা এসব মানুষ দিন পার করছেন অর্থকষ্টে।

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের তমব্রুর হেডম্যানপাড়ার অবস্থান সীমান্ত সড়ক ঘেঁষে। সড়কের এক পাশে ছোট একটা দোকান। দোকানের ৩০০ গজ দূরেই মিয়ানমার সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া স্পষ্ট দেখা যায়। দোকানের পেছনে ঢেউ খেলানো পাহাড়। তার নিচে ছড়ানো ধানের খেত।

দোকানের সামনের জায়গাটায় ছড়িয়ে আছে খোলা পান আর সুপারি। পাশের র‍্যাকে ও পেছনে নানা ধরনের বিস্কুট, সয়াবিন তেলের ছোট বোতল, ১০ টাকা দামের গুঁড়া দুধের ছোট প্যাকেট। ভেতরে বসে ক্রেতা সামলাচ্ছিলেন সুদর্শন এক যুবক, বয়স বড়জোর ৩০ বছর। তরুণের পাশেই দোকানের মালপত্রের গায়ে হেলান দেওয়া এক জোড়া ক্রাচ। ক্রেতাদের কাউকে পান, কাউকে সিগারেট এগিয়ে দিচ্ছিলেন দোকানি। তবে সব কাজই সারতে হচ্ছিল বসে থেকেই। কাস্টমার অর্থাৎ ক্রেতা বাড়লে শারীরিক যন্ত্রণার ছাপও পড়ছিল মুখে। যুবকের নাম অন্তাই তঞ্চঙ্গ্যা। পাশের ক্রাচ ও তাঁর বসে থাকার কারণ, তাঁর বাঁ পা নেই। মাইন বিস্ফোরণে পা হারিয়েছেন।

সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে পা হারানো মানুষজন কেমন আছেন জানতে কয়েক দিন ধরে কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ আর বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে ঘুরতে ঘুরতে তমব্রু হেডম্যানপাড়ার অন্তাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়। গতকাল বুধবার দুপুরে তাঁর কাহিনি শুনতে চাই ক্রেতাদের ভিড় একটু পাতলা হলে এলে। মনিহারি পণ্যের রংচঙে প্যাকেটের মধ্যে বসে অন্তাই তাঁর জুমচাষি থেকে পা হারানো দোকানদার হওয়ার গল্প বলেন।

২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে বিজুর সময় তখন। পাহাড়ে উৎসবের ঢেউ। এ সময় পাহাড়িরা জঙ্গল কেটে জুমের জমি তৈরি করেন। অন্তাইও জুমখেতে কাজ করতে গিয়েছিলেন। হঠাৎ বিস্ফোরণের পর আর কিছু মনে নেই তাঁর। বেশ কয়েক মাস হাসপাতালে থেকে ক্রাচ নিয়ে যখন ফিরলেন, তখন জীবনটা বদলে গেছে। জুমচাষ করতে পারবেন না আর কখনো। তাই ধারদেনা করে সীমান্ত সড়কের পাশে দোকানটি দেন।

অন্তাই প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর চিকিৎসায় খরচ হয়েছে দুই লাখ টাকা। দোকানটি দাঁড় করাতে প্রায় ৭০ হাজার টাকা লেগেছিল। সবই এসেছে ধারদেনা থেকে। মাত্র ২০ হাজার টাকা সরকার থেকে সাহায্য পেয়েছেন। এরপর আর কোনো সাহায্য পাননি। স্ত্রী ও ছয় বছরের একটি শিশুসন্তান আছে অন্তাইয়ের। এখন কেবল তাদের ভাবনায় দিন কেটে যায় তাঁর।

দোকানের সামনের জায়গাটায় ছড়িয়ে আছে খোলা পান আর সুপারি। পাশের র‍্যাকে ও পেছনে নানা ধরনের বিস্কুট, সয়াবিন তেলের ছোট বোতল, ১০ টাকা দামের গুঁড়া দুধের ছোট প্যাকেট। ভেতরে বসে ক্রেতা সামলাচ্ছিলেন সুদর্শন এক যুবক, বয়স বড়জোর ৩০ বছর। তরুণের পাশেই দোকানের মালপত্রের গায়ে হেলান দেওয়া এক জোড়া ক্রাচ। ক্রেতাদের কাউকে পান, কাউকে সিগারেট এগিয়ে দিচ্ছিলেন দোকানি। তবে সব কাজই সারতে হচ্ছিল বসে থেকেই।

দোকান থেকে বিদায় নেওয়ার আগে পেছন থেকে ডাক দেন অন্তাই। বলেন, একটা প্রশ্ন ছিল। ফিরে তাকাতেই বলেন, সরকারের কাছে একটু জানতে চাইবেন, আর কত লোক পঙ্গু হলে মাইন বিস্ফোরণ বন্ধ হবে?

অন্তাইয়ের বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে বাইশারি এলাকায় দেখা অটোরিকশাচালক পিয়ারা তঞ্চঙ্গ্যার সঙ্গে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে খেতে কাজ করতে গিয়ে বাঁ পা হারান তিনি। এখন কৃষক থেকে পরিণত হয়েছেন অটোরিকশাচালকে। পিয়ারা বলেন, পা হারিয়ে বাধ্য হয়ে অটোরিকশা চালাচ্ছেন। তবে সব দিন চালাতে পারেন না। শরীরে এখনো যন্ত্রণা হয়। পরিশ্রম করলে কয়েক দিন শুয়ে-বসে থাকতে হয়। পিয়ারা তঞ্চঙ্গ্যার স্ত্রী লাকি তঞ্চঙ্গ্যার বলেন, ‘তিন সন্তান নিয়ে অনেক কষ্টে আছি। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

দৈনিক পত্রিকাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ২৭ জন পঙ্গু হয়েছেন মিয়ানমার সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তের ২২০ কিলোমিটারে মাইন বিস্ফোরণে এসব ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। তবে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে ঘটনা বেশি ঘটেছে। খেতে কাজ করতে গিয়ে আবার কখনো গরু-ছাগল আনতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে পা হারান তাঁরা। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে না পারা এসব মানুষ দিন পার করছেন অর্থকষ্টে।

ক্রাচে ভর দিয়ে জীবন পার করছেন এক সময়কার জুম চাষি অন্তাই তঞ্চঙ্গা। গত বুধবারে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের তমব্রু হেডম্যান পাড়ায়

গত সোমবার টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকার নাফ নদীসংলগ্ন সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে বাঁ পা হারান জেলে মোহাম্মদ হানিফ। বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। হানিফের ঘটনার পর থেকে মিয়ানমার–বাংলাদেশ সীমান্তের নাইক্ষ্যংছড়ি, উখিয়া ও টেকনাফের সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা মাইন আতঙ্কে রয়েছেন।

মিয়ানমার সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণ নিয়ে বাংলাদেশের তরফ থেকে একাধিকবার প্রতিবাদ জানানো হলেও পরিস্থিতি পাল্টায়নি। জানা গেছে, ভূমিমাইনে বিশ্বে যেসব দেশে হতাহতের ঘটনা ঘটে, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে মিয়ানমার। ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু ব্যান ল্যান্ডমাইনসের (আইসিবিএল) ‘ল্যান্ডমাইন মনিটর ২০২৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভূমিমাইন ও বিস্ফোরক ধারণকারী গোলাবারুদের আঘাতে ২০২৩ সালে মিয়ানমারে এক হাজার তিনজন হতাহত হয়েছেন। একই সময়ে সিরিয়ায় হতাহত হয়েছেন ৯৩৩ জন। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের মাইন নিষিদ্ধকরণ চুক্তি হয়। ভূমিমাইন তৈরি, ব্যবহার ও মজুত নিষিদ্ধ করা হয়েছে এই চুক্তিতে। তবে যেসব দেশ এই চুক্তিতে সই করেনি, মিয়ানমার তাদের মধ্যে একটি।

ভূমিমাইনে বিশ্বে যেসব দেশে হতাহতের ঘটনা ঘটে, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে মিয়ানমার। ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু ব্যান ল্যান্ডমাইনসের (আইসিবিএল) ‘ল্যান্ডমাইন মনিটর ২০২৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভূমিমাইন ও বিস্ফোরক ধারণকারী গোলাবারুদের আঘাতে ২০২৩ সালে মিয়ানমারে এক হাজার তিনজন হতাহত হয়েছেন। একই সময়ে সিরিয়ায় হতাহত হয়েছেন ৯৩৩ জন।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী থেকে শুরু করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও যে ভূমিমাইনের ব্যবহার বাড়িয়েছে, তা উঠে এসেছে আইসিবিএলের ‘ল্যান্ডমাইন মনিটর ২০২৪’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। কিছু ছবি বিশ্লেষণ করে মিয়ানমারে মাইন তৈরির ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়।

জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলি ও মাইন বিস্ফোরণ বন্ধে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলাপ–আলোচনা চলছে।

একটি এনজিও সংস্থার সহায়তায় কৃত্রিম পা পেয়েছেন নবী হোসেন। মাইন বিস্ফোরণে পা হারানো এই তরুণের জীবনের স্বাভাবিকতা নেই। গত বুধবার বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম সীমান্তের তুমব্রু এলাকায়

ভারী কিছু বহন নিষেধ

২০২৪ সালের ২৫ জুন বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু এলাকায় উপজেলার মিয়ানমার সীমান্তে গরু আনতে যান ২০ বছরের তরুণ নবী হোসেন। গরুর রশি ধরতে না ধরতে তাঁর ডান পা উড়ে যায় মাইন বিস্ফোরণে। চিকিৎসায় ব্যয় হয় প্রায় দুই লাখ টাকা। অন্য আর দশজনের মতো স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না নবী। এ কারণে এখনো তিনি কোনো কাজ করেন না।

দুই মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর সুস্থ হন নবী হোসেন। কিছুদিন আগে একটি এনজিও সংস্থা তাঁকে কৃত্রিম পা লাগিয়ে দেয়; কিন্তু এরপরও ভারী কোনো জিনিস বহন করতে পারেন না তিনি। এ জন্য কোনো কাজ করতে পারেন না। তাঁর ইচ্ছা ছোট একটি পানের দোকান দেওয়ার।

নবী হোসেনের বড় ভাই দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন ভাই। তাঁর ভবিষ্যৎ জীবন পড়ে আছে। কিছু করতে পারছেন না।

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে পা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় আব্দুল মালেকের। গত বুধবার দুপুরে ঘুমধুম সীমান্তে বাইশারীতে তার ঘরের সামনে

দিন কাটছে ঘরে বসে

২০২০ সালের এপ্রিল মাসে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্ত এলাকায় খেতে কাজ করার সময় মাইন বিস্ফোরণে ডান পা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় আবদুল মালেকের। ছয় মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ক্রাচে ভর দিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি।

বুধবার মালেকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ডান পায়ে লোহার খাঁচা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ডান পা ও পায়ের পাতার হাড় বিস্ফোরণে ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। এগুলো চিকিৎসার পর এখনো পুরোপুরি জোড়া লাগেনি। তাই পায়ে লোহার খাঁচা লাগিয়ে রেখেছেন চিকিৎসক। চলাফেরা করতে পারেন না। ডান পা থেকেও নেই তাঁর।

কীভাবে সংসার চলে জানতে চাইলে আবদুল মালেক বলেন, ‘লোকজন যে সাহায্য করে, তা দিয়ে চলি। একটি চা–দোকান দিয়েছিলাম; কিন্তু চালাতে পারিনি, নিজে সময় দিতে পারিনি।’

দুই সন্তান নিয়ে দিশাহারা মালেকের স্ত্রী আরাফা বেগম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কবে স্বামীর পা পুরোপুরি ভালো হবে জানেন না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি পাঁচ বছর ধরে কিছু করতে না পারায় অসহায় অবস্থায় আছেন তাঁরা।