সাবেক সচিব-চেয়ারম্যান দ্বন্দ্ব

এক পক্ষের সেচে বাধা, অপর পক্ষের ব্যবসায়

  • সাবেক সচিব পক্ষ বোরো খেতে সেচব্যবস্থাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। পক্ষটির নিয়ন্ত্রণে একটি পাম্প রয়েছে। 

  • সাবেক সচিব পক্ষকে ঘায়েল করতে চেয়ারম্যান পক্ষও  প্রতিপক্ষের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলতে দিচ্ছে না। 

কিশোরগঞ্জ জেলার মানচিত্র

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সাবেক সচিব আবদুল মান্নান ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান পক্ষের লোকজনের মধ্যে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব দিন দিন বাড়ছে। প্রতিদিন নতুন নতুন ঘটনায় উত্তেজনার আগুনে ঘি পড়ছে। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের দুশ্চিন্তার শেষ নেই।

আবদুল মান্নান ও মাফজুর রহমানের বাড়ি উপজেলার চান্দপুর ইউনিয়নের মানিকখালী পূর্বপাড়ায়। মাহফুজুর এবার ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তাঁর আপন ভাতিজা মনিরুজ্জামান মাটি ভরাটের কাজ করেন। গত শনিবার সকাল নয়টার দিকে মনিরুজ্জামানের লোকজন ট্রাক্টর দিয়ে সাবেক সচিবের বাড়ির সামনের সড়ক ব্যবহার করে মাটি পরিবহন করছিলেন। এ সময় সাবেক সচিবের বাড়ির লোকজন এই সড়ক ব্যবহার করে মাটি পরিবহন না করার কথা বলেন। কিন্তু ট্রাক্টরচালক বাধা উপেক্ষা করে মাটি পরিবহন করেন। তখন সাবেক সচিবের বাড়ির লোকজন চালক ও হেলপারদের মারধর করেন। এ ঘটনার জের ধরে আবদুল মান্নানের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে সাবেক সচিব মান্নান এবং ইউপি চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমানের ওই দ্বন্দ্বে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের দুশ্চিন্তার শেষ নেই।

স্থানীয় লোকজন জানালেন, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে সাবেক সচিব পক্ষ বোরো খেতে সেচব্যবস্থাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। পক্ষটির নিয়ন্ত্রণে একটি পাম্প রয়েছে। পাম্পের মাধ্যমে একটি হাওরে সেচ দেওয়া হয়। এই পাম্পের মাধ্যমে সাবেক সচিব পক্ষের পাশাপাশি চেয়ারম্যান পক্ষের কৃষকেরাও সুবিধা পেয়ে আসছিলেন। গত বৃহস্পতিবার চেয়ারম্যান পক্ষের কৃষকদের সেচসুবিধা কর্তন করে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে চেয়ারম্যান পক্ষ গতকাল শুক্রবার থেকে পাম্প বসানোর কাজ শুরু করেছেন।

এদিকে সাবেক সচিব পক্ষকে ঘায়েল করতে চেয়ারম্যান পক্ষও বসে নেই। পক্ষটির লোকজন ঘটনার পর থেকে সাবেক সচিবের বাড়ির লোকজনকে বাজারে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলতে দিচ্ছেন না। এতে অনেকে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। পাল্টাপাল্টি করে যাচ্ছে উভয় পক্ষ।

বাড়িতে ভাঙচুরের অভিযোগে সাবেক সচিবের পরিবারের পক্ষ থেকে চেয়ারম্যানকে প্রধান আসামি করে থানায় মামলা হয়েছে। মামলার বিষয়ে আবদুল মান্নানের ছোট ভাই নাসির উদ্দিন বলেন, ‘এক সপ্তাহ পেরিয়ে যেতে চলেছে, কিন্তু কোনো আসামি গ্রেপ্তার নেই। উল্টো এই সময়ে একটি মামলা হজম করতে হলো। আমাদের লোকজন দোকানপাট খুলতে পারছেন না। আমরাও বের হতে পারছি না।’

ইউপি চেয়ারম্যান মাহফুজুর বলেন, ‘প্রথমে হামলার শিকার হলো আমার লোকজন। বাড়িতে হামলাও হলো, অথচ তখন আমাদের আসামি হতে হয়েছে। এ কারণে আমাদেরও মামলায় যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। প্রতিপক্ষ প্রতিহিংসা থেকে এখন সেচ বন্ধ করে দিয়ে আমাদের ফসলি জমির ক্ষতির চেষ্টায় রয়েছে।’

সাবেক সচিব ও ইউপি চেয়ারম্যানের দ্বন্দ্বের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, দ্বন্দ্বের উৎস্য ছোট হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বড়। ঘটনার সামনে–পেছনে সামাজিক ও রাজনৈতিক বড় কারণ রয়েছে। গ্রামটিতে একটি মাজার রয়েছে। মাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা সময় এক ডজনের বেশি মামলা হয়েছে। পক্ষ দুটির অবস্থান বিপরীত।

গত বৃহস্পতিবার থানায় নতুন করে আরও একটি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। মারধর, শ্লীলতাহানি ও চুরির ধারায় মামলাটি করেন চেয়ারম্যান পক্ষের মো. আলী নামে এক ব্যক্তি। ওই মামলায় আসামি করা হয় ১০ জনকে। অজ্ঞাত আসামি করা হয় ২০ থেকে ২৫ জনকে। এজাহারভুক্ত আসামিরা সাবেক সচিবের চাচাতো ভাই, ভাতিজা ও ভাগনে।

পক্ষ দুটি নতুন নতুন অজুহাতে আরও মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। দ্বন্দ্ব মেটাতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা মোশতাকুর রহমানকে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি ভালো নেই। কোনো কিছুই ঠিক করা যাচ্ছে না। 

সাবেক সচিব ২০২১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নিজ বাড়িতে হামলার শিকার হয়েছিলেন। সেই সময় বাড়ির কাছে একটি ক্লিনিক নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন তিনি। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদকে অবগত না করে ক্লিনিক নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণের অভিযোগ এনে একদল গ্রামবাসী সেদিন মান্নানের বাড়িতে গিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটায়। ওই দিন তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল আলমও শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলেন। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে উত্তেজনা ছিল অন্তত এক মাস। এর পর থেকে সাবেক সচিব ও সংসদ সদস্যের মধ্যে সম্পর্কের আর উন্নতি হয়নি। 

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোহাম্মদ নূরে আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন তিনি। তিনি বলেন, পরিস্থিতি যেন আর সামান্যতম ঘোলাটে না হয়, সেই চেষ্টায় পুলিশ প্রশাসনের এতটুকু ত্রুটি নেই। এরপরও যেন উত্তেজনা কমছে না। সম্প্রতি দুই পক্ষের করা দুটি মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে জানালেন কটিয়াদী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহফুজুর রহমান।