গ্রামের আখড়ায় চলছে নাচগান। বৃহস্পতিবার রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের দেওপুরায়
গ্রামের আখড়ায় চলছে নাচগান। বৃহস্পতিবার রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের দেওপুরায়

ঝুম বৃষ্টিতে ভুঁইয়াদের করমা উৎসব

সন্ধ্যায় গ্রামের আখড়ায় করমা বা কারামগাছের ডাল পুঁতে পূজা দেওয়ার পরই আগের দিন ভোর থেকে না খাওয়া গ্রামের কুমারী মেয়েরা উপোস ভাঙতে পারে। এটাই করমা পূজা বা ডাল পূজার ধর্মীয় রীতি। কিন্তু সন্ধ্যার আগে থেকেই ঝুম বৃষ্টি। সঙ্গে ছিল আকাশের গর্জন। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত ১১টা বাজার পরও যখন বৃষ্টি থামল না, তখন বৃষ্টি মাথায় নিয়েই নেমে পড়ল উপোস থাকা কিশোরীরা। সঙ্গে গ্রামের নারীরা। বসে থাকতে পারলেন না পূজারি ও গ্রামের মোড়লও।

আখড়ার ওপর ছিল কাপড়ের শামিয়ানা। কিন্তু তাতে বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষা হচ্ছিল না। ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই শুরু হয়ে গেল ভুঁইয়াদের করমা পূজা বা ডাল পূজা, যাকে করমা উৎসবও বলা হয়ে থাকে।

গ্রামের আখড়ায় চলছে পূজা

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভুঁইয়াদের গ্রাম চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার পার্বতীপুর ইউনিয়নের দেওপুরায় গিয়ে দেখা যায় এমন দৃশ্য। এবার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভুঁইয়াদের করমা উৎসবের বিশেষত্ব ছিল ১৫টি গ্রামের ভুঁইয়ারা মিলে আয়োজন করেছে করমা উৎসবের। বৃষ্টির মধ্যে গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা অতিথিরা। এবার বিশেষভাবে আয়োজিত উৎসবে গ্রামের যুবকদের নেতৃত্ব দেন মানিক রাই।

মানিক রাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওরাওঁদের কারামেল উৎসব থেকে ভুঁইয়াদের করমা একটু আলাদা। ওরাওঁদের আখড়ায় পুঁতে রাখা কারামগাছের ডালের সামনে থাকে চাঙারিতে রাখা মাটি ও বালুর মিশ্রণে বপন করা বীজ থেকে গজানো চারা। কিন্তু ভুঁইয়াদের চারার সঙ্গে থাকে পূজারির নিজ হাতে মাটি দিয়ে বানানো হাতি ও ঘোড়া। অর্থাৎ আমরা বৃক্ষের সঙ্গে জীবজন্তুও রক্ষার প্রার্থনা নিয়েও করমা পালন করে থাকি।’
ভুঁইয়ারা জানান, এবার চাঙারিতে বপন করা বীজের মধ্যে ছিল মাষকলাই, যব, গম, ছোলা, ধান, অড়হড়, শসা ও তিল। এদের বলা হয় সাতভাই এক বোন। এখানে তিল হচ্ছে বোন। বোন কে হবে ধরাবাঁধা নেই। কখনো ধানও বোন হতে পারে।

বীজ বপনের পর প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় দুটি চাঙারি আখড়ায় নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে চাঙারি ঘিরে নাচ-গান চলত। বলা হয়ে থাকে করমার গীত শুনে শুনে বীজ থেকে চারাগুলো দ্রুতই বেড়ে ওঠে।

পূজার নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে মেয়েরা আখড়ায় পুঁতে রাখা গাছের ডালে শাপলা ফুলের মালা পরায়। পাতায় গেঁথে দেয় তালের রুটি। কিশোরীর উপোস ভেঙে গ্রামের নারী-পুরুষের সঙ্গে করমা ডালকে ঘিরে মাদলের তালে তালে শুরু করে নাচগান। চলে ভোর পর্যন্ত বিরতিহীন।

আখড়া থেকে কারামগাছের ডাল তুলে বিসর্জনে নিয়ে যাওয়ার আগে শেষ নাচগান। শুক্রবার সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের দেওপুরায়

নাচগানে অংশ নিতে দেখা যায় নওগাঁর সাপাহার উপজেলার খরিয়াপাড়ার কিশোরী মৌমিতা রায়কে (১৫)। সে বলল, ‘আমি জীবনে এমন উৎসব দেখিনি। আমাদের গ্রামে এটা হয় না। তাই দিদার সঙ্গে আত্মীয়ের বাড়িতে এসেছি বেড়াতে। আসাটা সার্থক হয়েছে। অনেক আনন্দ করলাম।’

কথা হয় গৃহবধূ সোহাগী রাইয়ের সঙ্গে। এবার করমা জাঁকজমকপূর্ণ হবে বলে এসেছেন বাবার বাড়ি। তাঁর শ্বশুরবাড়ি নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার নিতিনপুরে। সেখানেও করমা হয়। তবে জাঁকজমকপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, ‘বাপের বাড়ি এসেছি শুধু মনভরে নাচগান করতেই। বৃষ্টির কারণে সন্ধ্যা থেকে নাচতে পারিনি। তবে রাত ১১টা থেকে ভোর পর্যন্ত নাচলাম।’

সোহাগী মাদলও বাজাতে পারেন। নেচে নেচে মাদল বাজালেন অনেকক্ষণ। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘বাপের মাদল বাজানো দেখে দেখে শিখেছি। কেউ আমাকে শেখায়নি। হামার বাপ হোইলো গাঁয়ের পূজারি ধিরেণ রাই।’ আয়োজনে দেখা যায়, একবার বাবা আর একবার মেয়ের হাতেই বাজছে মাদল।

শুক্রবার সকাল আটটার দিকে আখড়া থেকে করমার ডাল তুলে মাদলের তালে তালে নেচে গ্রামে পুকুরে বিসর্জন দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন গ্রাম থেকে চাল-ডাল ও তরকারি জোগাড় করে আয়োজন করা হয় খিচুড়ির।

গ্রামের প্রতিটি বাড়ির মাটির দেয়াল ছিল লেপাপোঁছা। লাল মাটি দিয়ে আংশিক রাঙানো। উৎসবের রঙে রেঙেছিল গ্রামবাসীর মনও।