
সুনামগঞ্জে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলেও তেমন বৃষ্টি হয়নি। গতকাল বুধবার রাত থেকে আজ বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত জেলাটিতে ভারী বৃষ্টি না হলেও ঢলের পানিতে নদী ও হাওরে পানি বাড়ছে। টানা চার দিন রোদ না থাকায় কাটা ধান নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাওরের লাখো কৃষক। অনেক স্থানে পানি বেশি থাকায় ধান কাটা যাচ্ছে না, আবার কাটা ধানও শুকাতে না পেরে নষ্ট হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, গতকাল সকাল নয়টা থেকে আজ সকাল নয়টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় বৃষ্টি হয়েছে ৮ মিলিমিটার। এ সময়ে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে ১৮ সেন্টিমিটার। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ২২ মিলিমিটার বৃষ্টিতে নদীর পানি বেড়েছিল ৫৬ সেন্টিমিটার। তবে গত সোমবার রাতের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলেই বড় ক্ষতি হয়েছে। সেদিন মৌসুমের সর্বোচ্চ ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়, এতে হাওরের বোরো ধান ব্যাপক হারে তলিয়ে যায়।
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, গত দুই দিনে বৃষ্টি কম থাকাটা কিছুটা স্বস্তির। তবে আজও অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। ভারতের চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরামে বৃষ্টির কারণেই মূলত উজানে ঢল নামছে।
পাউবো জানায়, ঢল অব্যাহত থাকায় সুরমা ছাড়াও কুশিয়ারা, নলজুর, পাটলাই, জাদুকাটা, খাসিয়ামারা, বৌলাইসহ জেলার প্রায় সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে। এসব নদীর পানি হাওরে ঢুকে জমির ধান তলিয়ে দিচ্ছে।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে হাওরে ধান কাটতে পারছেন না কৃষকেরা। ঠান্ডা ঢলের পানি ও প্রবল বাতাসে দীর্ঘ সময় পানিতে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। রোদ না থাকায় মাড়াই করা ধানও শুকাতে পারছেন না অনেকে। সদর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের কৃষক বশির মিয়ার (৪৫) দুই একর জমির ধান এখনো কাটা হয়নি। শ্রমিক না পাওয়ায় তিনি গতকাল ছেলেকে নিয়ে কোমরপানিতে নেমে ধান কাটেন। তিনি বলেন, ‘ইবারের লাখান ঠান্ডা ঢলের পানি আগে দেখছি না। হাত পাও টাখরি লাগাই দেয়। পানিত থাকা যায় না। এর সঙ্গে আছে বাতাস।’
কৃষি বিভাগের হিসাবে, এ পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাওরে ৯ হাজার ৫৭ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৪৭ হেক্টর। এর আগে জলাবদ্ধতায় ৩ হাজার ২০০ হেক্টর ক্ষতির কথা জানানো হয়েছিল। তবে হাওর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তরা এ হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের দাবি, বাস্তবে প্রায় অর্ধেক ধানই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের দেখার, কানলার, জোয়ালভাঙা; শান্তিগঞ্জ উপজেলার জামখলা, খাই, পাখিমারা, সাংহাই; দিরাই উপজেলার বরাম, চাপতির, কালিয়াকোটা; শাল্লা উপজেলার ছায়ার; জামালগঞ্জ উপজেলার হালির ও পাকনার; বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার, আঙ্গারুলি; জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার, মইয়ার; তাহিরপুর উপজেলার শনির, মাটিয়ান, সমসার; ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্রসোনার থাল, টগার, সোনামড়ল; মধ্যনগর উপজেলার এরন, শালদিঘা ও জিনারিয়াসহ প্রায় সব হাওরেই ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পানি বাড়তে থাকায় বাকি ফসল কাটা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
কৃষি বিভাগের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, এখনো হাওরের প্রায় অর্ধেক ধান জমিতে রয়েছে। এবার জেলায় ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত কাটা হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ২৮৫ হেক্টর। এর মধ্যে নিচু জমির প্রায় ৭০ শতাংশ এবং উঁচু জমির ১৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। গড়ে অগ্রগতি ৪৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ ফারুক আহাম্মেদ বলেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ধান কাটায় সমস্যা হচ্ছে। তিনি কৃষকদের পরামর্শ দেন, কাটা ধান খলায় না রেখে বাড়ি বা উঁচু স্থানে রাখতে হবে। শুকানোর আগে ধান বস্তাবন্দী না করে মেঝে, ভবনের ছাদ বা উঁচু সড়কে ছড়িয়ে রাখতে হবে, যাতে বাতাস লাগে। প্রয়োজনে বৈদ্যুতিক পাখা ব্যবহার করেও ধান শুকানোর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এতে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব।