
সাত একর জমির বাড়ি ছিল রাহাতুল ইসলামের (৩০)। বসতঘরের পাশেই ছিল ছয়টি পুকুর, কলাবাগান, সারি সারি নারকেল ও সুপারিগাছ। মাছ, কলা, নারকেল ও সুপারি বিক্রির টাকায় চলত তাঁর সাত সদস্যের পরিবারের খরচ। তবে সম্প্রতি তাঁর বসতঘর ও ভিটেমাটির পুরোটাই ভাঙনে বিলীন হয়েছে।
রাহাতুল ইসলাম চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ইউনিয়ন উড়িরচরের দক্ষিণের বাসিন্দা। এর অবস্থান সন্দ্বীপ উপজেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে। চলতি বছর ২ সেপ্টেম্বর তাঁর বাড়ির সীমানা ভাঙতে শুরু করে। এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর পুরো বাড়িই ভেঙে যায়। পরে অদূরে একটি ঘর তুলে থাকছে রাহাতুলের পরিবার।
২০১২ সাল থেকে ইউনিয়নের অন্তত দুই হাজার পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। শুধু গত চার মাসেই বসতভিটা হারিয়েছে ২১০ পরিবার।আবদুর রহিম, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, উড়িরচর ইউনিয়ন।
সম্প্রতি এলাকায় গিয়ে রাহাতুলের সঙ্গে কথা হয়। সাগরের তীরে ভাঙতে থাকা একটি রাস্তায় দাঁড়িয়ে রাহাতুল ইসলাম হাত উঁচিয়ে দেখিয়ে বলেন, ‘ওই যে ইট-বালু নিয়ে কয়েকটি বাল্কহেড যাচ্ছে, সেখানে আমার বাড়ি ছিল। এখন আর কিছুই নেই। কীভাবে কী করব, কী খাব, কিছুই বুঝছি না।’
একই ইউনিয়নের আবুল হোসেনের (৪৭) গল্পও এমন। চলতি বছর ১৯ আগস্ট ভাঙনের মুখে পড়ে তাঁর ৪৫ বছরের পুরোনো বাড়ি। তাঁর বাবা নুরুল হুদার হাতে গড়া সেই বাড়ির বসতঘরটি সরাতে পেরেছিলেন তিনি। কিন্তু পুকুরের মাছ তোলার সময় পাননি। পরে মাছসহ পুকুরটি সমুদ্রের জলরাশিতে মিশে গেছে।
আবুল হোসেন বলেন, ‘ভাঙনের কয়েক দিন আগেই টের পাইছিলাম। রাতে ঢেউয়ের শব্দে ঘুমাইতে পারতাম না। দেরি করলে ঘরটি সরানোর সুযোগও পাইতাম না। বাধ্য হয়ে ঘরটা সরাইয়া নিছি। কয়েক দিনের মইধ্যে ভাঙন সব কাড়ি নিছে। জাগা-জমি, অর্থ-সম্বল, মান ইজ্জত সব আছিল, এখন কিচ্ছু নাই, আঁর পরিবার নিঃস্ব।’
অবশ্য শুধু আবুল হোসেন ও রাহাতুল ইসলাম নন। স্থানীয় বাসিন্দাদের হিসাবে উড়িরচর ইউনিয়নের দক্ষিণ তীরে চলতি বছরের ১ জুন থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর চার মাসে ২১০টি পরিবার ভাঙনে বসতভিটা হারিয়েছে। তাদের কেউ ঘরের টিন, কাঠ ও বাঁশ খুলে অন্য জায়গায় সরিয়েছে। আবার কেউ ঠাঁই নিয়েছে স্বজনদের বাড়িতে। কেউ খালি জমিতে অস্থায়ী ঘর তুলে থাকছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নথি ও মানচিত্রেও উড়িরচরের ভূমি হারানোর হিসাব রয়েছে। ২০১২ সাল থেকে দক্ষিণ তীরে ভাঙনের তথ্যও সংরক্ষিত হয়েছে। পাউবো চট্টগ্রাম-২-এর তথ্যমতে, গত ১৪ বছরে ১৪ দশমিক ৭ বর্গকিলোমিটার ভূমি হারিয়েছে উড়িরচর।
চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্প (সিডিএসপি) দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণেও দক্ষিণ উড়িরচরে তীব্র ভাঙনের কথা উঠে এসেছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সন্দ্বীপ চ্যানেল ও সাগরের স্রোতের আঘাতে দক্ষিণ উপকূল ক্রমাগত বিলীন হচ্ছে। ফলে বহু পরিবার ভিটেমাটি ও সম্পদ হারাচ্ছে। তবে ঠিক কত পরিবার ঘর হারিয়েছে, কত পুকুর, মাছ, গাছ, খামার, চাষের জমি ও জীবিকার সম্পদ হারিয়েছে, এর পূর্ণাঙ্গ হিসাব কোনো সরকারি দপ্তরে নেই।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নথি ও মানচিত্রেও উড়িরচরের ভূমি হারানোর হিসাব রয়েছে। ২০১২ সাল থেকে দক্ষিণ তীরে ভাঙনের তথ্যও সংরক্ষিত হয়েছে। পাউবো চট্টগ্রাম-২-এর তথ্যমতে, গত ১৪ বছরে ১৪ দশমিক ৭ বর্গকিলোমিটার ভূমি হারিয়েছে উড়িরচর।
উড়িরচর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুর রহিম জানান, ২০১২ সাল থেকে তাঁর ইউনিয়নের অন্তত দুই হাজার পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। শুধু গত চার মাসেই বসতভিটা হারিয়েছে ২১০ পরিবার। তবে এসব পরিবারের নাম ও বর্তমান ঠিকানা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নথিভুক্ত করা হয়নি। অন্য কোনো সরকারি দপ্তর থেকে তিনি এ তথ্য পাননি। সব তাঁর নিজের দেখা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া হিসাব।
সন্দ্বীপের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জামিরুল ইসলাম বলেন, তাঁর দপ্তরেও উড়িরচরের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নেই। কত মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, তা তিনি জানেন না।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান বলেন, উড়িরচরের বাস্তুচ্যুত পরিবারের কোনো তালিকা তাঁর দপ্তরে পৌঁছায়নি। তবে উপজেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহীন পরিবারের নির্দিষ্ট তালিকা দিলে খাদ্য, ঢেউটিনসহ সহায়তা বিবেচনা করা হবে।
অবশ্য উড়িরচরে ভোগান্তির এখানে শেষ নয়। কয়েক বছরের ব্যবধানেই উড়িরচরের এক প্রান্ত ভেঙে অন্য প্রান্তের কিছু অংশে নতুন চর জেগে ওঠে। সাধারণত জেগে ওঠা চরে ভাঙনে ভূমি হারানো পরিবার জায়গা পাওয়ার কথা। কিন্তু উড়িরচরে সেটি হয় না। কারণ, যে অংশে চর জেগে ওঠে, এটি নোয়াখালী জেলার অন্তর্ভুক্ত। তাই চর জেগে ওঠার পরও উড়িরচরের বাসিন্দারা সেখানে বসতি করতে পারেন না।
জানতে চাইলে সন্দ্বীপের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন বলেন, উড়িরচরের একটি অংশ নোয়াখালী জেলায় অন্তর্ভুক্ত। আরেকটি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের। চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্পের (সিডিএসপি) মাধ্যমে উড়িরচরের নোয়াখালী অংশের কিছু ভূমি ওই অংশের বাসিন্দাদের দেওয়া হয়েছে। তবে সন্দ্বীপের অংশের ভূমির মালিকানার বিষয়ে এখনো অগ্রগতি নেই। এ বিষয়ে তাঁরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
‘উত্তর সন্দ্বীপে নবসৃষ্ট ভূমি উন্নয়ন ও দক্ষিণ উড়িরচরে ভাঙনের ফলে ভূমি হ্রাস রোধকরণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ৭৯৩ কোটি টাকার প্রকল্পটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। তবে এটি অনুমোদন পায়নি। সর্বশেষ গত বছর ২৪ জুলাইও পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা থেকে প্রকল্পটি ফেরত পাঠানো হয়।
উড়িরচরের ভাঙনরোধের প্রকল্প অনুমোদন না পাওয়ার বিষয়ে চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনের সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা প্রথম আলোকে বলেন, ‘উড়িরচরের ভাঙন ঠেকাতে পাউবোর প্রকল্প অনুমোদনের বিকল্প নেই। আমি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে কথা বলেছি, মন্ত্রণালয়ে গিয়েছি। প্রকল্পটি আবার উঠলে যাতে অনুমোদন পায়, সেই চেষ্টা করব।’
ভাঙনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর মানববন্ধন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উপজেলার কালাপানিয়া ইউনিয়নে এ মানববন্ধন হয়। এ সময় তাঁদের হাতে ছিল ‘আমার মাটি আমার মা, বিলীন হতে দেব না’ ইত্যাদি লেখাসংবলিত প্ল্যাকার্ড। ১৬ সেপ্টেম্বর মানববন্ধনে থাকা তাঁদের একটি প্রতিনিধিদল পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির সঙ্গে দেখা করে। এরপর তাঁরা তীর রক্ষার দাবিতে আবেদনপত্র দেন।
তবে সরকারি কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় সম্প্রতি নিজেরাই টাকা তুলে ভাঙন ঠেকানোর উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ইতিমধ্যে তাঁরা ৫০ লাখ টাকার প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন। জানতে চাইলে কর্মসূচিতে থাকা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী নুর নবী রবিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনো উপায় না পেয়ে আমরা নিজেরাই ভাঙন ঠেকাতে টাকা সংগ্রহ করছি। কেউ ধান বিক্রি করে, কেউ মাছ বিক্রি করে টাকা দিচ্ছেন। তবে এ টাকা দিয়ে হয়তো তেমন কিছু হবে না। এরপরও স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাব।’
জানতে চাইলে পাউবোর চট্টগ্রাম-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী তানজির সাইফ আহমেদ বলেন, ‘ভাঙন ঠেকাতে এর আগে প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে অনুমোদন হয়নি। আমরা সাম্প্রতিক ভাঙনের তথ্য যুক্ত করে আবার একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করছি। প্রস্তাবটি দ্রুত জমা দেব।’
উপকূলীয় দুর্যোগ সুরক্ষা বিষয়ে আইডব্লিউএমের প্রধান উপদেষ্টা ও উপকূল এবং নদী ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ জহিরুল হক খান প্রথম আলোকে বলেন, দক্ষিণ উড়িরচরের ভাঙনপ্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ জনবসতি রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি উপকূলীয় বাঁধ ও বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের প্রয়োজন।
পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের দায় সরকার নিচ্ছে না। চরাঞ্চলে ভাঙা-গড়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। উপকূলীয় চরাঞ্চলের জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনে রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। তাঁদের অধিকারের আইনি ভিত্তি ও পুনর্বাসনের কৌশল নির্ধারণ করা উচিত।