ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে এক সপ্তাহ অজ্ঞান থেকে মারা যান অটোরিকশা চালক আয়ুব আলী
ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে এক সপ্তাহ অজ্ঞান থেকে মারা যান অটোরিকশা চালক আয়ুব আলী

‘এক সপ্তাহ অচেতন হয়ে পড়ে রইলেন, আমাদের ডাকে আর ফিরলেন না বাবা’

বাবার জন্য গত এক সপ্তাহ আমরা অপেক্ষা করেছি। আল্লাহকে ডেকেছি। কিন্তু জ্ঞান ফিরল না তাঁর। আমাদের ডাকে সাড়া দিলেন না। অজ্ঞান অবস্থায় আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এখন আমরা কী করব? কেন মানুষটিকে এভাবে মরতে হলো। আমরা এর বিচার চাই।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) মর্গের সামনের দাঁড়িয়ে বাবার লাশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন অটোরিকশাচালক আইয়ুব আলীর ১৯ বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ শাহেদ। আজ সকালে বাবার অবস্থা জানাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে কথাগুলো বলেন তিনি। মুঠোফোনে মোহাম্মদ শাহেদ বলেন, ‘বাবার লাশের অপেক্ষায় আছি। আমাদের ডাকে আর ফিরলেন না তিনি।’

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের কৈখাইন এলাকার অটোরিকশাচালক আইয়ুব আলী (৫৫) ২০ এপ্রিল সোমবার সকাল ৯টার দিকে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। ছিনতাইকারীরা তাঁর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে অজ্ঞান করে ফেলে রেখে যান আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে। স্থানীয় লোকজন তাঁকে অচেতন অবস্থায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান। সেখান থেকে সেদিন দুপুর ১২টায় তাঁকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যান স্বজনেরা। ওই হাসপাতালে গত এক সপ্তাহেও তাঁর জ্ঞান ফেরেনি। নেওয়া হয়েছিল আইসিইউতেও। গতকাল সোমবার সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় আইয়ুবের।

আইয়ুব আলীর লাশ ময়নাতদন্তের জন্য এখন চমেক হাসপাতালে আছে। সেখানে মর্গের সামনে আজ সকাল থেকে অপেক্ষা করছিলেন স্বজনেরা। পুলিশ লাশ বুঝিয়ে দিলে আনোয়ারার গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাবেন বলে জানালেন তাঁরা।

মোহাম্মদ শাহেদের সঙ্গে হাসপাতালে এসেছিলেন তাঁর মা নুর নাহার। তিনি জানান, সোমবার সকালে সুস্থ হাসিখুশি মানুষটি রিকশা নিয়ে বের হন। এরপর দুপুরে তাঁরা খবর পান তিনি হাসপাতালে। তাঁদের ধারণা যাত্রীবেশী ছিনতাইকারীরা কিছু খাইয়ে বা মলম লাগিয়ে তাঁকে অজ্ঞান করে অটোরিকশাটি নিয়ে যায়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে পুলিশ ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করতে পারলে রহস্য উদ্‌ঘাটন হবে।

এদিকে আইয়ুব আলী সোমবার সকালে মারা গেলেও পরিবারের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে ময়নাতদন্তে সময়ক্ষেপণ হয়। পরে রাতেই পুলিশ ময়নাতদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়। আজ বেলা ১১টার সময় ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া চলছিল বলে জানান আইয়ুবের ছোট ছেলে মোহাম্মদ শাহেদ।

নিহত আইয়ুব আলী তিন মেয়ে ও দুই ছেলের জনক। গত ১৫ বছর ধরে তিনি কখনো সিএনজিচালিত অটোরিকশা কখনো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে সংসার খরচ মিটিয়ে আসছিলেন। এসব করে তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। সবার বড় ছেলে নাজিম উদ্দীন রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তিনিও পরিবারকে সহায়তা করেন। সব মিলিয়ে আর্থিকভাবে সচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছিলেন তাঁরা। ঠিক এই সময়ে আইয়ুব আলীর মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না স্বজনেরা।

নিহত আইয়ুব আলীর স্ত্রী নুর নাহার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সকালে হাসিখুশি লোকটা ঘর থেকে বের হলেন। এক সপ্তাহ হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও তাঁর জ্ঞান ফেরেনি। তাঁর সঙ্গে শেষ কথাটুকুও হলো না। চলে গেলেন দুনিয়া থেকে।’

নুর নাহার আরও বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে গাড়ি চালিয়ে তিনটি মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন আমার স্বামী। দুই ছেলেকে নিয়ে সংসারে সুখের মুখ দেখছিলাম আমরা। তার আগেই মানুষটি চলে গেল। জানি না আমাদের কী হবে।’

আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী বলেন, ‘চমেক হাসপাতালে আইয়ুব আলীর ময়নাতদন্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি।’