
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘সারা বাংলাদেশে স্রোত তৈরি হয়েছে ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে, পরিবর্তনের পক্ষে, বস্তাপচা রাজনীতির বিপক্ষে, দুর্নীতির বিপক্ষে, ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে, জুলুমতন্ত্রের বিপক্ষে, মা–বোনদের বেইজ্জত করার বিপক্ষে আর ইজ্জত দেওয়ার পক্ষে। কিছু মানুষের এ অবস্থা দেখে মাথা গরম হয়ে গেছে।’
আজ মঙ্গলবার দুপুরে সাতক্ষীরা সরকারি বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন। পরে তিনি সাতক্ষীরার চারটি আসনে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের যুবকেরা রায় দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, আমরা ইনসাফের সঙ্গে আছি। সংস্কার যারা মনে–প্রাণে চাইবে, আমরা তাদের সঙ্গে আছি। আজ যুবকেরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে পুরোনো ও নতুন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। অলরেডি পাঁচ–পাঁচটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা জানিয়ে দিয়েছে।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমরাও মায়ের পেট থেকে দুনিয়ায় এসেছি। তারা আমাদের মায়ের ইজ্জতের ওপর হাত দিয়েছে। আমরা তাদের অনুরোধ করি, তোমরা তোমাদের মায়েদের সম্মান করতে শেখো। যারা নিজের মাকে সম্মান করতে পারে, তারা গোটা জাতি, বিশেষ করে মায়ের জাতিকে সম্মান করতে পারে। যারা নিজের মাকে সম্মান করে না, তারা অন্য মাকে সম্মান জানাতে পারে না। মনে রাখবে, আমাদের জীবনের চেয়ে আমাদের মায়েদের ইজ্জতের মূল্য অনেক বেশি। সুতরাং কোথাও আমাদের মায়েদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করলে আমরা কাউকে ছেড়ে দিয়ে কথা বলব না।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হবে। একটি হচ্ছে সংস্কারের পক্ষে “হ্যাঁ” ভোট। দ্বিতীয়টি হচ্ছে পরিবর্তনের বাংলাদেশের পক্ষের ভোট। “হ্যাঁ” মানে আজাদি, “না” মানে গোলামি। তার মানে হলো, ভোটের বুথে ঢুকে প্রথমে শক্ত করে “হ্যাঁ” ভোট দিতে হবে। “হ্যাঁ” জিতে গেলে বাংলাদেশ জিতবে। “হ্যাঁ জিতে গেলে ফ্যাসিবাদ আর ফিরে আসবে না। “হ্যাঁ” জিতে গেলে দুর্নীতিবাজ আর চাঁদাবাজের কবর রচিত হবে। আর “হ্যাঁ” হেরে গেলে বাংলাদেশ হেরে যাবে। আর ২ নম্বর ভোট দাঁড়িপাল্লা হচ্ছে ইনসাফের ভোট।’
আজকের যুবসমাজ আর বস্তাপচা রাজনীতি দেখতে চায় না মন্তব্য করে জামায়াতের আমির বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমরা উত্তম আচরণ করব। তাদের কাছ থেকে উত্তম আচরণ আশা করি। অন্য কোনো রাষ্ট্রকে প্রভু হিসেবে আসতে দেওয়া হবে না।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘সাতক্ষীরাকে সাড়ে ১৫ বছর সৎমায়ের সন্তানের মতো রাখা হয়েছে। আপনারা যদি সাতক্ষীরার চারটা আসন আমাদের উপহার দেন, তবে মদিনার শাসনের আদলে একটি সুশাসন কায়েম করার জন্য আমরা চেষ্টা করব। আল্লাহ যদি সুযোগ দেন, তবে কোনো শিক্ষিত চোর আপনাদের সম্পদ খেয়ে ফেলতে পারবে না, খেয়ে ফেলতে দেওয়া হবে না।’
জামায়াতের আমির আরও বলেন, ‘এই দুঃখী বাংলাদেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে যারা ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে, আল্লাহ আমাদের সুযোগ দিলে ওদের পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে জনগণের সম্পদ বের করে আনব, ইনশা আল্লাহ। যা পারি, যতটুকু পারি, এ ব্যাপারে কোনো ক্ষমা নেই। জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনকারীর ব্যাপারে আমাদের কোনো দয়া নেই, ক্ষমা নেই। এখানে আমরা কঠোর।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘যেদিন এই সরকার শপথ নেবে, এখন থেকে কেউ আর কালোটাকার দিকে হাত বাড়াতে পারবা না। আমরা সম্মানের সঙ্গে সব পেশার সব শ্রেণির রাষ্ট্রের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বাঁচার পরিবেশ তৈরি করে দেব। যাঁরা ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের স্যালারি হবে সম্পূর্ণ আলাদা। যিনি ৯টা–৫টা নিরাপত্তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, আর যিনি ২৪ ঘণ্টা দুই চোখ খোলা রেখে চাকরি করেন, তাঁদের বেতন এক হওয়া চরম বেইনসাফি। আমরা ইনসাফভিত্তিক বেতনকাঠামো করব, ইনশা আল্লাহ।’
জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি আজিজুর রহমানের সঞ্চালনায় জনসভায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সাতক্ষীরা–১ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ ইজ্জতউল্লাহ, সাতক্ষীরা–২ আসনের প্রার্থী মুহাদ্দিস আবদুল খালেক, সাতক্ষীরা–৩ আসনের প্রার্থী মুহা. রবিউল বাশার ও সাতক্ষীরা–৪ আসনের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ছাড়া ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নেতারা বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন।
যশোর ও সাতক্ষীরায় জনসভায় যোগদানের পর বিকেলে খুলনায় ঐতিহাসিক সার্কিট হাউস মাঠে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। খুলনার ছয়টি আসনের ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীদের হাতে প্রতীক তুলে দিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি।
জনসভায় বিএনপিকে ইঙ্গিত করে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের একটি বন্ধু সংগঠন ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেছে, এটা মায়েদের হাতে দেবেন। তাঁরা এক দিকে দিচ্ছেন ফ্যামিলি কার্ড, আরেক দিকে আমার মায়ের গায়ে হাত দিচ্ছেন। এ দুটি একসঙ্গে চলে না। দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে—এ দেশের মানুষ, মাটি ও সম্পদ, ইজ্জত কার কাছে নিরাপদ। সেটা এখন আর কারও কাছে বুঝতে বাকি নেই।’
তরুণদের উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, ‘তোমরা বুক চিতিয়ে লড়াই করে মুক্তি এনে দিয়েছ—তোমাদের মোবারকবাদ। আমরা তোমাদের হাতে বেকারের ভাতা তুলে দিয়ে অপমান করতে চাই না। আমরা তোমাদের প্রত্যেকটি হাতকে কর্মী ও কারিগরের হাতে পরিণত করতে চাই। তোমাদের সম্মানিত করতে চাই। জুলাই বিপ্লবে তোমাদের যে অবদান, কিছুটা হলেও তার ঋণ শোধ করতে চাই।’
খুলনার শিল্প ও কৃষি নিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘খুলনা অঞ্চলে একসময় কৃষি ও ইন্ডাস্ট্রি সমানতালে পাল্লা দিত। দুটিই এখন শেষ। জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে, লবণাক্ত পানির কবলে পড়ে, দফায় দফায় বাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি ঢোকার কারণে আজ এখানকার কৃষকদের বিধ্বস্ত অবস্থা। শিল্পের কথা তো আগেই বলেছি। আল্লাহ যদি এই দেশকে খেদমতের দায়িত্ব আমাদের দেন, আমরা কথা দিচ্ছি—আপনাদের সঙ্গে বসে, আপনাদের সঙ্গে ডায়ালগ করে কোন কোন কাজ আগে করলে এ দেশের উন্নয়ন হবে, তা আমরা ঠিক করব। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আপনাদের সম্পদ আপনাদের হাতে তুলে দেব। এটা আমাদের বাপ–দাদার সম্পদ হবে না, সম্পদ হবে জনগণের। প্রতিটি সম্পদের বাজেটের জবাব নেওয়ার অধিকার আপনাদের নিশ্চিত করা হবে।’
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও হানাহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, ‘আজ বিভিন্ন জায়গায় হামলা শুরু হয়ে গেছে। মাথা গরম হয়ে গেছে। এখন মাঘ মাস, এখন মাথা গরম হলে চৈত্র মাসে কী করবেন? এখন আরামদায়ক বাতাস আছে, আবহাওয়া আছে—এখন মাথা গরম কইরেন না। জনগণের রায়ের প্রতি আস্থা রাখুন। অতীতে জনগণের রায়কে যারা সম্মান করেনি, তাদের পরিণতি কী হয়েছে, তা থেকে আমাদের সবার শিক্ষা নেওয়া উচিত।’