গাছের ডালে ডালে ফুটেছে হলুদ শিমুল। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আজমেরুতে
গাছের ডালে ডালে ফুটেছে হলুদ শিমুল। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আজমেরুতে

মৌলভীবাজারের বার্ড পার্কে নতুন অতিথি ‘হলুদ শিমুল’

গ্রামীণ পাকা সড়কের দুপাশে গা এলিয়ে শুয়ে আছে সবুজ ধানের খেত। ধানখেতে আনমনে ফাল্গুনের বিভোর বাতাস বইছে। বোরো ধানের কচি পাতাগুলো হেলেদুলে নাচছে। খোলা মাঠ পেরিয়ে সেই হাওয়া গিয়ে আছড়ে পড়ছে পথের পাশের গাছগাছালিতে। গাছ থেকে দু–একটি করে শুকনা পাতা ঝরে পড়ছে। পাতাশূন্য গাছের ডালে ডালে হালকা শিষ ফুটছে। এ রকমই বসন্তের একটি বিকেল। এই বিকেলে পথের অনেকটা দূর থেকেই চোখে পড়ে একটি গাছে উজ্জ্বল হলুদ রঙের ফুল ফুটে আছে। অন্য গাছের ভিড়ে হলুদ রঙের ফুলের জন্য গাছটি আলাদা হয়ে আছে। যত কাছে যাওয়া যায়—ফুলটি আরও উজ্জ্বল, আরও মুগ্ধতা ছড়াতে থাকে।

এটি ‘হলুদ শিমুল’। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের আজমেরু গ্রামে বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজে এই বিরল ফুলের দেখা মিলেছে। বার্ড পার্কের মসজিদ প্রাঙ্গণে আরও অনেক ধরনের ফুলের গাছের ভিড়ে সবার চেয়ে আলাদা হয়ে ফুটে আছে বিরল, দুষ্প্রাপ্য হলুদ শিমুলের ফুলেরা। সাধারণত এই অঞ্চলে লাল এবং লাল-হলুদ মেশা কিছু শিমুলের দেখা মেলে। মাঝেমধ্যে কোথাও সাদা হলুদের দু–একটা গাছের দেখা পাওয়া যায়। হলুদ শিমুল একদমই চোখে পড়ে না।

হলুদ শিমুল যে এই অঞ্চলে বিরল, তা বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তরুণ উদ্যোক্তা জাহেদ আহমেদ চৌধুরীর কথাতেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সম্প্রতি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হলুদ শিমুলের একটি ছবি দিয়ে লিখেছেন, ‘দুষ্প্রাপ্য হলুদ শিমুল। আমি কখনো দেখিনি। দুই বছর আগে সাদা, লাল ও হলুদ শিমুল লাগিয়েছিলাম। আজকেই (২৫ ফেব্রুয়ারি) প্রথম হলুদ শিমুল ফুটেছে। অনেক সুন্দর। এককথায় অসাধারণ।’

মৌলভীবাজার-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের সদর উপজেলার মোকামবাজার এলাকা থেকে পশ্চিমে গ্রামের ভেতর দিয়ে মোকামবাজার-অফিসের বাজার সড়কটি আজমেরুর দিকে চলে গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে এই সড়ক দিয়ে বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের কাছাকাছি যেতেই পথ থেকে হলুদ শিমুলের গাছটি চোখে পড়ে। বসন্তবিকেলের রোদে হলুদ রঙের ফুল আরও উজ্জ্বল লাগছিল, হয়ে উঠেছিল আরও নজরকাড়া। বার্ড পার্কের মসজিদের কাছে আরও অনেক ধরনের ফুলের গাছ। সেখানে চন্দ্রপ্রভা, কয়েক রঙের বাগানবিলাসসহ আরও কিছু ফুল ফুটেছে। তবে সবাইকে ছাপিয়ে গেছে এই হলুদ শিমুল।

ডালে ঝুলে আছে হলুদ শিমুল

পাতাঝরা গাছের ডালে ডালে অসংখ্য ফুল ফুটেছে। ডালের কোথাও একটি, কোথাও দু-তিনটি করে ফুল ঝুলছে। কোনো ডালে একসঙ্গে অনেকগুলো ফুল ফুটেছে। ডালে ডালে ফোটার অপেক্ষায় আছে অনেকগুলো সবুজ কলি, আধফোটা কলি। এই কলিরাও যেকোনো সময় চোখ খুলবে, হেসে উঠবে। এই অঞ্চলে পথের পাশে, নদীর পাড়ে—বিভিন্ন বাড়িতে লাল শিমুলের দেখা পাওয়া যায়। বসন্তকালে প্রকৃতির ভেতর লাল রঙের আগুন ছড়িয়ে থাকে লাল শিমুল। কিন্তু হলুদ শিমুল এই অঞ্চলে একদমই চোখে পড়ে না। হলুদ শিমুল একটি দুষ্প্রাপ্য, বিরল প্রজাতির ফুল। এটি উজ্জ্বল হলুদ রঙের ফুল। ফুল দেখতে লাল শিমুলের মতোই। শীতের শেষে বা ফাল্গুন-চৈত্র মাসে এই ফুল ফুটে থাকে। ফুল ফোটার আগে লাল শিমুলের মতো হলুদ শিমুলগাছের পাতাও ঝরে যায়।

উদ্যোক্তা জাহেদ আহমেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, হলুদ শিমুল ছাড়াও বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজে সাদা ও লাল শিমুলের গাছও আছে। সেই গাছগুলোতেও এবার ফুল ফুটেছে। পার্কের ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, সাদা শিমুলগাছে অনেকগুলো ফুল ফুটেছে। তবে গাছটি প্রচলিত লাল শিমুলের থেকে আলাদা, ফুলের আকারও আলাদা। সাদা শিমুলগাছে সবুজ পাতা রয়েছে। অন্য শিমুলের মতো ডাল পাতাশূন্য নয়। এই উদ্ভিদের গা ও ডালপালার রং সবুজ। সাদা শিমুল ফুলও অন্য শিমুলের চেয়ে অনেক ছোট। গাছের বিভিন্ন ডালে থোকা থোকা সাদা ফুল ফুটে আছে। এই ফুলও অনেকটাই বিরল। সাধারণত চোখে পড়ে না। বার্ড পার্কে বেশকিছু সাদা শিমুলগাছ দেখা গেছে।

ফোটার অপেক্ষায় হলুদ শিমুলের কুঁড়ি

মৌলভীবাজার শহরের গির্জাপাড়া এলাকার একটি সড়কের পাশে এ রকম একটি সাদা শিমুলগাছ আছে। আপন মনে ফুল ফুটে, ফল ধরে—একসময় ফল ফেটে সাদা তুলা উড়ে যায়।

সাদা শিমুল মূলত দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার গাছ। আফ্রিকা ও এশিয়াতেও দেখা পাওয়া যায়। এ ছাড়া বার্ড পার্কে লাল শিমুলেরও অনেক গাছ আছে। একটি গাছে লাল শিমুল ফুটতে শুরু করেছে। কয়েকটি ফুল এরই মধ্যে ফুটেছে। এ ছাড়া বার্ড পার্কে একটি গোলাপি কাঞ্চনগাছ লাল হয়ে গেছে ফুলে। ডালজুড়ে শুধু ফুল আর ফুল। গাছের কোথাও একটুও ফাঁক নেই, শুধু ফুলে ছাওয়া। এ ফুল সাধারণত শীতের শেষের দিকে বা বসন্তাকলে ফোটে। যে কাউকে মুগ্ধ করার মতো একসঙ্গে অনেক ফুল ফোটে গাছে।

বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উদ্যোক্তা জাহেদ আহমেদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, তিনি বছর দু-আড়াই বছর আগে হলুদ শিমুলগাছটি এনে লাগিয়েছিলেন। গাছটি লাগানোর সময়েই বেশ বড় ছিল। এবারই প্রথম গাছে ফুল এসেছে। এর সঙ্গে সাদা শিমুল, লাল শিমুলসহ আরও অনেক ধরনের ফুলের গাছ লাগিয়েছেন। ধীরে ধীরে বিভিন্ন গাছে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। বার্ড পার্কে দুর্লভ ও বিরল আরও ফুলের গাছ লাগানোর ইচ্ছা আছে তাঁর।