ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের জন্য সুপারভাইজারের কাজ ছাত্রদল ও যুবদল করবে বলে রাজশাহী জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক গত রোববার ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। এ ছাড়া ছাত্রদলের সাবেক এক নেতা গত শনিবার তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ঢুকে সুপারভাইজার নিয়োগে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে বাঘা ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে সুপারভাইজার নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল বাতিলের দাবিতে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা গত শনিবার বিক্ষোভ করেন। পরে ওই পরীক্ষার ফলাফল স্থগিত করা হয় ও আবেদনের মেয়াদ ২৮ জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের জন্য সাতজন করে সুপারভাইজার নিয়োগ দেওয়া হবে। এ জন্য পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। গত শনিবার সারা দেশে এই নিয়োগ পরীক্ষা হয়। তানোর উপজেলায় পরীক্ষা শুরুর আগেই রাজশাহী জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম সংগঠনের ছয়-সাতজন নেতা-কর্মী নিয়ে ইউএনওর কার্যালয়ে ঢোকেন। সেখানে ইউএনওর উদ্দেশে এই নেতা বলেন, ‘আপনি যদি মেধার মূল্যায়ন করেন, তাহলে আমাদের ছেলেপেলে হবে না, মহোদয়। উপজেলা ছাত্রদলকে কিছু দেন আপনারা, তারপর কী করবেন করেন। এটা আমাদের অনুরোধ, এটা আমাদের প্রেস্টিজ ইস্যু। আমার ছাত্রদলকে আপনি মূল্যায়ন করবেন।’ এরপর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখনো ফল প্রকাশ করা হয়নি।
ছাত্রদল নেতাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তানোরের ইউএনও নাইমা খান গত সোমবার বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, মূল্যায়ন হবে আইনানুগ। যে যা-ই বলুক। অনেকেই আসছেন। তবে মূল্যায়ন নিয়ম অনুযায়ীই হবে।
কেন ছাত্রদল নেতাদের মূল্যায়নের দাবি করেছেন, জানতে চাইলে শহিদুল ইসলাম উল্টো প্রতিবেদককে প্রশ্ন করেন, ‘এটা কি খারাপ কথা বলেছি ভাই?’ তারপর তিনি বলেন, ‘আমি মহোদয়কে বলেছি-মহোদয়, আমরা ১৭ বছর এই ফ্যাসিষ্ট তাড়ানোর আন্দোলনেই ছিলাম। তা আমাদের মূল্যায়ন করা হোক। আমরা ঘরে ঘরে যেয়ে এ ফ্যামিলি কার্ডের প্রস্তাব দিয়েছি যে আপনারা আমাদের ভোট দেন, আমরা ফ্যামিলি কার্ড করে দেব। এটা তো আর নেতারা আইসে করে দেবে না, জনগণ আমাদের ধরবে।’
আপনাদের কর্মীদের মাধ্যমে সুপারভাইজারের কাজটা করাতে হবে-এটা বলতে চাচ্ছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, আমাদের কর্মীদের মাধ্যমে না। আমি বললাম যে আমাদের সাতটা ইউনিয়ন, দুইটা পৌরসভা। আপনি ছাত্রদলের কিছুটা মূল্যায়ন করুন, তারপর আপনি যেভাবে দেবেন-দেন। আমাদের ছাত্রদলের দুই-পাঁচটা ছেলে তো মেধাবী আছেই।’
ইউএনও কি আপনার কথা শুনল-জানতে চাইলে এই নেতা বলেন, ‘আমাদের বলেছে, আপনারা পরীক্ষা দেন, আপনাদের ছেলেপেলেদের পরীক্ষা দেওয়ান। দেখা যাবে পরে।’
শহিদুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ভাই, আপনি বিষয়টা দেখবেন। আমরা জীবনে কিছুই পেলাম না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই প্রকল্পে যদি আমার ছাত্রদলের নেতারা সুযোগ না পায়, জামায়াত-আওয়ামী লীগ মাঠপর্যায়ে কাজ করছে দেখি, আমাদের ইজ্জত থাকবে ভাই? বলেন। আমি এ কথা ইউএনওকে বলেছি যে আমরা পলিটিকস করি, আমাদের ইজ্জতটা রাখেন। এখন আমার বাড়ির কাছে এক আওয়ামী লীগের লোক ধরে নেন লিস্ট করছে, তালিকা করছে, তথ্য নিচ্ছে। তখন আমার এলাকার লোক কী বলবে-এই, তুই বড় নেতা, দেখ আওয়ামী লীগই আবার লিস্ট করছে! তাহলে ইজ্জত থাকে ভাই?’
তানোর-গোদাগাড়ী আসনে সংসদ সদস্য হয়েছেন জামায়াত থেকে। এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হ্যাঁ, জামায়াত হোক...জামায়াত হোক। এমনও হতে পারে জামায়াতের ছেলেপেলেকে চান্স পাইয়ে দেওয়ার জন্যে তিন দিন থাইকা ওদের নেতারা উপজেলা ছাড়েনি।’
এদিকে বাঘায় সুপারভাইজার নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার পর গত শনিবার ছাত্রদল ও স্থানীয় বিএনপির নেতারা বিক্ষোভ করেন। এ ব্যাপারে রাজশাহী জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক শামীম সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘শতাধিক পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। তার ভেতর থেকে ব্যবহারিক পরীক্ষায় ১৬ জন টিকেছেন। বাকিরা সার্ভারে ঢুকতেই পারেননি। তাঁরা এই পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, তাঁদের বিক্ষোভের কারণেই ইউএনওকে বদলি করা হয়েছে এবং পরীক্ষা স্থগিত করে ২৮ জুলাই পর্যন্ত আবেদনের সময় বাড়ানো হয়েছে।’
এই নেতা ফেসবুকে একটি পোস্টে লিখেছেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের জন্য তথ্য সংগ্রহের কাজ ছাত্রদল করবে। কারণ, ছাত্রদল ও যুবদলই ঘরে ঘরে গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।’ ফেসবুকের এই পোস্টের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দলের নেতাদের উদ্দেশে তিনি এই পোস্ট দিয়েছেন।
এই বিক্ষোভের কারণেই বাঘার ইউএনওকে বদলি করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বদলি একটি নিয়মিত ব্যাপার। ওদের বিক্ষোভের সঙ্গে বদলির কোনো সম্পর্ক নেই। এ ছাড়া সারা দেশে আবেদনের সময় বাড়ানো হয়েছে।’
রাজশাহী সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আবু তাহের বলেন, একটি বাড়ির তথ্য সংগ্রহের জন্য একজন তথ্য সংগ্রহকারী পাবেন ১৬৫ টাকা। তা থেকে ভ্যাট বাদ দেওয়ার পরে দাঁড়াবে ১৫০ টাকা। আর একজন সুপারভাইজার একটি বাড়ির তথ্য তদারকির জন্য পাবেন ৩০ টাকা করে।