
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘অতীতের কাসুন্দি শোনানোর দিন শেষ। জনগণ এসব আর শুনতে চায় না। জনগণকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে জনগণের কিসমত যারা লুট করেছে, তাদের জায়গা বাংলাদেশে আর হবে না। আমরা আমাদের প্রিয় জাতিকে টুকরা টুকরা করতে দিব না।’ আজ মঙ্গলবার কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী সরকারি কলেজ খেলার মাঠে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথাগুলো বলেন।
ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে শফিকুর রহমান কটিয়াদী আসেন। তিনি কটিয়াদী সরকারি কলেজ খেলার মাঠে মঞ্চে আসেন বেলা ১১টায়। সোয়া ১১টার দিকে তিনি বক্তব্য শুরু করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কিশোরগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমির মো. রমজান আলী।
জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, ‘কিশোরগঞ্জ জেলা নানা বৈচিত্রে সমৃদ্ধ। এই জেলার মানুষ স্বভাবগতভাবে ধর্মপ্রাণ। তাঁরা অন্যান্য ধর্মের সঙ্গেও চমৎকার সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন। এটাই ধর্মের সৌন্দর্য। আমরা দেশটাকে সব ধর্ম দিয়ে ফুলের বাগানের মতো সাজাব, ইনশা আল্লাহ।’
বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে কিশোরগঞ্জ জেলার শীর্ষ নেতাদের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘কিশোরগঞ্জ সমতল আর হাওরের মহামিলন। কিন্তু এখানকার যোগাযোগব্যবস্থা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ বছরের পর বছর এই জেলার মানুষ সরকারের শীর্ষ পদ দখল করে রেখেছেন। তবে জনগণকে সাক্ষী রেখে বলে যাচ্ছি, আমরা জয় পেলে হাওরের কৃষিকে শিল্পে পরিণত করব। ২৮ লাখ কোটি টাকা যারা বিদেশে পাচার করেছে, তাদের পেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে ওই টাকা বের করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আনব। এখানে প্রেসিডেন্টের বাড়ি, প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি দেখা হবে না। মামলামুক্ত, শোষণমুক্ত ও পারিবারিক জমিদারিমুক্ত দেশ গড়ব। ইসনাফের ভিত্তিতে আপনাদের আস্থার প্রতিদান দিব।’
চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘জুলাইয়ে কেবল যুবকেরা লড়াই করেননি, নারীরাও করেছেন। এই দেশে এখন মা–বোনদের নিরাপত্তা নেই। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নেই। মায়েদের কথা দিচ্ছি, আপনাদের সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত অংশ হিসেবে মাথায় তুলব।’ বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের বিপুল পরিমাণ যুবক জবলেস, বেকার। তারা রাস্তায় নেমে বলেনি, “আমাদের বেকার ভাতা দেন।” তারা মেধার মূল্যায়ন চেয়েছে। কথা দিচ্ছি, তোমাদের হাতে বেকার ভাতা দিব না। আমরা তোমাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলা গড়ার কারিগর বানাব। বাংলাদেশ নামক উড়োজাহাজে তোমাদের বসিয়ে দিব। তোমরাই চালাবা। আমরা পেছনে বসব। বাংলাদেশ তোমরা গড়বা। তোমরা বলবা, আমিই বাংলাদেশ। আমরাই বাংলাদেশ।’
নির্বাচনে প্রতিপক্ষ দলগুলোকে ইঙ্গিত করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা চেয়েছি, সামনাসামনি ডায়ালগ (আলাপ) করি। জাতি আমাদের প্রশ্ন করুক। বলেছিলাম, ছলে–বলে–কৌশলে আমাদের জিততে হবে—এ ধারণা থেকে বের হয়ে আসেন। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা জনগণের কাছে ছেড়ে দেন। পুরোনো স্লোগান থেকে বের হয়ে আসেন। আমার ভোট আমি দিব। তোমার ভোট আমি দিব—সেই দিন শেষ। সেদিন আর ফিরে আসবে না।’
প্রশাসনে কর্মরতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচনে দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও সাহসের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করুন। জাতি দোয়া করবে। আমরা কারও কাছে আনুকূল্য চাই না। কিন্তু আমাদের কোনো ক্ষতি করতে এলে কাউকে ছেড়ে দেওয়া হবে না।’
দলের নেতা–কর্মীদের উদ্দেশে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমার অধিকার আমাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমার অধিকার মানে হলো মুসলামন, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—১৮ কোটি মানুষের অধিকার। আমি জামায়াতে ইসলামীর দলীয় সরকার কায়েম করতে চাই না। আমি জামায়াতের বিজয়ও চাই না। আমি ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। ১৮ কোটি মানুষের বিজয় হলে আমাদের বিজয়। যারা অন্ধকার গলিতে হাঁটতে চায়, হাটুক। আমরা আলোকিত রাস্তায় হাঁটব।’
শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর পালে হাওয়া লেগেছে। পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের বিজয় বলে দিয়েছে, সবাই এখন ন্যায়–ইনসাফের পক্ষে। নতুন বাংলাদেশের পক্ষে। চব্বিশের পক্ষে। ১১ দল ক্ষমতায় গেলে ৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। প্রতিটি শিশুকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলা হবে। বন্ধুরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলা হবে, তবে প্রভু মানা হবে না।’
বক্তব্য শেষ করার আগে শফিকুর রহমান কিশোরগঞ্জের ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটি আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং ভোট প্রার্থনা করেন।