পটুয়াখালী-৩ (দশমিনা ও গলাচিপা উপজেলা) আসনের প্রার্থী নুরুল হক নুর ও হাসান মামুন
পটুয়াখালী-৩ (দশমিনা ও গলাচিপা উপজেলা) আসনের প্রার্থী নুরুল হক নুর ও হাসান মামুন

পটুয়াখালী-৩

নুরুল হক ও হাসান মামুনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঘিরে স্থানীয় বিএনপিতে বড় বদল

পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে নির্বাচন ঘিরে বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিএনপির আসন সমঝোতার প্রার্থী গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর এবং ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হাসান মামুনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত ১৮ দিনের ব্যবধানে কয়েকটি কমিটি বিলুপ্ত, বহিষ্কারাদেশ ও নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার ঘটনায় নির্বাচনী এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভুইয়া স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দশমিনা যুবদলের আহ্বায়ক এনামুল হক, যুগ্ম আহ্বায়ক ইয়াসিন আলী খান এবং গলাচিপা যুবদলের আহ্বায়ক মশিউর রহমান, যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদুল ইসলাম ও সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে গলাচিপা উপজেলা ও পৌর এবং দশমিনা যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ জানুয়ারি জোটের প্রার্থী নুরুল হক নুরের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে সদ্য বহিষ্কৃত এনামুল হক দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে (ইউএনও) লিখিত অভিযোগ দেন। তাঁর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ জানুয়ারি দশমিনা নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। এ ছাড়া বহিষ্কৃত কয়েকজন নেতা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হাসান মামুনের পক্ষে প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন।

এর আগে গত সোমবার বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলা বিএনপির নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এর আগে ১৭ জানুয়ারি গলাচিপা-দশমিনা উপজেলা বিএনপির বিদ্যমান দুটি কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।

দলীয় সূত্র জানায়, বিলুপ্ত কমিটির অনেক নেতা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে হাসান মামুনের পক্ষে শপথ নেওয়ার পাশাপাশি নুরুল হকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। অন্যদিকে, নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটিতে স্থান পাওয়া কয়েকজন নেতাকে জেলা যুবদলের সাবেক নেতা মো. শিপলু খানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
শিপুল খান প্রথম থেকেই নূরকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচনী কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। গলাচিপা উপজেলা বিএনপির ২১ সদস্যের নতুন কমিটির আহ্বায়ক হয়েছেন গোলাম মোস্তফা এবং দশমিনা উপজেলা বিএনপির ১৬ সদস্যের কমিটির আহ্বায়ক হয়েছেন সিদ্দিক আহমেদ মোল্লা। গলাচিপা পৌর বিএনপির নবগঠিত কমিটিতে আহ্বায়ক হয়েছেন রাকিবুল ইসলাম খান। এসব কমিটির নেতারা এখন নূরের ‘ট্রাক’ প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

দলীয় সূত্র জানায়, গত ১৫ জানুয়ারি দশমিনা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলমসহ কয়েকজন নেতা প্রকাশ্যে হাসান মামুনের পক্ষে শপথ নেন। ১৭ জানুয়ারি তাঁর কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার পর তিনি ঢাকায় গিয়ে রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এলাকায় ফেরেন। ২৫ জানুয়ারি দশমিনা উপজেলার আলিপুরা বাজারে নুরুলের নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিয়ে তাঁকে সমর্থন জানান। পরে ২ ফেব্রুয়ারি নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটিতে তাঁকে সদস্যসচিব করা হয়।

এ ছাড়া ২১ জানুয়ারি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে হাসান মামুনের পক্ষে প্রচারণা চালানোর অভিযোগে দশমিনা উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কাজী তানজির আহমেদকে বহিষ্কার করা হয়। পরে ২৯ জানুয়ারি আবুল বশারকে নতুন আহ্বায়ক করা হয়। আবুল বশার এখন নুরের পক্ষে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।

নুরুলের সমর্থক জেলা যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. শিপলু খান বলেন, বিলুপ্ত কমিটির অন্তত ৫০ শতাংশ নেতা-কর্মী এখন নুরুল হকের পক্ষে কাজ করছেন। আরও অনেকে প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে সমর্থন দিচ্ছেন।

গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী নুরুল হক বলেন, ‘মূলত আগের কমিটিগুলো ছিল হাসান মামুনকেন্দ্রিক। ফলে তাঁরা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী হাসান মামুনকে সমর্থন দিয়েছেন। এখন অনেক নেতা তাঁদের ভুল বুঝে আমাকে সমর্থন দিচ্ছেন।’ তিনি দাবি করেন, বর্তমানে বিএনপির অন্তত ৫০ শতাংশ নেতা-কর্মী তাঁকে সমর্থন দিচ্ছেন এবং নির্বাচনের আগে তা ৮০ শতাংশে পৌঁছাবে।

অন্যদিকে হাসান মামুনের মিডিয়া সেলের সমন্বয়ক জাহিদুল ইসলাম বলেন, হাসান মামুন ও নুরুল হক নুরের নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে গলাচিপা-দশমিনা উপজেলা বিএনপিতে বড় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে কিছু নেতা-কর্মী বহিষ্কার এড়াতে নুরুলকে সমর্থন দিচ্ছেন। কিন্তু তৃণমূল বিএনপির বড় অংশ এখনো হাসান মামুনের সঙ্গেই আছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে পটুয়াখালী-৩ আসনটি ছেড়ে দেয় বিএনপি। অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য হাসান মামুন পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে পরে তা জমা দেন। পরে ৩০ ডিসেম্বর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে হাসান মামুনকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। এর আগে গত ২৮ ডিসেম্বর, অর্থাৎ মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার এক দিন আগে হাসান মামুন দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের কথা জানান।