মেঘনা নদীতে ট্রলারডুবিতে শিরিনা আক্তারের তিন ছেলে–মেয়ে মারা যান। নিখোঁজ রয়েছেন স্বামী হেলাল উদ্দিন শিকদার। স্বামী–সন্তানদের জন্য তাঁর আহাজারি থামছেই না। শ্রীমদ্দি, হোমনা, কুমিল্লা। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মেঘনা নদীতে ট্রলারডুবিতে শিরিনা আক্তারের তিন ছেলে–মেয়ে মারা যান। নিখোঁজ রয়েছেন স্বামী হেলাল উদ্দিন শিকদার। স্বামী–সন্তানদের জন্য তাঁর আহাজারি থামছেই না। শ্রীমদ্দি, হোমনা, কুমিল্লা। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেঘনায় ট্রলারডুবি

‘এহন আমাগো মা-মেয়েরে কে খাওন দিব?’

দিন আনছে, দিন খাইছে; নগদ বলতে কিচ্ছু নাই। একটা বেডা মানুষও যদি বাঁইচ্চা থাকত! এহন আমাগো মা-মেয়েরে কে খাওন দিব? হায় রে আল্লাহ, তোমার কি একটু দয়ামায়া অইল না! এহন আমাগো মা-মাইয়ার ভাত খাওনের লাইগ্গা ভিক্ষা ছাড়া কোনো পথ নাই।

বিলাপ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লার হোমনা উপজেলার শ্রীমদ্দি গ্রামের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালক মো. হেলাল উদ্দিন শিকদারের (৫০) স্ত্রী শিরিনা আক্তার। মেঘনা নদীতে ট্রলারডুবিতে তিন ছেলে–মেয়ে হারিয়েছেন শিরিনা আক্তার। এখনো খোঁজ পাওয়া যায়নি স্বামী হেলাল উদ্দিনের।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বৈদ্যেরবাজারের সোনাময়ী এলাকায় মেঘনা নদীতে ঝোড়ো আবহাওয়ার কবলে পড়ে ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ওই দিনই রায়েসা বেগম (৪০) নামের এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ ছিলেন হেলাল উদ্দিন ও তাঁর তিন ছেলে–মেয়ে। রাইসা বেগম সম্পর্কে শিরিনা আক্তারে ফুফাতো বোন হন।

ঘটনার দুদিন পর শনিবার সকাল আটটার দিকে বৈদ্যেরবাজার এলাকায় মেঘনা নদী থেকে সজীব হোসেন শিকদার (২৪), সামিয়া আক্তার (১৭) ও সামিন হোসেনের (৫) মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও নৌ পুলিশ। তবে এখনো খোঁজ মেলেনি হেলাল উদ্দিনের। বিলাপ করতে করতে সে কথাই বলছিলেন শিরিনা আক্তার, ‘হিলারে (স্বামী হেলাল উদ্দিন) এহনো খুঁইজ্জা পায় নাই। মনে অয়, হিলায় গইল্লা-পইচ্চা শেষ হইয়া গেছে।’

গতকাল শনিবার দুপুর ১২টার দিকে শ্রীমদ্দি গ্রামের ঈদগাহ মাঠে সজীব, সামিয়া ও সামিনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে সজীব ও সামিনকে শ্রীমদ্দি চরেরগাঁও গ্রামে সামাজিক কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়। সামিয়াকে দাফন করা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার কালিকাপুর গ্রামে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে।

রায়েসা বেগম, সজীব হোসেন, সামিয়া আক্তার ও সামিন হোসেন

আজ রোববার সকাল ১০টায় হোমনার শ্রীমদ্দি গ্রামের শিকদার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বসতঘরে বসে বিলাপ করছেন শিরিনা আক্তার। বৃহস্পতিবার থেকে তাঁর খাওয়াদাওয়া বলতে গেলে বন্ধ। অসুস্থ হয়ে পড়ায় চিকিৎসকের কাছেও নেওয়া হয়েছে। স্বজনেরা চেষ্টা করেও তাঁকে ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করাতে পারছেন না।

হেলাল উদ্দিন ও শিরিনা আক্তার আপন খালাতো ভাই-বোন। আবার স্বামী-স্ত্রী। বিলাপ করতে করতে শিরিনা আক্তার জানান, সোনারগাঁয়ের হাড়িয়া বৈদ্যেপাড়া গ্রামে শিরিনা আক্তারের ফুফু শাপুল বেগমের স্বামীর বাড়ি। কয়েক বছর আগে তাঁর ফুফু মারা গেছেন। ফুফাতো ভাই শাহ পরানের মেয়ে সাজিয়া আক্তারের গত শুক্রবার বিয়ে ছিল। হেলাল উদ্দিন ও সজীব হোসেন কসাই হিসেবেও বেশ পারদর্শী। এ ছাড়া হোমনার ঘারমোড়া বাজারে গরু-ছাগল সস্তা দামে কেনা যায়। সে সুবাদে হোমনা থেকে দুটি গরু ও একটি ছাগল কিনে তিনিসহ ১২ আত্মীয়স্বজন বৃহস্পতিবার দুপুরে শ্রীমদ্দি গ্রাম থেকে ট্রলারে করে বৈদ্যেরপাড়া রওনা হন।

কারও বারণ শোনেননি মাঝি

ট্রলারের চালক ছিলেন শ্রীমদ্দি গ্রামেরই আহম্মেদ নবী। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শিরিনা আক্তার বলেন, ট্রলারটি মেঘনা নদীর সোনাময়ী এলাকায় নদীর মাঝখানে পৌঁছানোর আগেই আকাশ মেঘে ঢেকে যায়। এ সময় চালককে তীরের দিকে ট্রলার থামিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দেওয়ার অনুরোধ করেন হেলাল উদ্দিন। নদীর মাঝখানে থাকা বালুবাহী বাল্কহেডের লোকজনও ট্রলারটিকে নদীর মাঝখানে না যাওয়ার জন্য সংকেত দেন।

শিরিনা আক্তারের ভাষ্য, ট্রলারের চালক কারও কথা শোনেননি। একপর্যায়ে ঝোড়ো হাওয়া ও বড় ঢেউয়ের কারণে ট্রলারটির ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তখন যাত্রীদের কাছে থাকা বালুবাহী বাল্কহেডে উঠিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু চালক সবার কথা উপেক্ষা করে সাহস দেখিয়ে আড়াআড়িভাবে মেঘনা নদী পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় হঠাৎ ঝোড়ো বাতাসে ট্রলারটি ডুবে যায়।

এ সময় শিরিনা আক্তার তাঁর ছোট মেয়ে লামিয়া আক্তারকে (৭) কোলে নিয়ে সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হন। তাঁদের সঙ্গে বাকিরা তীরে উঠতে সক্ষম হলেও তাঁর স্বামী, দুই ছেলে, এক মেয়ে ও এক ফুফাতো বোন ডুবে যান। শিরিনা আক্তারে অভিযোগ, আশপাশে লোকজন থাকলেও তাঁদের কূলে উঠতে সহযোগিতা করেননি।

হেলাল উদ্দিন শিকদারের ছোট ভাই দুলাল মিয়া শিকদার পেশায় গাড়িচালক। খবর পেয়ে ঢাকা থেকে তাৎক্ষণিক মেঘনা নদীর তীরে যান। তিনি বলেন, তিন দিন তিন রাত নদীতে খোঁজাখুঁজির পর ফায়ার সার্ভিস ও নৌ পুলিশের চেষ্টায় দুই ভাতিজা ও এক ভাতিজির মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ বড় ভাইয়ের সন্ধান আজ রোববার বিকেল চারটা পর্যন্ত পাননি।

ছেলে আর নাতি–নাতনিদের জন্য আহাজারি করছেন তাহেরা খাতুন

মায়ের মন টেলিফোনের আগে জানে

নিখোঁজ হেলাল উদ্দিন শিকদারের মা তাহেরা খাতুনের বয়স সত্তরের কাছাকাছি। ঘরের একটি কক্ষে বসে বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ‘পুতরে রে পুত, তুই কেন মাকে রাইখ্খা চইল্লা গেলি।’

ঘটনার দিনের কথা স্মরণ করে তাহেরা বেগম বলেন, মায়ের মন টেলিফোনের আগে জানে। তিনি নিজে ছেলে, ছেলের বউ, চার নাতি–নাতনি ও স্বজনদের ট্রলারে উঠিয়ে দিয়ে বাড়ি ফেরেন। বৃহস্পতিবার বিকেলে ট্রলার ডুবে যাওয়ার খবরটি তাঁকে কেউ দেননি। কিন্তু তাঁর মনটা কেন যেন হাহাকার করে উঠছিল।

নিহত সামিয়া আক্তারের স্বামী তারা মিয়া বিয়ের এক মাস পর সৌদি আরবে চলে যান। অক্টোবরে দেশে ফেরার কথা ছিল। স্ত্রীর মৃত্যুর খবর শুনে মুষড়ে পড়েছেন তিনি। ভিডিও কলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কান্নার জন্য ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলেন না।

আজ রোববার বিকেলে হেলাল উদ্দিনের বাড়িতে যান হোমনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম। এ সময় তিনি হেলাল উদ্দিনের স্ত্রী শিরিনা আক্তারের হাতে ৮০ হাজার টাকা তুলে দেন। মৃত রায়েসা বেগমের পরিবারকে দেন ২০ হাজার টাকা। ভবিষ্যতে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আরও সহযোগিতার চেষ্টা করবেন বলেও জানান।

প্রতিবেশী ব্যবসায়ী জামাল হোসেন বলেন, পরিবারটি খুবই অসহায়। বসতঘরে কক্ষের অভাবে বিয়ের উপযুক্ত ছেলেকে বিয়েও করাতে পারেননি হেলাল উদ্দিন। দারিদ্র্যের কারণে মেয়েকে অল্প বয়সে তিন বছর আগে সৌদিপ্রবাসী ছেলে দেখে বিয়ে দিয়েছেন। সরকার ও প্রশাসন আর্থিক সহযোগিতা না করলে পরিবারটির ভিক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।