নেত্রকোনা-৫ আসনে বিজয়ী জামায়াতের প্রার্থী মাসুম মোস্তফা ও তাঁর নিকটবর্তী প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী আবু তাহের তালুকদার
নেত্রকোনা-৫ আসনে বিজয়ী জামায়াতের প্রার্থী মাসুম মোস্তফা ও তাঁর নিকটবর্তী প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী আবু তাহের তালুকদার

নেত্রকোনার ৫ আসনের মধ্যে একটিতে বিএনপির পরাজয়ের কারণ কী

নেত্রকোনার পাঁচটি আসনের মধ্যে শুধু নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা) আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. আবু তাহের তালুকদার কেন পরাজিত হলেন, সেই হিসাব কষছেন নেতারা। আসনটিতে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী না থাকলেও মনোনয়নপ্রত্যাশী অনেকেই দলীয় প্রতীকের প্রার্থীর পক্ষে জোরালোভাবে কাজ না করা, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে নেতা-কর্মীদের প্রভাব বিস্তারের কারণে ভোটে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতা–কর্মীরা।

আসনটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাসুম মোস্তফা ২ হাজার ৭৬৫ ভোটে জয়ী হন। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ৮২ হাজার ১৭৭ ভোট। অন্যদিকে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আবু তাহের তালুকদার ধানের শীষ প্রতীকে পান ৭৯ হাজার ৪১২ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী তিন প্রার্থীর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. নুরুল ইসলাম হাতপাখা প্রতীকে ৩ হাজার ৩৪১ ভোট পেয়েছেন।

অবশ্য আবু তাহের তালুকদারের দাবি, তাঁর আসনে নির্বাচনী অনিয়ম, ভোট বাতিল করে দেওয়া, প্রিসাইডিং কর্মকর্তাসহ নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর জামায়াতের প্রার্থীর প্রভাব বিস্তারসহ বিভিন্ন অনিয়ম-কারচুপি হয়েছে। এ কারণে আসনটির ফলাফল স্থগিত করে আবার সব ভোট গণনার দাবি জানান তিনি। এ নিয়ে তিনি গত শনিবার সন্ধ্যায় পূর্বধলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। এ ছাড়া ভোট পুনর্গণনার জন্য আজ সোমবার তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত আসনটির ভোটারসংখ্যা ২ লাখ ৯০ হাজার ১৭৭। ৮২টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৮৬৮টি। এর মধ্যে ভোট বাতিল হয়েছে ৩ হাজার ৯৩৮টি। বৈধ ভোটের সংখ্যা ১ লাখ ৬৪ হাজার ৯৩০। সে হিসাবে ভোট পড়েছে ৫৮ দশমিক ২১ শতাংশ।

স্বাধীনতার পর থেকে আসনটি আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির দখলে ছিল। বেশির ভাগ সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হন। এবার এ আসনে শক্ত অবস্থান ছিল বিএনপির। তবে জামায়াতের প্রার্থী মাসুম মোস্তফার কাছে বিএনপির আবু তাহের তালুকদার কেন হেরে গেলেন, এর কারণ খুঁজতে বেরিয়ে এসেছে বেশ কিছু তথ্য।

স্থানীয় বাসিন্দা ও দলীয় নেতা-কর্মীরা বলছেন, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু তাহের ছাড়াও আসনটিতে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য রাবেয়া আলী, পূর্বধলা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বাবুল আলম তালুকদার, সদস্যসচিব শহীদুল্লাহ ইমরানসহ পাঁচজন। শেষ পর্যন্ত আবু তাহের মনোনয়ন পাওয়ার পর শুধু বাবুল আলম তালুকদার প্রকাশ্যে তাঁর পক্ষে অবস্থান নেন। অন্যরা ছিলেন নীরব ভূমিকায়। তৃণমূল নেতা-কর্মীরা বলছেন, দলীয় ঐক্য না থাকায় অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দলেই হেরেছেন আবু তাহের।

এ ছাড়া দলীয় প্রার্থীর কিছুসংখ্যক কর্মীর বিরুদ্ধে নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকার কথা মানুষে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ায় ধানের শীষের বিজয়ে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা বিএনপির সাবেক একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী প্রয়াত চিকিৎসক মোহাম্মদ আলী এমপি হওয়ার পর এ আসনে বিএনপি থেকে আর কেউ এমপি হতে পারেননি। টানা চারবার আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হন। এবার আমরা ভেবেছিলাম, বিএনপির মনোনীত প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন। কিন্তু শহীদুল্লাহ ইমরানসহ কয়েকজন নেতা দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করায় সুযোগ কাজে লাগিয়ে জামায়াতের প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এটা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। এ ছাড়া আবু তাহেরের কাছে থেকে তাঁকে সব সময় ঘিরে রেখেছিলেন বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী, যাঁদের দলীয় লোকজনসহ সাধারণ মানুষ অপছন্দ করেন। এঁরা তাঁর পরাজয়ের একটি কারণ।’

পদধারী সাবেক আরেক নেতা বলেন, ‘দলীয় প্রার্থীর কিছু কর্মীর বিরুদ্ধে নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকার কথা মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ায় সেটি তাঁর বিজয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া জামায়াতের প্রার্থী শক্তিশালী হওয়ায় আমরা দলীয় প্রার্থীকে পরামর্শ দিলেও তিনি তা আমলে না নিয়ে ভাবতেন তাঁর বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। এই অহংকারও পরাজয়ের একটি কারণ।’

পরাজিত প্রার্থী আবু তাহের তালুকদার আজ বিকেলে মুঠোফোন প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেকেই বিরোধিতা করেছেন, তবে সেটি বড় কথা নয়। আমার আসনে সূক্ষ্ম নির্বাচনী অনিয়ম হয়েছে। একটি বিশেষ দলকে বিজয়ী করা হয়েছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের লাঠিপেটা করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে আমি ফলাফল স্থগিত করে পুনরায় সমস্ত ভোট গণনার দাবি জানিয়ে শনিবার সংবাদ সম্মেলন করেছি। আজ বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করেছি। আমার বিশ্বাস, ভোট পুনর্গণনা করলে আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত।’

ফল বিপর্যয়ের জন্য সবাই মর্মাহত উল্লেখ করে উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব শহীদুল্লাহ ইমরান বলেন, ‘আসলে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছি, আমাদের কিছু ভুলভ্রান্তির জন্য এ বিপর্যয়টি হয়েছে। সামনের দিনে এটা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করব।’

জেলা বিএনপির সভাপতি ও নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) আসনের ধানের শীষের বিজয়ী প্রার্থী মো. আনোয়ারুল হক বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। কেন এমন হলো, কোথায় আমাদের দুর্বলতা ছিল, তার কারণ চিহ্নিত করে উত্তরণের পথ খোঁজা হচ্ছে।’

বিজয়ী প্রার্থী মাছুম মোস্তফা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি। ১৯৯৪ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের মাধ্যমে রাজনীতিতে যোগদান করে জামায়াতে ইসলামীর শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০১৪ সালে তিনি পূর্বধলা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। মাছুম মোস্তফা পূর্বধলার হাফেজ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।

মাছুম মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি সব সময় অহিংস ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাই পূর্বধলাবাসী এর আগেও আমাকে ভোট দিয়ে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে বিজয়ী করেছিলেন। অব্যাহত ভালোবাসায় এবারও আমাকে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ করে দিয়েছেন। আশা করি এই সমর্থনের প্রতি, ভালোবাসার প্রতি আমি আগামী দিনেও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পারব।’

নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সাইফুর রহমান বলেন, ‘কোনো কারচুপি হয়নি। রেজাল্ট হয়ে গেছে, সব স্বাক্ষর হয়ে গেছে, এখন এসব কেন প্রশ্ন আসছে?’