
তিন বছর আগে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় কিশোরী সুরাইয়া আখতার (ছদ্মনাম) প্রেমের সম্পর্কে জড়ায় যুবক রাজিব কুমারের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। দুজনের প্রেমের কথা অল্প সময়ের মধ্যেই জেনে যায় সুরাইয়ার পরিবার। সম্পর্ক মেনে না নেওয়ায় সুরাইয়া প্রেমিকের হাত ধরে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়।
২০২১ সালের ২০ জুন সুরাইয়াকে স্থানীয় একটি মন্দিরে নিয়ে শাঁখা-সিঁদুর পরিয়ে দেয় রাজিব। পরবর্তী সময়ে সুরাইয়ার বাবার করা অপহরণ মামলায় রাজিবকে গ্রেপ্তার করে পত্নীতলার থানা পুলিশ। মামলাটি বর্তমানে নওগাঁ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ ও নওগাঁ শিশু আদালত-২–এ বিচারাধীন।
সুরাইয়া ও রাজিবের মতো অসময়ে প্রেম ও ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে মামলার বিড়ম্বনায় পড়া এমন ৩৬টি মামলার শুনানি হয়েছে আজ বুধবার নওগাঁর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত-২ ও নওগাঁ শিশু আদালত-২–এ। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে এসব মামলার শুনানির দিন ধার্য করেছিলেন আদালত দুটির বিচারক মেহেদী হাসান তালুকদার। এসব মামলার প্রতিটির বর্ণনায় আছে রাজিব-সুরাইয়া প্রেমিক যুগলের মতো নানা ঘটনা। মামলার শুনানির জন্য হাজিরা দিতে আসা সব প্রেমিক যুগলকে আজ আদালত প্রাঙ্গণে চকলেট দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) মকবুল হোসেন।
আজ বেলা ১১টায় বিচারক মেহেদী হাসান তালুকদার আদালতের এজলাসে বসেন। বিচার কার্যক্রম শুরুর আগে অসময়ে প্রেমে জড়িয়ে মামলার বিড়ম্বনায় পড়া ৩৬ প্রেমিক যুগলকে এজলাস কক্ষে ডেকে নেন। এ সময় এজলাস কক্ষে উপস্থিত প্রেমিক যুগলদের অসময়ের প্রেমে না জড়িয়ে নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা, মা–বাবার আদেশ মেনে চলা, পড়াশোনা অব্যাহত রাখা, আত্মনির্ভরশীল হওয়া এবং সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিয়োজিত থাকতে উদ্বুদ্ধ করেন বিচারক মেহেদী হাসান তালুকদার।
জানতে চাইলে নওগাঁ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত-২ ও শিশু আদালত-২-এর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মকবুল হোসেন বলেন, ‘আজ ভিন্ন মাত্রায় আদালত বসেছে। অসময়ে প্রেমে জড়ানো ও বিয়ে করা যুগলদের বিরুদ্ধে অভিভাবকদের অপহরণ ও বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের মামলাগুলো আজ আদালতে শুনানির জন্য রাখা হয়েছিল। মামলার বিড়ম্বনায় পড়া যুগলদের পড়াশোনার পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধ ও গুরুজনদের আদেশ-নিষেধ মেনে চলার উপদেশ দেন বিচারক মহোদয়। ভালোবাসা দিবসে প্রেম ও ভালোবাসা–সংক্রান্ত একাধিক মামলার শুনানি হওয়ায় আমি আমার পক্ষ থেকে আজকে আসা সবাইকে “লাভ ক্যান্ডি” উপহার দিয়ে ভালোবাসার শুভেচ্ছা জানিয়েছি। এতে আমি তৃপ্ত হয়েছি।’
আদালতের এজলাস কক্ষের সামনে কথা হয় সাপাহার উপজেলা থেকে আসা ১৬ বছর বয়সী কিশোরী সাথীর (ছদ্মনাম) সঙ্গে। সে জানায়, স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় প্রেমিকের কর্মস্থল ময়মনসিংহে গত বছরের ৯ জানুয়ারি পালিয়ে গিয়ে আদালতে বিয়ে করে সে। সেখানে রাজমিস্ত্রি স্বামীর সঙ্গে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করত। তত দিনে তার বাবা স্বামী পরশের (ছদ্মনাম) বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন। ওই মামলায় পরশকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। সেই সঙ্গে সাথীকে তার পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়। মামলা চলমান থাকায় সাথী ও পরশ এখন আলাদা।
আজ আদালতে এসে চকলেট উপহার পেয়ে এবং বিচারকের কাছ থেকে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য শুনে খুশি সাথী। সে বলে, ‘এর আগেও কয়েকবার শুনানির দিন আদালতে এসেছিলাম। সেসব দিনে আদালতের পরিবেশ এ রকম ছিল না। আজকে বিচারক মিষ্টি করে কথা বললেন। পরামর্শ দিলেন। ভালোবাসা দিবসে আদালতে এমন পরিবেশ দেখে আমি খুশি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নওগাঁ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, মামলাগুলো ভিন্ন ভিন্ন দিনে শুনানি করলে বিচারক সবাইকে একই উপদেশ দিতে পারতেন না। মামলাগুলো একই দিনে শুনানির উদ্যোগ নিয়ে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।