কক্সবাজার শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় এভাবে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে বসতি। গত শুক্রবার দুপুরে তোলা
কক্সবাজার শহরের  কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় এভাবে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে বসতি। গত শুক্রবার দুপুরে তোলা

কক্সবাজারে ৫১ পাহাড়ে ২২ হাজার বসতি, ১৮ বছরে পাহাড়ধসে মৃত্যু ৩১২

কক্সবাজারের ৫১টি পাহাড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় ২২ হাজার অবৈধ বসতি, যেখানে ঝুঁকি নিয়ে বাস করছেন কয়েক লাখ মানুষ। চলতি সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে ২২ জন নিহত হয়েছেন। পরিবেশবাদীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত ১৮ বছরে পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৩১২ জন। রাজনৈতিক প্রভাব, ভূমিদস্যু চক্র ও পুনর্বাসনের অভাবে পাহাড় কাটা ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নির্মাণ বন্ধ হচ্ছে না। প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরানোর চেষ্টা চালালেও স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি।

কক্সবাজার শহরের কলাতলীর আদর্শগ্রামে পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছে ঝুঁকিপুর্ন বসতি। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে

কক্সবাজারে শহরের পাহাড়তলী, টেকনাইফ্যা পাহাড়, বাদশাঘোনা, ছাত্তারের ঘোনা, খাজা মঞ্জিল কিংবা লারপাড়া এলাকাগুলো পাহাড়ঘেরা। গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণের শব্দের সঙ্গে এসব এলাকার বাসিন্দারা ভয় ধরানো আরও একটি শব্দ শুনেছেন ক্রমাগত। টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে যাওয়া একটা মড়মড় শব্দ। অভিজ্ঞ বাসিন্দারা জানেন, পাহাড়ে ফাটল ধরার শব্দ এটি। ভারী বৃষ্টি হলেই কোদালের ঘা খাওয়া নরম পাহাড়গুলোতে ফাটল ধরতে থাকে। একসময় সেই পাহাড় হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে ঘরের ওপর। বৃষ্টি হলেই আতঙ্ক নিয়ে রাত পার করতে হয় বাসিন্দাদের। ঝুঁকি আর বিপদ আছে জেনেও তবু ঘর ছাড়তে চান না এসব পাহাড়ের বাসিন্দারা।

কেবল গত এক সপ্তাহের ভারী বর্ষণে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে চার শতাধিক ভূমিধসের ঘটনায় পাঁচজন মাদ্রাসাপড়ুয়া ছাত্রীসহ অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ১৮ বছরে হাজারো ভূমিধসের ঘটনায় মারা গেছেন আরও ২৯০ জন। এরপরও থামছে না পাহাড় কেটে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি গড়ে তোলার প্রবণতা। দরিদ্র মানুষজনের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট পাহাড় কাটার মতো অপরাধে জড়িত থাকায় সহজে তা বন্ধ হচ্ছে না। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে প্রায় তিন লাখ মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন।

বর্ষা শুরু হলেই পাহাড়ের ঝুঁকিতে থাকা ভাসমান লোকজনকে সরিয়ে আনার তোড়জোড় চলে। তবে বৃষ্টি থামলে সবকিছু আগের মতো হয়ে যায়। আবার শুরু হয় পাহাড় নিধন আর অবৈধ বসতি নির্মাণ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পরিবেশবিষয়ক বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা জানান, বর্ষা এলে যখন মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, তখন প্রশাসন তৎপর হয়। কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হয়। তবে পরিস্থিতি পাল্টায় না। এতে একদিকে ভাসমান দরিদ্র লোকজনের প্রাণ যাচ্ছে, অন্যদিকে বনাঞ্চল উজাড় হওয়ায় বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবারই দাবি করা হয়, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের বসতি থেকে লোকজনকে সরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি করা হয় না। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানও একই রকম কথা বললেন। তিনি বলেন, পুনর্বাসনের বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া পাহাড়ের বসতি উচ্ছেদ করা কঠিন। এটি দীর্ঘদিনের সংকট। এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা লোকজনকে সরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। গত তিন দিনে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষকে সরিয়ে আনা হয়েছে।

এক পাহাড়েই ঝুঁকিপূর্ণ ৬০০ বাড়ি

কক্সবাজার পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পাহাড়বেষ্টিত বাদশাঘোনা এলাকা। দেড় বর্গকিলোমিটার আয়তনের ৭০-৮০ ফুট উঁচু একটি পাহাড়ের চূড়ায়, পাদদেশে এবং ঢালে নির্মিত হয়েছে অন্তত ৬০০টি টিনের বাড়ি। রয়েছে কয়েকটি পাকা বাড়িও। গত সোমবার দুপুরে সেখানে নতুন করে পাহাড় কাটার চিহ্ন দেখা গেছে। তৈরি হয়েছে নতুন ঘরও।

পাহাড়ের ঠিক মাঝখানে দুই মাস আগে ঘর নির্মাণ করেন মহেশখালীর জেলে মো. আলমগীর। ঘরে পাওয়া গেল আলমগীরের দুই ছেলে ও স্ত্রী আলম আরাকে। আলম আরা জানান, তাঁর স্বামী সাগরে মাছ ধরতে গেছেন। বাড়িতে তিনি সন্তানদের নিয়ে একাই আছেন। পাহাড়ে কীভাবে ঘর তুলেছেন জানতে চাইলে আলম আরা বলেন, স্থানীয় একজন বিএনপি নেতার কাছ থেকে তাঁর স্বামী ৮০ হাজার টাকায় দুই গন্ডা পাহাড়ি জমির দখল নেন। এরপর সেখানে ঘর তৈরি করে থাকছেন। ভারী বর্ষণের ঘরের ভেতর পানি জমে যায়, বাতাসে ঘরটি কাঁপতে থাকে; কিন্তু কিছু করার নেই। তবে বিএনপি নেতার নাম জানতে চাইলে তিনি বলতে রাজি হননি।

পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ‘এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস)’ এক জরিপ প্রতিবেদনে ভূমিধসে নিহতের পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে চলতি ২০২৬ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত ১৮ বছরে ৩১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৮ সালে ১৩ জন, ২০০৯ সালে ৫ জন, ২০১০ সালে ৬২ জন, ২০১২ সালে ২৯ জন, ২০১৫ সালে ৫ জন, ২০১৬ সালে ১৭ জন, ২০১৭ সালে ২৬ জন, ২০১৮ সালে ২৮ জন, ২০১৯ সালে ২২ জন, ২০২০ সালে ২৯ জন, ২০২২ সালে ২৫ জন, ২০২৩ সালে ৬ জন, ২০২৪ সালে ১০ জন এবং চলতি ২০২৬ সালে ৩৫ জন। এর মধ্যে রোহিঙ্গা ৫৪ জন।

বাদশাঘোনার উঁচু এই পাহাড়ে ওঠানামার জন্য পাহাড় কেটে তৈরি করা হয় ছয়-সাতটি রাস্তা। ৮০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ার মাটি কেটে তৈরি করা হয়েছে এক কিলোমিটার দীর্ঘ আরও একটি হাঁটাচলার রাস্তা। সেই রাস্তায় দাঁড়ালে দেখা যায় পাহাড় নিধনের ভয়াবহ দৃশ্য। গত দেড় থেকে দুই বছরে এই পাহাড়ে তৈরি হয়েছে তিন শতাধিক টিনশেডের আধা পাকা বাড়ি।

শহরের ফাতেরঘোনা, বাঘঘোনা, এবিসিঘোনা, ছাত্তারঘোনা, ইসুলুঘোনা, ঘোনাপাড়া, বৈদ্যঘোনা, রাডার স্টেশন, খাজা মঞ্জিল, জিয়ানগর, পাহাড়তলী, বাঁচা মিয়ার ঘোনা, লারপাড়া, গুচ্ছগ্রাম, আদর্শগ্রাম, কলাতলী ও দিককুল এলাকার ছোট-বড় আরও ৫১টি পাহাড়ের চিত্রও একই। সেসব পাহাড়েও গড়ে উঠেছে অবৈধ বসতি।

সিন্ডিকেটের কবজায় পাহাড়

পৌরসভার সাবেক মেয়র সরওয়ার কামাল বলেন, রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে ১০-১২টি সিন্ডিকেট রোহিঙ্গাদের দিয়ে পাহাড় কাটছে। পাহাড় কাটা বন্ধ না হওয়ায় শহরের জলাবদ্ধতাও দূর করা যাচ্ছে না। বর্ষার সময় পাহাড় কাটার মাটি বৃষ্টির পানিতে ভেসে শহরের নালা-ড্রেন ভরাট হচ্ছে, আধঘণ্টার বৃষ্টিতে পুরো শহর ডুবে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বিগত সরকারের আমলে শহরের পাহাড়ে ঘরবাড়ি নির্মাণের হিড়িক পড়েছিল। স্থানীয় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা তখন একজন সংসদ সদস্যের নাম বলে পাহাড়ি জমি বিক্রি করতেন। আর ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কিছু নেতা-কর্মী রোহিঙ্গা শ্রমিকদের দিয়ে পাহাড় কাটছেন।

৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও পৌর বিএনপির সদস্য আশরাফুল হক ছিদ্দিকী বলেন, আগে আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করে একাধিক সিন্ডিকেট পাহাড় কেটেছে। আর এখন ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করে পাহাড় কাটা হচ্ছে।

৫১ পাহাড়ে ২২ হাজার অবৈধ বসতি

পাহাড় কেটে এ পর্যন্ত কত ঘরবাড়ি তৈরি হয়েছে, তার পরিসংখ্যান কোথাও নেই। তবে পরিবেশবাদী বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের কর্মীদের দাবি, পৌরসভার পাঁচটি ওয়ার্ডের অন্তর্গত ছোট-বড় ৫১টি সরকারি পাহাড় কেটে গত তিন দশকে নির্মিত হয়েছে ২২ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি। এর মধ্যে ১ থেকে ৩ তলাবিশিষ্ট পাকা বাড়ি রয়েছে ২ হাজারের বেশি, আধা পাকা টিনের বাড়ি ৯ হাজার, অবশিষ্ট ঘরগুলো ত্রিপল ও বাঁশের বেড়ার। এসব ঘরবাড়িতে বসতি করছেন দুই লাখের বেশি মানুষ। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ ভাসমান-শ্রমজীবী ও জলবায়ু উদ্বাস্তু। ৩৭ হাজারের বেশি আছেন রোহিঙ্গা।

পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছৈয়দুল হক আজাদ বলেন, তিন বছর আগে শহরের পাহাড়গুলোতে অতিঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা ৯ হাজারের বেশি মানুষের তালিকা করা হয়েছিল। কিন্তু পুনর্বাসনের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সরানো যায়নি। এখন সংখ্যা আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জেলা শাখার সভাপতি করিম উল্লাহ বলেন,পাহাড় কাটার ফলে কেবল মাটিই সরছে না, নিশ্চিহ্ন হচ্ছে পাহাড়ের বুকে জড়িয়ে থাকা হাজারো গাছপালা। বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্য তলানিতে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে পাহাড়গুলো বৃষ্টির পানি ধরে রাখার যে প্রাকৃতিক ক্ষমতা রাখত, তা হারিয়ে ফেলছে। দিন দিন পাহাড়ধসের ঘটনা বাড়ছে। অন্যদিকে বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে না গিয়ে গড়িয়ে নামছে সরাসরি নালায়। শহরের ২০-২৫টি উপসড়কের নালা বালু ও মাটিতে ভরাট হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।

১৮ বছরে ৩১২ মৃত্যু

পাহাড়ধসের ঘটনায় জেলায় এ পর্যন্ত কতজনের মৃত্যু হয়েছে সে পরিসংখ্যানও কোথাও নেই। তবে পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ‘এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস)’ এক জরিপ প্রতিবেদনে ভূমিধসে নিহতের পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে চলতি ২০২৬ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত ১৮ বছরে ৩১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৮ সালে ১৩ জন, ২০০৯ সালে ৫ জন, ২০১০ সালে ৬২ জন, ২০১২ সালে ২৯ জন, ২০১৫ সালে ৫ জন, ২০১৬ সালে ১৭ জন, ২০১৭ সালে ২৬ জন, ২০১৮ সালে ২৮ জন, ২০১৯ সালে ২২ জন, ২০২০ সালে ২৯ জন, ২০২২ সালে ২৫ জন, ২০২৩ সালে ৬ জন, ২০২৪ সালে ১০ জন এবং চলতি ২০২৬ সালে ৩৫ জন। এর মধ্যে রোহিঙ্গা ৫৪ জন।

পাহাড়ধসের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ছিল ২০১০ সালের ১৫ জুন। ওই দিনের টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজার জেলায় ৬২ জনের মৃত্যু হয়েছিল উল্লেখ করেন ইয়েস চেয়ারম্যান মুজিবুল হক।

কক্সবাজার পৌরসভার বাদশাহঘোনা এলাকার ৮০ ফুট উঁচু পাহাড় কেটে চলাচলের রাস্তা এবং দুইপাশে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। গত সোমবার দুপুরে তোলা

২০১০ সাল থেকে পাঁচ শতাধিক দখলদারের বিরুদ্ধে ৩৪০টি মামলা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে পাহাড় নিধন মামলা ২২০টি। এরপরও পাহাড় নিধন বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা। তিনি বলেন, বৃষ্টির সময় বিশেষ করে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাতে পাহাড় নিধন চলে। তখন অভিযানে নামার সুযোগ থাকে না।

গত এক বছরে জেলায় পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে বন বিভাগ মামলা করে ৩০৪টি। এসব মামলায় কয়েক শ ব্যক্তিকে আসামি করা হলেও ধরা পড়েছে খুবই অল্প। কর্মকর্তারা বলেন, জনবলসংকট এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে দুর্গম পাহাড়ের পাহাড় নিধন বন্ধ এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না।