শিবকালী মন্দিরে চড়কপূজা উপলক্ষে কারুশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সোমবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও সদরের দক্ষিণ বঠিনা গ্রামে
শিবকালী মন্দিরে চড়কপূজা উপলক্ষে কারুশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সোমবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও সদরের দক্ষিণ বঠিনা গ্রামে

কারুশিল্প প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শেষ হলো ঠাকুরগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী চড়ক মেলা

ঠাকুরগাঁও শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ফাড়াবাড়ি হাট। হাট পেরিয়ে পশ্চিম দিকে চলে গেছে একটি কাঁচা রাস্তা। সেই পথেই দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী একটি গাছ। দক্ষিণ বঠিনা গ্রামের গাছটির নিচেই একটি শিবকালী মন্দির—যেখানে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় চড়কপূজার। এ উপলক্ষে বসে ঐতিহ্যবাহী মেলা। আর পাঁচ বছর পরপর এই মেলার মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে স্থানীয় লোকজনের তৈরি নানা কারুশিল্পের প্রদর্শনী। পুরো আয়োজন ঘিরে এলাকায় সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, এবার চড়কপূজা ও মেলার ১০৫তম আয়োজন। গত শনিবার চড়কপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসব। আজ সোমবার কারুশিল্প প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শেষ হলো।

সোমবার দুপুরে দেখা যায়, ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল আকৃতির গাছ। নাম জানা না থাকায় স্থানীয় লোকজন একে ‘অচিন গাছ’ বলেই চেনেন। গাছের নিচের মন্দিরে চলছে পূজা-অর্চনা। ভক্ত ও পুণ্যার্থীদের ভিড়, ঢাকঢোল ও কাঁসরের শব্দে মুখর পুরো এলাকা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি।

বেলা পৌনে তিনটার দিকে শিল্পীরা একে একে তাঁদের তৈরি কারুশিল্প মাঠে আনতে শুরু করেন। বাঁশ ও কাগজ দিয়ে তৈরি হাতি, ঘোড়া, বাঘ, জিরাফ, কুমির, সাপ, বেজি, ব্যাঙ, শকুনসহ নানা প্রাণীর প্রতিকৃতি ছিল চোখে পড়ার মতো। পাশাপাশি ছিল জিপগাড়ি ও হেলিকপ্টারের মডেল।

বেলা সাড়ে তিনটার দিকে শুরু হয় প্রদর্শনী। শিল্পীরা তাঁদের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে মাঠ ঘুরে প্রদর্শন করেন। উপস্থিত দর্শনার্থীরা করতালি দিয়ে তাঁদের উৎসাহ দেন। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা ধরে চলে এই প্রদর্শনী। ফাড়াবাড়ি এলাকার কৃষক জগদীশ রায়ের নেতৃত্বে ১৫ জনের একটি দল বিশাল আকৃতির একটি হাতি তৈরি করেন। এটি তৈরি করতে তাঁদের সময় লেগেছে প্রায় ২০ দিন। ২২ জন যুবক হাতিটি কাঁধে তুলে মাঠ প্রদক্ষিণ করেন। দলের সদস্য কল্প নাথ রায় বলেন, ‘হাতিটিই ছিল প্রদর্শনীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপস্থাপনা। দর্শনার্থীদের প্রশংসা পেয়েছি।’

দক্ষিণ বঠিনা গ্রামের খগেশ্বর রায় ও তাঁর দল তৈরি করেন বাঘ, হরিণসহ চারটি প্রাণী। তাঁদের তৈরি বাঘের মুখে একটি মানুষকে কামড়ে ধরা অবস্থায় দেখানো হয়। খগেশ্বর রায় বলেন, ‘শিকার বন্ধের বার্তা দিতেই এমনভাবে উপস্থাপন করেছি।’

কারুশিল্প প্রদর্শনীতে ছিল হেলিকপ্টারের মডেল। সোমবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও সদরের দক্ষিণ বঠিনা গ্রামে

ফাড়াবাড়ি এলাকার যুবক পরেশ চন্দ্র বর্মণ তৈরি করেন সাপ, ব্যাঙ ও বেজি। তিনি বলেন, ‘দেশে কতই–না প্রাণী ছিল। এসব এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। আর সেসব প্রাণী হারিয়ে যাওয়ায় আমাদের পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়ছে। মানুষকে সচেতন করতেই আমি সাপ, ব্যাঙ, বেজি তৈরি করে প্রদর্শন করেছি।’

নিজের হাতে দুটি পাখা ও লেজ লাগিয়ে নিজেকে শকুন সাজিয়েছে কিশোর পরিতোষ রায়। শকুন সেজে সে পাখা নাড়িয়ে পুরো মাঠ ঘুরছে। সেই ফাঁকে পরিতোষ বলে, ‘শকুন আমাদের অনেক উপকার করে। কিন্তু ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহার করায় তা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। শকুন সংরক্ষণে সচেতন করতে আমি নিজেই শকুন সেজেছি।’

জীবন রায় ও উদয় রায় তৈরি করেন রুই-কাতলার প্রতিকৃতি। তাঁদের মতে, দেশীয় মাছের গুরুত্ব তুলে ধরতেই এ উদ্যোগ। অন্যদিকে বিশ্বজিৎ রায়ের নেতৃত্বে তৈরি করা হয় একটি হেলিকপ্টারের মডেল। বিশ্বজিৎ রায় বলেন, পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে। হেলিকপ্টারের মতো প্রযুক্তি তৈরিতে উৎসাহ দিতেই এ উদ্যোগ।

প্রদর্শনী দেখতে আসা দর্শনার্থীদেরও ছিল উৎসাহ। ঠাকুরগাঁও শহর থেকে আসা রাশেদুল হাসান বলেন, ‘হারিয়ে যেতে বসা প্রাণীদের প্রতিকৃতি দেখে ভালো লেগেছে। এমন আয়োজন থেকে মানুষ কিঞ্চিৎ সচেতন হলে আমাদেরই উপকার।’

কারুশিল্প প্রদর্শনী শেষে সবাই ছুটলেন মেলার দিকে। পাশের ফাঁকা জমিতেই বসেছে মেলা। শতাধিক ব্যবসায়ী ঐতিহ্যবাহী পণ্য নিয়ে মেলায় অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন খেলনা, চুড়ি, ফিতা, আলতা থেকে শুরু করে গৃহস্থালির নানা সামগ্রী—সবই পাওয়া যাচ্ছে এই মেলায়। সেখানে পাশাপাশি রয়েছে চটপটি-ফুচকা, মিষ্টি, জিলাপি, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসাসহ নানা খাবারের দোকান। কেউ কেউ সেসব দোকান থেকে পছন্দের জিনিস দরদাম করে কিনে নিচ্ছেন।

মাটির খেলনা নিয়ে বসা সনাতন পালের দোকান থেকে কেনাকাটা করেন শারমিন বেগম। তিনি বলেন, ‘বাড়ির জন্য দুটি ফুলদানি কিনেছি।’

মেলা থেকে জিনিসপত্র কিনছেন ক্রেতারা। সোমবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও সদরের দক্ষিণ বঠিনা গ্রামে

ঠাকুরগাঁওয়ের চিত্রশিল্পী কাদিমুল ইসলাম বলেন, ‘এই প্রদর্শনীতে যাঁরা শিল্প প্রদর্শন করেছেন, তাঁরা কেউই প্রশিক্ষিত নন। পেশায় তাঁদের কেউ কৃষক, কেউ শ্রমিক, আবার কেউ কেউ শিক্ষার্থী। প্রশিক্ষিত শিল্পীর মতো তাঁরা হয়তো তাঁদের কারুশিল্প উপস্থাপন করতে পারেননি, তবে তাঁদের সৃজনশীলতা আমাকে মুগ্ধ করেছে।’

ঠাকুরগাঁওয়ের প্রবীণ শিক্ষাবিদ মনতোষ কুমার দে বলেন, ‘চৈত্রসংক্রান্তি বা পয়লা বৈশাখের সঙ্গে বাঙালির সংস্কৃতির একটা যোগসূত্র আছে। এই কারুশিল্প প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে তাঁরা বোঝানোর চেষ্টা করছেন—এসব পশুপাখি ছাড়া আমাদের জীবন নয়। যেসব প্রাণী আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে, তা প্রদর্শন করে তাঁরা আমাদের সচেতন করার চেষ্টা করছেন।’

শিবকালী মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি বাবুল বর্মণ বলেন, এই মেলা বহু বছর ধরে চলে আসছে। সব ধর্মের মানুষ এতে অংশ নেন, যা সামাজিক সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করে।