‘পেটের সাথে যুদ্ধ করি বাঁচুছি’

তারাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সামনে চা-বিস্কুট বিক্রি করেন হোসেন আলী। নিত্যপণ্যের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে
ছবি: প্রথম আলো

হোসেন আলী (৩৯) আগে ৫ টাকায় কাপভর্তি চা দিলেও এখন দেন আধা কাপ। চা পরিমাণে কম কেন জানতে চাইলেই কাপে চিনি ঢেলে চামচ নেড়ে হোসেন মিয়া বলেন, ‘চিনির দাম দ্বিগুণ হইছে। ব্যবসা করি আর পোষাওছে না। কাস্টমার নাই, কামাই কমি গেইছে। একদিনের কামাই দিয়া একবেলার সবজি ভাত হওছে না। পেটের সাথে যুদ্ধ করি বাঁচুছি।’

হোসেন আলীর বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা পলাশবাড়ী গ্রামে। তারাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সামনে মহাসড়কের ধারে টংয়ের দোকানে চা-বিস্কুট বিক্রি করে সাত সদস্যদের সংসার চালান তিনি। আবাদি জমি না থাকায় চাল থেকে তরিতরকারি সবই কিনতে হয় তাঁকে।

হোসেন আলী বলেন, তাঁর চার ছেলে-মেয়ের সবাই স্কুলে ও কলেজে পড়ছে। তাদের লেখাপড়ার পেছনে মাসে অন্তত তিন হাজার টাকা খরচ হয়। আর সব মিলিয়ে পরিবারের খরচ লাগে মাসে প্রায় ১৮ হাজার টাকা। কিন্তু একদিকে যেমন সবকিছুর দাম বেড়েছে, আরেক দিকে তাঁর ব্যবসার লাভ কমে গেছে। দিন শেষে গড়ে ৩৫০ টাকার মতো লাভ থাকে তাঁর। মূলধন ভাঙিয়ে চলছেন। প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ হয়েছে বলে দাবি হোসেন আলীর।

হোসেন আলীর মতো অবস্থা মেনানগর গ্রামের ভোলা মিয়ার (৩৫)। আগে রংপুর শহরে ভাড়ায় অটো চালান তিনি। আগের মতো আয় নেই। সারা দিনে ৭০০ টাকা আয় করলে এর মধ্যে ৪০০ টাকা দিতে হয় অটোর মালিককে। ইকরচালী বাজারে চাল কিনতে আসা ভোলা মিয়া বলেন, ‘দুইটা ভাত লবণ দিয়া খায়া বাঁচব, সেই উপায় নাই। হাট ঘুরলেই শুনি চালের দাম বাড়ছে। আইজ ৬৫ টাকা কেজি। টিভিত শুনোছি দেশেত ধানের অভাব নাই, বাম্পার ফলন হইছে। তাও কেনে চালের এত দাম? সরকার এ্যাগলাত কি নজর দেওছে না?’

এমন আক্ষেপ শুধু হোসেন আলী ও ভোলা মিয়ার নয়। রংপুরের তারাগঞ্জের নিম্ন আয়ের অনেক শ্রমজীবী মানুষই তাঁদের আক্ষেপের কথা বলেন। গত ছয় মাসে চাল, ডাল, তেলসহ অন্যান্য পণ্যের দাম কয়েক দফা বেড়েছে। কিন্তু মানুষের আয় বাড়েনি। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি কষ্টে আছেন। অনেক পরিবারকে তিন বেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বাজারের নিত্যপণ্যের দাম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত কয়েক মাসে তেলের দাম ১৬৬ টাকা থেকে বেড়ে ১৯২ টাকা, চালের দাম ৫৫ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা, ডালের দাম ১২৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা হয়েছে। এ ছাড়া চিনি, মাছ, মাংস ও শাকসবজির দামও বেশ চড়া। বেড়েছে গ্যাস ও খড়ির দামও। এতে দরিদ্র পরিবারগুলোকে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে।

ইকরচালী গ্রামের বিধবা নারী মনোয়ারা বেগম পুরুষদের সঙ্গে মাঠে কাজ করলেও তাঁর মজুরি অর্ধেক। সারা দিনে মাঠে পুড়ে একই কাজ করে একজন পুরুষ শ্রমিক পান ৪০০ টাকা আর মনোয়ারা পান ২০০ টাকা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘যে ২০০ টাকা কামাই হয়। তাক দিয়া চাল সবজি কিনতে শেষ। তেল, মসল্লাত টানাটানি নাগে। মাঝেমধ্যে ধারদেনাও করি চলিবার নাগে। ছয় মাস থাকি ছাওয়া (সন্তান) দুইটা মাংস খাবার চাইলেও মাছের আনা ঠুমা (পিচ) দিবার পাও নাই। বাজারত চাল, ডাল, জিনিসের যে দাম। দুই বেলা খেয়া বাচির পাওছি, ছাওয়ার শখ কেমন করি পূরণ হয়?’