
গিয়াস উদ্দিন (৫৭) ও শিশু মিয়া (৫০), পেশায় স্বর্ণডুবুরি। পুকুর-জলাশয়ে কারও সোনা-রুপা হারিয়ে গেলে তাঁরা উদ্ধার করে দেন। এখন থাকেন কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বীরতলা গ্রামের বেদেপল্লিতে। তবে আদি নিবাস মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার বিক্রমপুর গ্রামে। গিয়াস উদ্দিন দীর্ঘ ৩৫ বছর এবং শিশু মিয়া ২৮ বছর ধরে এ কাজ করছেন।
গিয়াস উদ্দিন বলেন, তাঁর পরিবারে স্ত্রী রাজিয়া বেগম, মেয়ে রোমানা আক্তার ও সোনিয়া আক্তার, ছেলে রাজীব মিয়া ও সাকিবুল হাসান আছেন। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। দুই ছেলে কাজ করেন। তিনি বীরতলা গ্রামে ৭ শতাংশ জমি কিনে আধা পাকা বাড়ি করেছেন।
শিশু মিয়া বলেন, তাঁর পরিবারে স্ত্রী খুকি আক্তার, ছেলে ওমর ফারুক ও জাফর মিয়া, মেয়ে সুবর্ণা আক্তার ও হালিমা আক্তার আছে। দুই ছেলে কাজ করেন। মেয়ে সুবর্ণা আক্তারের বিয়ে হয়েছে এবং আরেক মেয়ে হালিমা আক্তার সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। তিনিও ৭ শতাংশ জায়গা কিনে আধা পাকা বাড়ি বানিয়েছেন।
গতকাল রোববার দুপুরে দাউদকান্দি উপজেলার শহীদনগরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে একটি চায়ের দোকানের সামনে দেখা হয় দুই স্বর্ণডুবুরির সঙ্গে। তাঁরা সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র দোকানের সামনে রেখে ভেতরে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। আলাপে জানালেন, সোনা-রুপা খোঁজা ডুবুরিরা অধিকাংশই যাযাবর, বেদে সম্প্রদায়ের। তাঁরা সাপখেলা দেখান, সোনা–রুপা খোঁজেন আর ফেরি করে কড়ি-মালা বিক্রি করেন।
গিয়াস উদ্দিন ও শিশু মিয়া বলেন, তাঁরা কড়ি, ঘুঙুর, বালা, মালা, মাদুলিসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে বের হন। সঙ্গে থাকে সোনা–রুপার খোঁজার সামগ্রী। গ্রামে গ্রামে তাঁরা এসব বিক্রি করতে করতে সোনা-রুপা খোঁজার কাজ পান। সোনা খোঁজার আয় ভাগ্যের ওপর, লটারির মতো। কড়ি-মালা কমবেশি বিক্রি হয়। এতে প্রতিদিন আয় হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। তবে সোনা-রুপা খোঁজার লাভটা অন্য রকম। একটা গয়না তুলে দিলে বড় অঙ্কের টাকা পাওয়া যায়। হিসাব করে প্রতি হাজারে ২০০ টাকা পাওয়া যায়। খুঁজে না পাওয়া গেলে পারিশ্রমিক বাবদ দু–তিন শ টাকা পাওয়া যায়।
দুজন জানান, এ কাজের আয়েই তাঁদের সংসার চলে। নদী-নালা-জলাশয়-পুকুরনির্ভর জীবিকা তাঁদের। বর্তমানে পুকুর-জলাশয় দিন দিন ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নারীরাও আগের মতো পুকুরে গোসল করেন না। বর্তমানে এ কাজের আয় কমে গেছে।
সোনা-রুপা খোঁজার বিষয়ে গিয়াস উদ্দিন ও শিশু মিয়া বলেন, গলার মালা, নাকফুল, কানের গয়না ঘাট এলাকায় পড়লে তাঁরা তুলে দেন। মাথার ওপর দু-তিন ফুট পানি হলেও তাঁরা বের করতে পারেন। তবে সব সময় ডুব দিয়ে কাজ হয় না। যেখানে গয়নাটা পড়েছে, তার চারপাশের মাটি আঁচড়া দিয়ে টেনে টেনে কাছে আনেন। তারপর বিশেষ ঝুড়ি দিয়ে কাদা তোলেন। সেই কাদা ওই বিশেষ ঝুড়ির মধ্যে ধোয়ার পরে সোনা বা রুপা যদি সত্যিই পুকুরে পড়ে থাকে, তাহলে পাওয়া যায়।
হারানো জিনিস খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে সফলতা মেলে কেমন—এমন প্রশ্নের জবাবে গিয়াস উদ্দিন ও শিশু মিয়া বলেন, অন্য জায়গায় ফেলে পানিতে পড়ার কথা বললে তো আর পাওয়া যায় না। পানিতে হারালে নিশ্চিত পাওয়া যায়। এ কাজে তাঁদের সুনাম আছে। এ জন্য মানুষ তাঁদের ডাকেন।