
নিজের গ্রামে চা–নাশতার দোকান করে সংসার চালাতেন তাজুল ইসলাম (৫৫)। বাকি-বকেয়ায় বিক্রি কমে যাওয়ায় পুঁজি হারিয়ে দোকান ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। পরে উপজেলা সদরের একটি রেস্তোরাঁয় দৈনিক মজুরিতে কাজ নেন। এখন দুই ঘণ্টা বিরতি দিয়ে ভোর ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত রেস্তোরাঁটিতে খাটেন। তবু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে এখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন এই রেস্তোরাঁশ্রমিক। তাজুল ইসলাম চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মঘাদিয়া ইউনিয়নের তিন ঘরিয়াটোলা গ্রামের বাসিন্দা।
সোমবার দুপুরে মিরসরাই উপজেলা সদরের কোর্ট রোডে তাঁর কর্মস্থল হামিম রেস্তোরাঁয় বসে কথা হয় তাজুল ইসলামের সঙ্গে। হাস্যোজ্জ্বল তাজুল কিছুটা শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাঁর জন্মগতভাবে বাঁকা হয়ে যাওয়া বাঁ পায়ে জোর কম। তিনি জানান, স্ত্রী কুলসুম বেগম, এক ছেলে আর দুই মেয়ে নিয়ে তাঁর সংসার। ভালো বর পেয়ে বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে পড়ছে অন্য উপজেলার একটি মাদ্রাসায়। আর্থিক অনটনে ছোট মেয়েটির পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে।
তাজুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন হোটেল রেস্তোরাঁয় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। কারিগরি জ্ঞান অর্জন করে একসময় গ্রামে বাড়ির পাশে নিজেই দেন একটি চা–নাশতার দোকান। শুরুতে সে দোকানে বেচাবিক্রি জমজমাট থাকলেও অতিরিক্ত বাকি-বকেয়ার কারণে দিন দিন বিক্রি কমে যায়। লোকসান গুনে গুনে কয়েক বছর পর বাধ্য হয়ে সে দোকান বন্ধ করেন। আয়রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আবার উপজেলা সদরের একটি রেস্তোরাঁয় কাজ নেন তিনি। এখানে দায়িত্ব পান রান্নাঘর থেকে খাবার পরিবেশন করার।
এই রেস্তোরাঁশ্রমিক বলেন, এখানে ভোর ৬টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত আবার মধ্যে দুই ঘণ্টা বিরতি দিয়ে বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত টানা দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়। কোমরের হাড় ক্ষয়ের সমস্যা থাকায় মাঝেমধ্যে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাজুল ইসলাম বলেন, রেস্তোরাঁর মালিক খাবারের দায়িত্ব বহন করে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি দেন। এই টাকায় নিজের জন্য ওষুধ কেনা, ছেলের পড়াশোনার খরচ পাঠানোসহ সংসারের সব ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তার ওপর এখন তেলের সংকটে বাজারে সবকিছুর দাম বেড়েছে। এখন এ আয়ে আর কোনোভাবেই ব্যয় মিটছে না। ইচ্ছা করলেও পরিবারের জন্য ভালো–মন্দ কিছু কেনা যায় না।
জানতে চাইলে তাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার স্ত্রী সরকারি খাদ্যসহায়তার কিছু চাল পায়। আগে সে চাল আর আমার আয়ের টাকায় টেনেটুনে দিন চলে যেত। কিন্তু এখন বাজারে জিনিসের দাম অনেক বেড়ে গেছে। স্ত্রী–সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে দিনরাত খাটি, তবু সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। বর্ষায় আমার ঘরের ভেতর পানি পড়ে। প্রতিবছর স্বপ্ন দেখি, সংসারের খরচ বাঁচিয়ে জরাজীর্ণ ঘরের চালাটা মেরামত করব। অর্থের টানাটানিতে সে স্বপ্ন আর পূরণ হয় না। এখন অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, ঘর মেরামতের স্বপ্ন দেখারও সাহস হয় না আমার।’