ওয়ার্ল্ড অল-স্টাইল কারাতে ফেডারেশন আয়োজিত ‘ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ-২০২৬’-এ স্বর্ণপদক অর্জন করা কুমিল্লার মোফাজ্জল মাহিন চৌধুরী
ওয়ার্ল্ড অল-স্টাইল কারাতে ফেডারেশন আয়োজিত ‘ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ-২০২৬’-এ স্বর্ণপদক অর্জন করা কুমিল্লার মোফাজ্জল মাহিন চৌধুরী

কারাতের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণ জিতে উচ্ছ্বসিত কুমিল্লার মাহিন

ইউরোপের বুকে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ওড়ালেন কুমিল্লার মোফাজ্জল মাহিন চৌধুরী। আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড অল-স্টাইল কারাতে ফেডারেশনের ‘ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ-২০২৬’-এ একক নিহন উন্মুক্ত কুমিতে ইভেন্টে স্বর্ণপদক জিতেছেন তিনি। শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যই নয়, তাঁর নেতৃত্বে দলগত ইভেন্টে রৌপ্যপদকও অর্জন করেছে বাংলাদেশ দল।

গত ২৫ ও ২৬ এপ্রিল আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। আসরে স্বাগতিক আর্মেনিয়াসহ ইরান, রাশিয়া, রোমানিয়া ও ইথিওপিয়ার প্রতিযোগীরা অংশ নেন। চার সদস্যের বাংলাদেশ দলে মাহিনের সঙ্গে ছিলেন মো. হাবিব সরকার, মাসুক মেহেদী ও মো. জাহিদুল ইসলাম জুবায়ের। দলের ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. জসিম উদ্দিন।  তাঁদের মধ্যে মাহিন, হাবিব ও মাসুক কুমিল্লার বাসিন্দা এবং জাহিদুল ঢাকার।

সম্প্রতি দেশে ফিরে সোমবার (৪ মে) প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন মোফাজ্জল মাহিন চৌধুরী। সেখানে তাঁর এই সাফল্যের গল্প, দীর্ঘ প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা জানিয়েছেন।

মাহিনের বাড়ি কুমিল্লা নগরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বাগিচাগাঁও এলাকায়। তাঁর বাবার নাম তামজিদ ইভান চৌধুরী। মাহিন তাঁর বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। কুমিল্লা হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও কুমিল্লা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করা মাহিন বর্তমানে ‘দ্য রয়েল কারাতে-দো অ্যাসোসিয়েশনের’ সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগেও ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যের রিচমন্ডে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কারাতে প্রতিযোগিতায় একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে স্বর্ণপদক এবং ২০২৪ সালে ভারতে এশিয়ান সাবাতে চ্যাম্পিয়নশিপে রানারআপ হন।

সাফল্যের অনুভূতি জানিয়ে মাহিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদেশের মাটিতে যখন বাংলাদেশের নাম ঘোষণা করা হয়, সেই মুহূর্তটি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। দেশের জন্য স্বর্ণপদক জয় করতে পারা আমার জীবনের অন্যতম বড় সার্থকতা। আমি আশাবাদী এই অর্জন কুমিল্লার তরুণদের কারাতে শিখতে অনুপ্রাণিত করবে। কারাতে শুধু একটি খেলা নয়, এটি চমৎকার আত্মরক্ষামূলক কৌশল। আমি চাই দেশের ছাত্রছাত্রীরা এটি আয়ত্ত করে নিজেদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলুক।’

মাহিনের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একটি মজবুত পারিবারিক ঐতিহ্য। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাহিন কারাতের দীক্ষা পেয়েছেন অনেকটা জন্মসূত্রেই। তাঁর মা ছিলেন একজন ব্ল্যাকবেল্টধারী কারাতে অ্যাথলেট। মাহিনের হাতেখড়ি এবং প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন তাঁর নানা মোখলেছুর রহমান (আবু), যিনি কুমিল্লার একজন স্বনামধন্য কারাতে শিক্ষক। মূলত নানার কঠোর শাসন আর নিবিড় প্রশিক্ষণেই বিশ্বমঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করেছেন মাহিন।

মাহিন চৌধুরী বলেন, ‘আমার এই দীর্ঘ পথচলায় আফসু ডেভেলপারস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. একরামুল হক স্যার সব সময় ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। আমি তাঁর প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। আগামীতে আরও বড় কোনো শিরোপা যেন দেশের জন্য বয়ে আনতে পারি, সে জন্য আমি দেশবাসীর দোয়া চাই।’

বর্তমানে মাহিন নিজে একজন দক্ষ প্রশিক্ষক হিসেবেও কুমিল্লা নগরে কাজ করছেন। কুমিল্লাকে কারাতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের জয়যাত্রা অব্যাহত রাখাই এখন তাঁর মূল লক্ষ্য।

সন্তানের এমন সাফল্যে মাহিনের মা ফয়জুন্নেছা (মুন্নি) আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘আমি নিজে কারাতে করতাম, তাই সব সময় স্বপ্ন দেখতাম আমার ছেলেও একদিন এই খেলাধুলার মাধ্যমে দেশকে গর্বিত করবে। ওর নানা ছোটবেলা থেকে যেভাবে গড়ে তুলেছেন, আজ সেই পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। ওর বাবা এবং আমাদের পরিবারের সবাই চাই মাহিন আরও অনেক দূর এগিয়ে যাক।’