প্রাচীন তেঁতুলগাছকে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবসের আয়োজন। আজ বৃহস্পতিবার রাজশাহীর তানোর উপজেলার মোহর গ্রামে
প্রাচীন তেঁতুলগাছকে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবসের আয়োজন। আজ বৃহস্পতিবার রাজশাহীর তানোর উপজেলার মোহর গ্রামে

তানোরে প্রাচীন তেঁতুলগাছ ঘিরে কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য উৎসব

তেঁতুলগাছের বয়স প্রায় সাড়ে তিন শ বছর। সেই গাছের গায়ে ঝুলছে নদী, পাখি, গাছ, মাটি ও বাস্তুতন্ত্রের নানা উপাদানের প্ল্যাকার্ড। পাখি বলছে, গাছ আমার নিরাপদ আশ্রয়; কেঁচো বলছে, আমি গাছের মাটিকে উর্বর করে জীবন বাঁচিয়ে রাখি এবং মাটি বলছে, গাছের ঝরা পাতা আমাকে উর্বর করে, জন্ম দেয় নতুন প্রাণের।

এভাবেই আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবস উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার রাজশাহীর তানোর উপজেলার মোহর গ্রামে এই তেঁতুলগাছের নিচে ‘একটি গাছ, একটি বাস্তুসংস্থান’ প্রতিপাদ্যে ‘কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য উৎসব’–এর আয়োজন করা হয়।

আগামীকাল শুক্রবার আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবস সামনে রেখে ব্যতিক্রমী এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তানোর উপজেলা জনসংগঠন সমন্বয় কমিটি, গ্রীণ কোয়ালিশন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক)।

আয়োজকেরা জানান, এ উৎসবের মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে প্রকৃতির এই আন্তসম্পর্ক নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং দেশীয় প্রাণবৈচিত্র্য ও কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা সংরক্ষণের গুরুত্ব¡তুলে ধরা। একটি গাছের শিকড়ের নিচে যেমন কোটি কোটি অণুজীবের বসবাস, তেমনি তার ডালপালায় আশ্রয় নেয় পাখি, কাঠবিড়ালি, মৌমাছিসহ নানা উপকারী পোকামাকড়। একটি গাছ শুধু গাছ নয়—এটি জীবন, এটি কৃষি, এটি পৃথিবী। একটি প্রাচীন গাছকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে একটি বাস্তুতন্ত্র।
উৎসবে ১৪০ প্রজাতির ধান, সবজি ও গমবীজ, জলজ বাস্তুতন্ত্রের উপাদান শাপলা, শালুক, পদ্ম, শামুক, ঝিনুক, মাছ ধরার দেশীয় পরিবেশবান্ধব উপকরণ, ৪৫ প্রজাতির অচাষকৃত শাকসবজি, বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন নদীর পানি, বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটিবৈচিত্র্য, পরিবেশবান্ধব চুলা উপস্থাপন করা হয়। যার মাধ্যমে পরিবেশের সব উপাদানের মধ্য যে সম্পর্ক বিদ্যমান, তা উপস্থাপন করা হয় এবং উৎসবে অংশগ্রহণকারী কিষান-কিষানিরা নিজেদের মধ্যে বীজ বিনিময় করেন।

বারসিকের প্রোগ্রাম অফিসার অমৃত সরকারের পরিচালনায় কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্য উৎসবের ধারণাপত্র ও আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবসের গুরুত্ব উপস্থাপন করেন বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘প্রাণবৈচিত্র্য শুধু প্রাণী বা বনভূমির প্রশ্ন নয়; এটি খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির মূলভিত্তি। বর্তমানে নেচার ইকোনমি বা প্রকৃতিনির্ভর অর্থনীতিকে বৈশ্বিক উন্নয়নের ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কৃষি, বন, মৎস্য, নির্মাণ এবং খাদ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক খাতগুলো সরাসরি জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের জৈবিক সম্পদকে সম্মান করা, সুরক্ষা প্রদান করা এবং পুনরুদ্ধার করা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।’

উৎসবে তানোর উপজেলার ১০টি গ্রামের কিষান-কিষানি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, তরুণ-যুব সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন। প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণের যে উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছে, তা আলোচনার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন বক্তারা।

তানোর উপজেলার দুবইল গ্রামের কৃষক ও বরেন্দ্র বীজ ব্যাংকের সভাপতি মো. জায়দুর রহমান বলেন, ‘আমি দেশি ধানবৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতিবছর আউশ, আমন, রোরো মৌসুম ১৭০ জাতের ধান চাষ করি। কৃষকদের মধ্যে সেই জাতগুলো বিনিময় করি। কারণ, এ ধানের জাতগুলো হারিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতির নবান্ন উৎসব।’

উপজেলার জগদীশপুর গ্রামের কিষানি মোসা. সেতারা বেগম বলেন, ‘আগে বড়ির আনাচকানাচে অনেক অচাষকৃত শাক পাওয়া যেত, এখন আর পাওয়া যায় না। আমি আমার বাড়িতে ৩০ প্রজাতির অচাষকৃত শাকের চাষ করি, যা আমাকে পুষ্টি দেয়, পাশাপাশি শাকগুলো হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়। আমি বিষমুক্ত সবজি চাষ করি এবং বিষমুক্ত খাবার খাই।’

তানোর উপজেলার মন্ডুমালা গ্রামের কিষানি মিস মনিকা টুডু বলেন, ‘আমাদের খাদ্য উপযোগী অনেক শামুক, ঝিনুক ও জলজ প্রাণী হারিয়ে গেছে, যা আমাদের খাবার ও সংস্কৃতির অংশ। আমি একটি পুকুরে শামুক-ঝিনুক, শাপলা, শালুক সংরক্ষণে কাজ করছি। এর মাধ্যমে টিকে থাকবে জলজ প্রাণবৈচিত্র্য।’

তানোর উপজেলার গোল্লাপাড়া গ্রামের স্বশিক্ষিত কৃষিবিজ্ঞানী নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘আগামীর জন্য আমাদের প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে হবে। ফসলের জমিতে অবাধে কীটনাশক প্রয়োগ করা যাবে না। তানোরের প্রাণবৈচিত্র্যের আধার হিসেবে পরিচিত বিলকুমারী বিলের পাশে ফসল চাষ ও মাত্রাতিরিক্তভাবে কীটনাশক-রাসায়নিক সার প্রয়োগের কারণে অনেক মাছের জাত ও জলজ প্রাণ বিলুপ্ত হয়েছে। আমরা গ্রীণ কোয়ালিশন গঠন করে নানা পর্যায়ে আলোচনা ও সভা করছি, যাতে বিলকুমারী ও বিলজোয়ানাতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করা যায়।’