সাক্ষ্য দিতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনের অনীহা। সহিংসতার ১৮ মামলার কোনোটির বিচার শুরু হয়নি।

কক্সবাজারে রামুর বৌদ্ধবিহারে হামলার ১০ বছর পার হতে চললেও খোঁজ মেলেনি সেই উত্তম কুমার বড়ুয়ার, যাঁর ফেসবুক আইডি থেকে ছড়ানো পোস্টকে কেন্দ্র করে এই সহিংসতা হয়।
একমাত্র ছেলেকে নিয়ে এখনো পালিয়ে বেড়াচ্ছেন উত্তমের স্ত্রী রিতা বড়ুয়া। এদিকে বিচার শুরু হয়নি সেই সময়ে করা ১৮টি মামলারও। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন ‘নতুন বিপদের’ শঙ্কায় কারও বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে চান না।
রামুর ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের হাইটুপী গ্রামে উত্তমের বাড়ি। বিয়ের পর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে মেরংলোয়া গ্রামে ভাড়া বাসায় আলাদা সংসার পাতেন উত্তম।
গতকাল বুধবার সকালে সেই বাসায় গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে উত্তমের স্ত্রী রিতা বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, তিনি চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আছেন। উত্তম কোথায় জানতে চাইলে রিতা বড়ুয়া বলেন, ‘জানি না। সম্ভবত বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে এত দিনে যোগাযোগ হতো। অন্তত একবার হলেও ছেলের খোঁজ নিত।’
উত্তম যখন বাড়ি থেকে পালিয়ে যান, তখন তাঁর একমাত্র ছেলের বয়স ছিল আড়াই বছর। রিতা বড়ুয়া বলেন, ‘ছেলেটা বড় হচ্ছে, বারবার বাবার কথা জিজ্ঞাসা করে, কিন্তু কিছুই বলতে পারি না।’
রিতা বড়ুয়া অভিযোগ করে বলেন, উত্তমের কারণে তিনি সবার রোষানলে পড়েন। জীবিকার জন্য চাকরিও পাওয়া যায় না। এখন কিছু ছেলেমেয়েকে পড়িয়ে যা আয় হচ্ছে, তা দিয়ে চলছে টানাপোড়েনের সংসার।
হাইটুপী গ্রামে ছোট্ট টিনের ঘরে প্রতিবন্ধী এক মেয়েকে নিয়ে থাকেন উত্তম বড়ুয়ার বৃদ্ধ মা মাধু বড়ুয়া (৫৪)। ছেলের প্রসঙ্গ তুলতেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘উত্তমের জন্য মন জ্বলে, কিন্তু খুঁজে পাই না।’
পুলিশ ও আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে উত্তম কুমার বড়ুয়া নামের এক ব্যক্তির ফেসবুক পেজে পবিত্র কোরআন অবমাননার কয়েকটি ছবি প্রকাশ করা হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যরাতে দুর্বৃত্তরা হামলা ও অগ্নিসংযোগ চালিয়ে ধ্বংস করে রামুর ১২টি প্রাচীন বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধদের ৩৪টি বসতবাড়ি। পরের দিন অগ্নিসংযোগ করা হয় উখিয়া ও টেকনাফের আরও সাতটি বৌদ্ধবিহার ও হিন্দুমন্দিরে। এ ঘটনার মামলাগুলো কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতসহ বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন। মামলার ৯৯৫ জন আসামি জামিনে রয়েছেন।
রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ( ওসি) মো. আনোয়ারুল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর মামলার প্রধান আসামি উত্তম কুমার বড়ুয়া। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক। কোথায় আছে পুলিশের জানা নেই।
রামু কেন্দ্রীয় মহাসীমা বিহারের পরিচালক শীলপ্রিয় থের বলেন, ‘সেদিন যাঁরা হামলা চালিয়েছিল, তাঁদের কারও শাস্তি হয়নি। তাঁদের মামলার আসামিও করা হয়নি। আমরা কার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেব?’
সীমা বিহারের আধা কিলোমিটার দূরত্বে লালচিং বৌদ্ধবিহার। পাশে সাদাচিং বৌদ্ধবিহার। দুপুরে বিহার দুটি ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মে চলছে।
আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ফরিদুল আলম বলেন, ১৮ মামলায় ১৬৭ সাক্ষীর অধিকাংশই বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের। একাধিকবার নোটিশ এবং তাগাদা দেওয়ার পরও কেউ সাক্ষ্য দিতে আদালতে আসছেন না। আলোচিত ওই হামলার ঘটনায় অন্তত একটি মামলার যেন বিচার হয়, সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান এই আইনজীবী।