ভিজিএফ কার্ডের বরাদ্দ নিয়ে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার মদাতি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলমের (বিপ্লব) সঙ্গে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শামসুজ্জামানের (সবুজ) মুঠোফোনে কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
শামসুজ্জামান লালমনিরহাট-২ (আদিতমারী-কালীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য রোকন উদ্দিনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন। কথোপকথনে ভিজিএফ কার্ডের বরাদ্দ নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। একই বিষয় নিয়ে উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক বিধান চন্দ্র রায়ের সঙ্গেও ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীরের আরেকটি কথোপকথন ফাঁস হয়েছে।
এদিকে এ ঘটনার পর ওই ইউপি চেয়ারম্যান সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। গত বুধবার রাতে নিজ বাড়ি থেকে আটকের পর বৃহস্পতিবার ওই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। তাঁর স্ত্রীর অভিযোগ, ভিজিএফ কার্ডে এমপির থার্টি পার্সেন্ট নিয়ে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে মোবাইলে কথার জেরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় সূত্রের ভাষ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মদাতি ইউনিয়নে আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দুস্থ–অতি দরিদ্র ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারকে ৩ হাজার ৩৪৫টি ভিজিএফ কার্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ওই কার্ড থেকে সংসদ সদস্যের ‘থার্টি পারসেন্ট’ হিসাবে ১ হাজার ৩টি কার্ডের দাবি করেন বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান।
ভিজিএফ কার্ড নিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে শামসুজ্জামানের কথোপকথনের অডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে কথোপকথনের একপর্যায়ে বিএনপি নেতা শামসুজ্জামানকে বলতে শোনা যায়, ‘...যা–ই হোক, আপনি এমপি সাহেবের থার্টি পারসেন্ট আমাদের প্রতিনিধির দায়িত্বে বুঝাইয়া দিছেন কি?’ তখন জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘না, থার্টি পারসেন্ট নয়। আমরা মিটিংয়ে বসলাম তো। আপনার বিধান দার কাছ থেকে প্রতিনিধি নিছিলাম...।’ তখন শামসুজ্জামান বলেন, ‘আমাদেরটা নিয়ে আপনারা মিটিং করবেন কেন?’
শামসুজ্জামান আরও বলেন, ‘আপনি ১ হাজার ৩টা টোকেন বুঝাইয়া দিবেন। বিনা ভোটের এমপি যখন ছিল, তাদের তো সুন্দরভাবে বুঝাইয়া দিছেন। আমরা কিন্তু বিনা ভোটে হই নাই। অতীত কিন্তু ভুলি নাই।’ তিনি জাহাঙ্গীর হোসেনকে আরও বলেন, ‘আপনি কিসের মিটিং করেন আমাদের বরাদ্দ নিয়ে? আপনি ১ হাজার ৩টা আজকে বোঝায় দিবেন।’
জানতে চাইলে বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে মোবাইল রেকর্ডিং নিয়ে। এমপি সাহেবের প্রতিনিধিরা যাঁদের তালিকা দিতে চেয়েছেন, তাঁরা অবশ্যই হতদরিদ্র। তাঁরা সশরীর গিয়ে চাল (ভিজিএফের চাল) ওঠাবেন। কোনো অবস্থাতেই একজন একাধিক সুবিধাভোগীর নামে চাল ওঠাতে পারবেন না। যেসব চেয়ারম্যান ও মেম্বার শত শত সুবিধাভোগীর চাল একাই উঠিয়ে আত্মসাৎ করে, তারা অন্যায় কাজ করার সুযোগবঞ্চিত হওয়ার কারণে ষড়যন্ত্র করছে।’
অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বিধান চন্দ্র রায়ের মুঠোফোনে যোগাযোগ করে ছড়িয়ে পড়া কথোপকথনের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সাড়া দেননি।
এদিকে কথোপকথনের অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর গত বুধবার রাতে ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ইউপি চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ইউপি চেয়ারম্যানকে নির্দোষ দাবি করে তাঁর স্ত্রী রুমি বেগম বলেন, ভিজিএফ কার্ডে এমপির থার্টি পার্সেন্ট নিয়ে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে মোবাইলে কথার জেরে তাঁকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মামলার বাদী উপপরিদর্শক মো. হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তে প্রাপ্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসেবে ওই ব্যক্তিকে নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়েছে। এরপর তাঁকে এ–সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে বৃহস্পতিবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।