রাঙামাটির লংগদুতে মৃত হাতির পায়ের মাংস ও শুড় কেটে নেওয়া হয়।
রাঙামাটির লংগদুতে মৃত হাতির পায়ের মাংস ও শুড় কেটে নেওয়া হয়।

দুই বছর আগেও গুলি করা হয়েছিল, এবার মৃত্যুর পর কেটে নেওয়া হলো শুঁড় ও পা

মৃত হাতির পায়ের এক পাশ থেকে বুক পর্যন্ত কেটে নেওয়া হয়েছে। শুঁড়টিও নেই। রাঙামাটির লংগদু উপজেলার রাঙামাটির লংগদু উপজেলার ভাসান্যা আদাম ইউনিয়নের পকসাপাড়ায় গতকাল রোববার মৃত অবস্থায় ৬০ বছর বয়সী পুরুষ হাতিটিকে পড়ে থাকতে দেখেন বন বিভাগের এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের সদস্যরা। সেখানে শোকে কাতর একটি স্ত্রী হাতি পাহারা দিচ্ছিল মৃত পুরুষ সঙ্গীকে। মানুষজনকে কাছে ঘেঁষতে দেয়নি স্ত্রী হাতিটি। কিন্তু স্ত্রী হাতি সরে যেতেই রাতের অন্ধকারে মৃত পুরুষ হাতিটির শুঁড় এবং পেছনের পায়ের বড় একটি অংশ কেটে নেয় দুর্বৃত্তরা।

বন বিভাগ জানিয়েছে, ওই এলাকার একমাত্র প্রজননক্ষম ছিল পুরুষ হাতিটি। দুই বছর আগেও এটিকে গুলি করেছিল একদল দুর্বৃত্ত। ওই সময় ধারালো বর্শা দিয়েও আঘাত করা হয়েছিল এটিকে। পরে বন বিভাগের চিকিৎসায় হাতিটি সুস্থ হলেও এর সংক্রমণ হয় আবারও। সেই সংক্রমণ থেকেই হাতিটির মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরও এটির মাংস কেটে নেওয়ার দৃশ্য গতকাল রাতে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য দেন অনেকে।

রাঙামাটি সদর থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে লংগদুর ভাসান্যা আদামের পকসাপাড়ার অবস্থান। আজ সোমবার দুপুরে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হাতিটি এখনো ওই জায়গায় পড়েছিল। হাতির মাংস কেটে নেওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ ফেসবুক ব্যবহারকারীরা বন বিভাগের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মৃত হাতিটি উদ্ধার করতে না পারাকে প্রতিষ্ঠানটির গাফিলতি হিসেবেই দেখছেন তাঁরা।

এলাকার প্রজননক্ষম একমাত্র হাতি

হাতিটিকে যে সময় গুলি করা হয়, তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ছিলেন রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বর্তমানে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। হাতির মৃত্যুতে নিজের ফেসবুক পাতায় স্ট্যাটাস দেন তিনি। তিনি লেখেন, ‘লংগদুর পুরুষ হাতিটি ছিল মূলত ওই এলাকার ১৪টি হাতির মধ্যে একমাত্র ব্রিডিং ক্ষমতাসম্পন্ন বড় পুরুষ হাতি। একটি গোষ্ঠীর হাতে সে গুলিবিদ্ধ হয়েছেও কয়েকবার। তবে তাকে খুব দরকার ছিল।’

এই স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় রেজাউল করিম চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই পুরুষ হাতিটিকে গুলি করা হয়েছিল। ধারালো বর্শা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আঘাত করা হয়। তখন দুই দফা চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করেছিলেন। ২০২৩ সালের মে মাসে প্রথমে চিকিৎসা করা হলে সাময়িকভাবে কিছুটা সুস্থ হয়েছিল। পরে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। ২০২৪ আরেক দফা চিকিৎসা দেওয়া হলে পুরোপুরি সুস্থ হয়েছিল।

এই বন কর্মকর্তা জানান, লংগদুর এই পালে ১৪টি হাতি ছিল। তারা কখনো একসঙ্গে, কখনো উপদলে ভাগ হয়ে ঘুরে বেড়াত। মূলত খাবারের খোঁজে লোকালয়ে আসত। স্থানীয় লোকজন পুরুষ হাতিটিকে ছররা গুলি করে এবং বর্শা দিয়ে আঘাত করে। এলাকা থেকে তাড়ানোর জন্য এই নির্মম পথ বেছে নিয়েছিলেন লোকজন, যা কোনোভাবে উচিত হয়নি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ, কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) একদল পশু চিকিৎসক সম্মিলিতভাবে চিকিৎসা দিয়ে হাতিটিকে সুস্থ করেছিলেন বলে জানান রেজাউল করিম চৌধুরী।

৬০ বছর বয়সী পুরুষ হাতিটির প্রয়োজনীয়তা এবং হাতিদের জীবনযাপন নিয়ে ধারণা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, স্ত্রী হাতিরা পালের বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ হাতির সঙ্গে মিলিত হতে পছন্দ করে। এখন ওই পালে আরও পুরুষ হাতি রয়েছে। কিন্তু তারা এখনো মিলনের জন্য উপযুক্ত হয়নি।

শরীরের ছয় জায়গায় ছিল গভীর ক্ষত

মৃত্যু হওয়া পুরুষ হাতিটি বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিল। এটির শরীরের বিভিন্ন অংশে ছিল গভীর ক্ষত। চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মৃত হাতিটির শরীরের অন্তত ছয়টি জায়গায় গভীর ক্ষত পেয়েছেন। শরীরের পেছনের ডান পাশ, সামনের ডান ও বাঁ অংশ, সামনের বাঁ পায়ের জয়েন্টে ছিল ক্ষতগুলো। এর মধ্যে পায়ের জয়েন্টের জায়গায় ক্ষত এক হাত গভীর ছিল।

আহত এই হাতি সম্প্রতি দুই দফা চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় বলে জানান চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রফিকুজ্জামান শাহ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অসুস্থ অবস্থায় হাতিটিকে প্রথমে ২৩ ফেব্রুয়ারি এবং দ্বিতীয় দফায় ১০ এপ্রিল চিকিৎসা করা হয়। চিকিৎসাসেবা চলমান ছিল।

হাতিটির চিকিৎসাসেবা দেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) মেডিসিন ও সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক বিবেক চন্দ্র সূত্রধর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, হাতিটির বুকে দুটি ক্ষত এবং বাঁ পায়ের জয়েন্টে বেশি ক্ষত ছিল। শরীরের ক্ষত ভালো করা যেত, কিন্তু পায়ের ক্ষত বেশি হওয়ার কারণে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম।

ফেসবুকে ক্ষোভ

গতকাল ভোরে মৃতদেহ দেখা গেলেও ওই সময় হাতিটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ওই সময় হাতিটির পাশে একটি স্ত্রী হাতিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে স্থানীয় লোকজন স্ত্রী হাতিকে বালু-পাথর নিক্ষেপ এবং চিৎকার-চেঁচামেচি করে নানাভাবে বিরক্ত করার চেষ্টা করেন। স্ত্রী হাতিও তাঁদের দিকে তেড়ে যান।

এদিকে আজ দুপুরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মৃত পুরুষ হাতিটির শরীর থেকে মাংস কেটে নেওয়ার ছবি ছড়িয়ে পড়ে। হাতির শুঁড় ও পেছনের ঊরু কেটে নিয়েছে অজ্ঞাত লোকজন। এভাবে মাংস কেটে নিয়ে যাওয়ায় বন বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মৃত পুরুষ হাতির মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে পাহারা দেয় স্ত্রী হাতি। স্ত্রী হাতি সরে যাওয়ার পর এটির শুড় আর পা কেটে নেওয়া হয়

হাতির ক্ষতবিক্ষত ছবি ফেসবুকে দিয়ে রিকোর্স চাকমা নামের একজন লিখেছেন ‘আমরা মানুষ হব কবে? ভিডিওটি যতবার দেখতেছি, ততবার নিজেকে ধরে রাখতে পারতেছি না। মানুষ এত জঘন্য। এটা কীভাবে সম্ভব। গতকাল রাঙামাটির লংগদুতে মৃত পুরুষ হাতিটির শুঁড় ও পায়ের মাংস রাতের অন্ধকারে কে বা কারা কেটে নিয়ে গেছে। বন বিভাগের দায়িত্বশীলরা কোথায় গেল?’

সমীর মল্লিক নামের আরেকজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘রাঙামাটির লংগদুতে মৃত হাতির পায়ের মাংস ও শুঁড় কেটে নিয়েছে মানুষরূপী কিছু হায়েনা! এর চেয়ে বীভৎস ঘটনা আর কি হতে পারে? গতকালই (রোববার) আমি লিখেছিলাম থেকে মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে শোকে কাতর সঙ্গী হাতিটিকে উত্ত্যক্ত করছে, ঢিল মারছে, লাঠি নিয়ে তেড়ে আসছে। কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। রাতের বেলায় এসে দুর্বৃত্তরা হাতির শরীরের অংশ কেটে নিয়ে গেছে বন বিভাগ ও ইআরটি (এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম) সদস্যরা কোথায় গেল?’

যোগাযোগ করা হলে আজ দুপুরে পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো রফিকুজ্জামান শাহ প্রথম আলোকে বলেন, মৃত হাতিটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বন বিভাগ ও ভেটেরিনারি টিম সেখানে গেছে। হাতিটির ময়নাতদন্ত শেষে মাটিচাপা দেওয়া হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায় হাতির মাংস ও শুঁড় কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এমন ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। এ বিষয়টি জানতে চাইলে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জানান, ‘গতকাল (রোববার) রাতে বৃষ্টি হওয়ার কারণে মানুষজন থাকার পরিবেশ ছিল না। ছোট হাতিটা সরে যাওয়ায় রাতের আঁধারে কে বা কারা হাতির মাংস কেটে নিয়ে গেছে সেটি জানা নেই। মানুষজন এত জঘন্য হয়ে গেছে বলার মতো না। এখানে আমাদের করণীয় কি আছে বলেন তো?’