গ্রামে শিক্ষা ও প্রযুক্তির আলো ছড়িয়ে দিতেই গড়ে তোলা হয়েছে ‘চুনতি লাইটহাউস’। এর যাত্রা শুরু হয় ২০২২ সালের মে মাসে। ৮ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত ‘চুনতি লাইটহাউসে’ রয়েছে ১৭টি কম্পিউটার। সেখানে প্রতিদিন কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
দরিদ্র কৃষকের ছেলে সাঈদুর রহমান (১৭), মাদ্রাসায় পড়ে। অন্য অনেক কিশোরের মতো তারও স্বপ্ন স্বাবলম্বী হওয়া। সেই স্বপ্ন পূরণে সে নিতে চেয়েছিল কম্পিউটার–বিষয়ক প্রশিক্ষণ। কিন্তু সবচেয়ে কাছের প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি ছিল বাড়ি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। কোর্স ফি ও যাতায়াত খরচ মিলিয়ে সেটি তার পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব ছিল না। তবে এখন আর সেই বাধা নেই। নিজের গ্রামেই সে বিনা খরচে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
সাঈদুরের বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার প্রত্যন্ত চুনতি গ্রামে। উপজেলা সদরের প্রশিক্ষণকেন্দ্রে অফিস ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনের কোর্স করতে খরচ পড়ত তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যোগ হতো নিয়মিত যাতায়াত ব্যয়। ফলে আগ্রহ থাকলেও কম্পিউটার শেখা হচ্ছিল না তার। কিছুদিন আগে বন্ধুদের কাছ থেকে সে জানতে পারে, এলাকাতেই ‘চুনতি লাইটহাউস’ নামে একটি গ্রন্থাগার ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে উঠেছে, যেখানে বিনা মূল্যে কম্পিউটার শেখানো হয়। এরপরই সেখানে ‘বেসিক কম্পিউটার’ কোর্সে ভর্তি হয় সে।
সাঈদুর রহমান প্রথম আলোকে বলে, ‘কম্পিউটার শেখার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু অর্থাভাবে উপজেলা সদরে গিয়ে শেখা সম্ভব হয়নি। এখন বাড়ির কাছেই বিনা মূল্যে শিখছি। বাংলা ও ইংরেজি টাইপিং প্রায় শিখে ফেলেছি। কোর্স শেষ করে ছোট একটা চাকরি করতে চাই, যাতে নিজের পড়ালেখার পাশাপাশি পরিবারের খরচও চালাতে পারি।’
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, দেড় হাজারের বেশি বই নিয়ে একটি গ্রন্থাগারও রয়েছে চুনতি লাইটহাউসে। দেয়ালে শোভা পাচ্ছে স্থানীয় শিল্পীদের আঁকা চুনতির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছবি। জানা গেল, প্রতিষ্ঠানটিতে কম্পিউটারের বেসিক অ্যাপ্লিকেশন, ফ্রিল্যান্সিং, হার্ডওয়্যারসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
‘লাইটহাউস’ বা ‘বাতিঘর’ সমুদ্র উপকূল, দ্বীপ ও বিপজ্জনক জলপথে নির্মাণ করা হয়। এটি রাতে বা কুয়াশায় নাবিকদের সংকেত দেওয়ার কাজ করে। গ্রামে শিক্ষা ও প্রযুক্তির আলো ছড়িয়ে দিতেই গড়ে তোলা হয়েছে ‘চুনতি লাইটহাউস’। এর যাত্রা শুরু হয় ২০২২ সালের মে মাসে। ৮ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত ‘চুনতি লাইটহাউসে’ রয়েছে ১৭টি কম্পিউটার। সেখানে প্রতিদিন কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, দেড় হাজারের বেশি বই নিয়ে একটি গ্রন্থাগারও রয়েছে চুনতি লাইটহাউসে। দেয়ালে শোভা পাচ্ছে স্থানীয় শিল্পীদের আঁকা চুনতির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছবি। জানা গেল, প্রতিষ্ঠানটিতে কম্পিউটারের বেসিক অ্যাপ্লিকেশন, ফ্রিল্যান্সিং, হার্ডওয়্যারসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রশিক্ষক ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমানে প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী এখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীকে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের অনেকেই এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন।’
এ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া শিক্ষার্থীদের একজন মুহিতুল হক। তিনি বলেন, ‘স্নাতক শেষ করে গ্রামে এসে সময় কাটানোর সময় লাইটহাউসে প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেছিলাম। এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছি। এই প্রশিক্ষণই আমাকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে।’
‘চুনতি লাইটহাউস’ পরিচালিত হয় খান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে। ফাউন্ডেশনটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চক্ষু চিকিৎসা, শীতবস্ত্র বিতরণ, শিক্ষাসহায়তা, নারী উদ্যোক্তা তৈরি, সুদবিহীন কৃষিঋণসহ নানা সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিশ্বব্যাংকের লিড ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্ট সুরাইয়া জান্নাতের উদ্যোগে ২০২২ সালের মে মাসে লাইটহাউসের যাত্রা শুরু হয়।
সম্প্রতি কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজওয়ানুল হক। তিনি বলেন, লাইটহাউস এই গ্রামের জন্য সত্যিকারের একটি আলোকবর্তিকা। লাইটহাউসের সাধারণ সম্পাদক রবিউল হাসান বলেন, ‘প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সরকারি সহযোগিতা ছাড়া মাসে লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠানটি চালানো কঠিন। তবে সহযোগিতা পেলে আমরা এই কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে চাই।’
লোহাগাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মং এছেন বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ প্রজন্ম গড়তে এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয়। আমরা দ্রুত এটি পরিদর্শন করে সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করব।’