
দুর্গম পাহাড়ি ঢাল। একসময় সেখানে ছিল সেগুনগাছ আর বিভিন্ন আগাছা। কোনো আবাদ হতো না বললেই চলে। তবে এখন আর এমন নেই। এখন সেই জায়গাজুড়ে বরইগাছ। ডালে ডালে ঝুলছে থোকা থোকা ফল। চার বছরে এই পরিবর্তন এনেছেন রাঙামাটির কৃষক নীলকান্ত চাকমা (৬২)।
রাঙামাটি সদর উপজেলার বালুখালী ইউনিয়নের বসন্তমোনপাড়ায় নীলকান্ত চাকমার বাড়ি। ওই এলাকাতেই প্রায় তিন একর জমিতে তিনি এ বরইগাছের বাগান করেছেন। স্থানীয় কৃষি বিভাগের সহায়তায় গড়ে তোলা বাগানটিই এখন তাঁর মূল আয়ের উৎস। সেখান থেকে চলতি বছর ৯ লাখ টাকা আয় করার আশা করছেন তিনি।
নীলকান্তের বাগানটি সমতল থেকে প্রায় ৭০০ মিটার ওপরে। এ দুর্গম পাহাড়েই তিনি বরইগাছ লাগিয়েছেন। ওই এলাকায় বিদ্যুৎও নেই। জেনারেটর বসিয়ে তিনি পরিচর্যার জন্য নিচ থেকে মোটরে পানি নেন। তাঁর বাগানে রয়েছে ‘আপেল বরই’, ‘কাশ্মীরি বরই’, ‘নারকেল বরই’, ‘বলসুন্দরী’, ‘ভারতসুন্দরী’ ও বাউকুলসহ বিভিন্ন জাতের বরই। তবে এর মধ্যে বলসুন্দরী, ভারতসুন্দরী ও আপেল বরইয়ে ফলনই তাঁর বাগানটিতে বেশি হয়েছে।
নীলকান্ত চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, চার বছর আগে সেগুনগাছ কেটে তিনি এই বরইয়ের বাগান করেন। চলতি বছর ফলন হয়েছে। দুদিন পরপর তিনি বরই তোলেন। একবারে এসব বরই তুলতে ১৫–২০ জন শ্রমিক লাগে। তাঁদের তিনি ৩০০–৪০০ টাকা বরই তোলার জন্য পারিশ্রমিক দেন।
নীলকান্তের বাগানটি সমতল থেকে প্রায় ৭০০ মিটার ওপরে। এ দুর্গম পাহাড়েই তিনি বরইগাছ লাগিয়েছেন। ওই এলাকায় বিদ্যুৎও নেই। জেনারেটর বসিয়ে তিনি পরিচর্যার জন্য নিচ থেকে মোটরে পানি নেন।
বরই তোলার পর সপ্তাহে নীলকান্ত চাকমা রাঙামাটির বনরূপা বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন। মৌসুমের শুরুতে তিনি প্রতি কেজি বরইয়ের জন্য ১০০–১২০ টাকা পেতেন। এখন তিনি পাইকারিতে ৭০ টাকা বা এরও কম বিক্রি করেন। প্রতিবার তিনি বাজারে ৩০০–৫০০ কেজি বরই নেন।
নীলকান্ত চাকমা বলেন, ‘স্থানীয় বাজারে সিন্ডিকেটের কারণে সব সময় কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যায় না। তবু খরচ বাদ দিয়ে লাভ থাকে। এ বছর বরই থেকে ৯ লাখ টাকা আয় হতে পারে। ধাপে ধাপে আরও বাড়তে পারে।’
রাঙামাটি শহরের খুচরা ব্যবসায়ী নোমালা চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, নীলকান্ত চাকমার বরইয়ের স্বাদ ভালো। এ কারণে বাজারে বাড়তি চাহিদা রয়েছে। তিনি ৮০ টাকা ধরে নীলকান্ত চাকমা থেকে বরই কেনেন। পরে খুচরায় তিনি ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। বাজার বুঝে কম দামেও তিনি মাঝেমধ্যে নেন।
অবশ্য শুধু বরই নয়। এর পাশাপাশি তিনি আম, লিচু, মাল্টা, ড্রাগন ও বারোমাসি কাঁঠালও চাষ করেন। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১৪ লাখ টাকা আয় হয়। তবে বরই থেকেই তাঁর মূল আয় হচ্ছে। এর আগে পাহাড়ে জুমচাষ করে তিনি বছরে মাত্র দুই লাখ টাকা আয় করতেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শে তাঁর আয় বেড়েছে।
রাঙামাটি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, রাঙামাটিতে ৮১৩ হেক্টর জমিতে বরই চাষ হচ্ছে। চলতি বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে আট হাজার মেট্রিক টন। জানতে চাইলে অধিদপ্তরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেবাশীষ দেওয়ান প্রথম আলোকে বলেন, ‘নীলকান্ত চাকমা প্রতিকূল পরিবেশে চাষ করছেন। বাগানে বিদ্যুৎ নেই। প্রায় ৭০০ ফুট নিচ থেকে জেনারেটর দিয়ে পানি তুলতে হয়। এরপরও এ বছর তাঁর ফলন ভালো হয়েছে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘রাঙামাটিতে বরই চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। এখানকার বরই তুলনামূলক সুমিষ্ট। বাজারে চাহিদাও ভালো। ভবিষ্যতেও কৃষকদের এ ফল চাষ করতে উদ্বুদ্ধ করা হবে।’