বাড়িটি রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে অবস্থিত। এর এক পাশে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পুরাকীর্তি ঐতিহাসিক বড় শিবমন্দির, আরেক পাশে দোল মন্দির। মাঝখানের পড়েছে এই দ্বিতল বাড়িটি। জনশ্রুতি আছে, এই বাড়িতে একসময় রাজপরিবারের দারোয়ান নিতাই সিং বসবাস করতেন। আর অভিযোগ আছে, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাড়িটি ভেঙে ইট বিক্রি করছেন স্থানীয় এক ব্যক্তি।
এই ব্যক্তির নাম মনিরুল ইসলাম ওরফে সাবু। তিনি পুঠিয়া পৌর এলাকার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তাঁর দাবি, এই বাড়ি তাঁর দাদা একজন মাড়োয়ারির কাছ থেকে কিনেছেন। তার পর থেকে তাঁরা এই বাড়িতে বসবাস করছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত ১৪ এপ্রিল মনিরুল ইসলাম প্রথমবার বাড়িটি ভাঙার জন্য শ্রমিক লাগান। এ সময় পুঠিয়া রাজবাড়ি জাদুঘরের সহকারী কাস্টডিয়ান দাপ্তরিক কাজে বাইরে ছিলেন। এই সুযোগে মনিরুল ইসলাম বাড়িটি ভাঙার কাজ শুরু করেন। খবর পেয়ে কাস্টডিয়ান হাফিজুর রহমান মুঠোফোনে বাড়ি ভাঙতে নিষেধ করলে তিনি আর একটি ইটও ভাঙবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দেন। বাস্তবে তিনি দ্বিগুণ শ্রমিক লাগিয়ে বাড়িটি প্রায় ধ্বংস করে ফেলেন। দুই দিন পর কাস্টডিয়ান ফিরে এসে উপজেলা প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত দুজন শ্রমিককে আটক করেন। পরে মুচলেকা দিয়ে মনিরুল ইসলাম তাঁদের ছাড়িয়ে নেন।
হাফিজুর রহমান জানান, হঠাৎ শনিবার স্থানীয় সংসদ সদস্য (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) নজরুল ইসলাম মন্ডল কাস্টডিয়ানকে ডেকে পাঠান। তিনি এই বাড়িটির ব্যাপারে আইনি বিষয়টি জানতে চান। হাফিজুর রহমান আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝান যে বাড়িটির প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য আছে। এটা কেউ ভাঙতে পারবে না। হাফিজুর রহমান জানান, সংসদ সদস্য তাঁর ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়ে আইন অনুযায়ী যা হয়, তা–ই করার নির্দেশ দেন। এর পরদিনই; অর্থাৎ রোববার সকালেই মনিরুল ইসলাম বাড়ির অবশিষ্টাংশ ভাঙার জন্য শ্রমিক লাগান। খবর পেয়ে দুপুরের দিকে হাফিজুর রহমান গিয়ে ভাঙার কাজ আবার বন্ধ করে দেন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ির চারদিকে পরিখাসহ ১০০ একজন জমির ওপরে রাজবাড়ির বিভিন্ন স্থাপনা আছে। এর মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১২ একর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দখলে আছে। আর প্রায় ৩০ বিঘা দিঘি উপজেলা প্রশাসনের দখলে আছে। বাকিটা স্থানীয় লোকজন দখল করে নিয়েছেন। এগুলো উদ্ধারের জন্য অধিদপ্তর কাজ করছে। এরই অংশ হিসেবে গত ৪ মার্চ সরকার রাজবাড়ির চারটি প্রত্নসম্পদ (স্থাপনা) সংরক্ষিত ঘোষণা করে। প্রজ্ঞাপন জারি করে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। পর্যায়ক্রমে এই বাড়িও সেই তালিকায় নেওয়ার কাজ প্রক্রিয়াধীন আছে। কর্তৃপক্ষের ধারণা, প্রজ্ঞাপন জারির আগে এই ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংস করার জন্য মনিরুল ইসলাম তড়িঘড়ি করে ভাঙার কাজ শুরু করেছেন।
পুরাকীর্তি আইন ১৯৬৮ (সংশোধিত ১৯৭৬) অনুযায়ী, সংরক্ষিত পুরাকীর্তির আশপাশে কোনো কিছু নির্মাণ, ক্ষতিসাধন, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন, প্রত্নস্থলকে ঢেকে দেওয়া, আড়াল করা—এমনকি এর সৌন্দর্যহানি দণ্ডনীয় অপরাধ। এই ধারা অনুসারে ভবনটির ১০ মিটার দূরে উত্তর পাশে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঐতিহাসিক বড় শিবমন্দির, দক্ষিণ পাশে ৫ মিটার দূরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঐতিহাসিক দোল মন্দির অবস্থিত। এই অবস্থায় কোনোভাবেই তিনি প্রত্ননিদর্শনটি ভাঙতে পারেন না।
নিষেধ করার পরও কেন বাড়ি ভাঙছেন, জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম গতকাল বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, এটা তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি। রাজবাড়ির স্থাপনা কীভাবে পৈতৃক সম্পত্তি হলো, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর দাদা বাড়িটি একজন মাড়োয়ারির কাছ থেকে কিনেছিলেন। মাড়োয়ারির নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাগজপত্র দেখতে হবে। তিনি বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর তাঁকে কোনো লিখিত নোটিশ দেয়নি। মৌখিকভাবে বলেছে।
এ ব্যাপারে পুঠিয়া রাজবাড়ি জাদুঘরের সহকারী কাস্টডিয়ান হাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের নোটিশ জারির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। তবে কারও নিজের সম্পত্তি হলেও যদি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মনে করে যে সেটার প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য আছে, হেরিটেজ হিসেবে সংরক্ষণ করার দরকার, তাহলে মালিক সেটা ভাঙতে পারবেন না। এই আদেশ মৌখিকভাবে দেওয়া হয়েছে। তিনি ভাঙবেন না বলে মুচলেকা দিয়েছেন। তারপরও ভাঙার চেষ্টা করছেন।