
রংপুরে থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করার অভিযোগ উঠেছে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। গতকাল বুধবার রাতে রংপুর মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানার ভেতরে এ ঘটনা ঘটে।
মারধরের শিকার ওই নেতার নাম রাকিবুল ইসলাম। তিনি সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব। তাঁর অভিযোগ, থানার ভেতরে ওসি আজাদ রহমানের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁকে মারধর করেন। পরে তাঁকে স্থানীয় বিএনপির নেতারা উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।
এ ঘটনায় ওসিসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে জানানো হয়েছে। রংপুর মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা বিভাগ) সনাতন চক্রবর্তী প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এই পাঁচজন হলেন রংপুর কোতোয়ালি থানার ওসি আজাদ রহমান, উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ রানা, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মোছা. মেহেরুন নেসা, কনস্টেবল লিমা সরেন ও বাসুদেব রায়। তাদের রংপুর পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।
এর আগে এ ঘটনায় গতকাল রাত আড়াইটার দিকে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দেয় রংপুর মহানগর পুলিশ। সেখানে বলা হয়, বিএনপির এক নেতাকে থানায় আটক রেখে নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে রংপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) নরেশ চাকমাকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ঈদের আগে নগরের সিও বাজার এলাকার এক প্রেমিক যুগল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। তাঁদের উদ্ধারের পর গতকাল সন্ধ্যায় কোতোয়ালি থানায় আনা হয়। ওই দুজনের পরিবারের অনুরোধে বিষয়টি মীমাংসা করতে স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতা থানায় যান। লাভলু নামের এক নেতার ডাকে থানায় যান নেতা রাকিবুল ইসলামও।
রাকিবুল ইসলামের অভিযোগ, রাত সাড়ে নয়টার দিকে থানায় গিয়ে এক পুলিশ সদস্যকে ওই যুগলকে মারধর করতে দেখতে পান তিনি। বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানালে ওসি ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁকে মারধর করেন। এতে তিনি রক্তাক্ত ও আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের ভাষ্য, ঘটনার খবর পেয়ে রংপুরের স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা–কর্মীরা থানার সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে থানার কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় গেটের ভেতর থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাকিবুল ইসলাম।
রাকিবুল কাঁদতে কাঁদতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখানে ওসি, এসআই আমাকে রাইফেল দিয়ে মারল। বারবার তাদের অনুরোধ করেছি, পরিচয় দিয়েছি যে আমি স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব, বিএনপির একজন কর্মী। তারপরও তারা আমাকে মেরে চোখটা কী রকম করল, মাথায় দুই জায়গায় মারছে। বন্দুক দিয়ে মারছে। আমার ফোন দুইটা কেড়ে নিছে। পুলিশের চরিত্র এখনো ফ্যাসিবাদীর মতো রয়েছে। আমি এর ন্যায্য বিচার চাই।’
রাকিবুল অভিযোগ করেন, মারধরের পর পুলিশ সদস্যরা তাঁকে জোর করে নিয়ে গিয়ে শরীরে লেগে থাকা রক্ত ধুয়ে দেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করার বিষয়ে জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ওসি আজাদ রহমান মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করেন। শরীরে আঘাতের চিহ্ন ও কাপড়ে রক্তের দাগ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি তখন উপস্থিত ছিলাম। যখন আমি ভেতরে ছিলাম, তখন দেখলাম বাইরে চিল্লাচিল্লি ও মারামারি করছেন। উনি (রাকিব) হয়তো ওপর পক্ষ দ্বারা মার খেয়েছেন। উনি হয়তো মনে করছেন, আমার ইন্ধনে হয়েছে।’
প্রথমে ওসি বাদে তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএনপির নেতা–কর্মীরা। জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব জাকারিয়া ইসলাম প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘ওসি আমাদের কর্মীকে নির্যাতন করেছেন। তাঁর যেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয়। তাঁকে অপসারণ করা হয়, এটাই আমরা চাচ্ছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ প্রথম আলোকে বলেছিলেন, তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধ অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাঁদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে। পরে ওসিসহ পাঁচজনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে তাঁর সই করা চিঠিতে জানানো হয়।